১. দশ বছরের ছেলের মোবাইলে গেইমস খেলা নিয়ে মহা চিন্তিত মা। যাকে পারেন তার কাছেই এই সমস্যার সমাধান চান। তিনি এবং ছেলের বাবা দুইজনই খাওয়ানো কিংবা চুপ করিয়ে দেয়ার জন্য দুই-তিন বছরেই ছেলের সামনে মোবাইল দিতেন। একদিন দেখলেন ছেলে নিজেই মোবাইলের লক খুলে ফেলতে পারে। তখন খুব খুশিও হয়েছিলেন। সেই খুশি এখন কপালে উদ্বিগ্নতার ঘাম হয়ে ঝরছে কারণ ছেলে সারাদিনই পারলে মোবাইলে খেলতে থাকে। বাসার বাইরে খেলার জায়গাও নেই। একবার কারাটের ক্লাসে ভর্তি করে দেখেছিলেন, ছেলে সেখানে কোনো উৎসাহ পায় না।তার ধ্যান-জ্ঞান মোবাইলের গেইমসগুলোই। এক একটা লেভেল শেষ করেই শুধু তার আনন্দ। টিভিও দেখে না। কোনোমতে পড়ালেখা শেষ করে গেইমস শুরু করে দেয়। শারীরিক পরিশ্রম, খেলাধুলা-নড়াচড়া না করে এই বয়সেই ৬০ কেজি ওজন নিয়ে ভয়াবহ অবস্থা। সম্প্রতি মায়ের দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে গেছে কারণ চোখের ডাক্তার দেখানোর পর ডাক্তার পরীক্ষা করে চোখে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক শুষ্কতা পেয়েছেন। এজন্য ডিজিটাল স্ক্রিন যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করতে বলেছেন। কিন্তু ছেলেকে গেইমস থেকে সরানো কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না।
২. নবম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে মা চেম্বারে হতাশ হয়ে বসে আছেন। মায়ের অভিযোগ যে, মেয়ে ইংরেজি এবং ভারতীয় মিলিয়ে পাঁচটি সিরিয়াল দেখে এবং সারাদিন সেগুলোর কাহিনি-সাজপোশাক-পরবর্তী পর্বের প্যাঁচ নিয়েই মেতে থাকে। মেয়ের অস্বাভাবিক চুপ থাকা দেখে এবং নিয়ম রক্ষার্থে মাকে বাইরে পাঠিয়ে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলে মেয়ে হেসে বলল, ‘আমার মায়ের রুটিন জিজ্ঞেস করেন’। আরেকটু ভেঙে যা জানাল তা হচ্ছে মা নিজে অনেকগুলো ভারতীয় সিরিয়াল নিয়মিত দেখেন। বাসায় বিনোদন বলতে সিরিয়াল দেখাটাই একটা উপায়। মা কোনো দাওয়াতে বা আত্মীয় বাড়িতে যান না সিরিয়াল মিস হওয়ার ভয়ে।।
৩. বত্রিশ বছরের ব্যাংকার। বাসায় সবাই তার ওপর বিরক্ত কারণ তিনি দিনরাত মোবাইলে কিছু অনলাইন খেলা ছাড়া আর কোনো আনন্দের উপকরণ খুঁজে পান না। বাসার বাজারসদাই, দায়িত্বমূলক কোনো কাজই পুরোটা শেষ করতে পারেন না। খেলাগুলোতে আবার বিভিন্ন রকম সামাজিক কর্মকাণ্ড করতে হয় অর্থাৎ বিভিন্ন উপকরণ, পয়েন্ট শেয়ার করতে হয়; সেগুলো আবার বাড়তি পয়েন্টের জন্য সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার দিতে হয়। এই অনলাইন কার্যক্রম ছাড়া আর কোথাও যেন অস্তিত্ব নেই উনার। কিশোর বয়সে কৌতূহলবশত ঝুঁকেছিলেন পর্ন দেখার নেশায়। পৃথিবী উল্টে গেলেও এই নির্দিষ্ট ধরনের চলচ্চিত্র প্রতিদিন দেখতেই হতো। ধীরে ধীরে এই নেশা বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত শুরু হলো অনলাইনে গেইম খেলা। এই গেইমগুলো ছাড়া মন ভালো করার আর কোনো উপায় নেই, কোনোদিন গেইম খেলতে না পারলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, পরিবারের সবার সঙ্গে এমন ব্যবহার করেন যে আর কেউ এখন ভয়ে খেলার বিষয়ে কিছু বলে না। একের পর এক ধাপ পার হতে এখন টাকা খরচও হচ্ছে, কিন্তু সেটা কোনো মাথাব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না।
সবকটি ক্ষেত্রেই কয়েকটা বিষয় সাধারণ-
- একটা মাধ্যম হয়ে উঠছে বিনোদনের একমাত্র উৎস, অন্য কোনো কাজ কিংবা বিনোদন মাধ্যম আর আনন্দ বা আগ্রহের উৎস থাকছে না। ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- শারীরিক, মানসিক ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে, কিন্তু তারপরও মাধ্যমটিকে বাদ দেয়া যাচ্ছে না।
- দিনের পর দিন ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে।
- মাধ্যমটি ব্যবহার না করতে পারলে বিভিন্ন লক্ষণ যেমন মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো আসক্তির বৈশিষ্ট্য। যদিও ওপরে যেসব মাধ্যমের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে কেবল অনলাইন গেইমের প্রতি আসক্তিকেই আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাকিগুলো রোগ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও জীবনযাত্রায় যথেষ্ট খারাপ প্রভাব ফেলে। দেখা গেছে, আমাদের দেশে ভারতীয় টেলিভিশন সিরিজগুলো জীবনযাত্রার ধরন, চিন্তাভাবনা, দৈনন্দিন জীবনের সময় ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনোদন হওয়ার কথা এরকম-যা নিজস্ব ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক দায়-দায়িত্ব পালনের পর একজন মানুষকে তার ক্লান্তি থেকে বের করে আনবে, নির্মল আনন্দ দেবে, সৃষ্টিশীলতার স্থান তৈরি করবে, নতুন চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করে উদ্যম জোগাবে। যেই মাধ্যম নিজের কাছে বিনোদনের খোরাক মনে হয় কিন্তু সকল ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সময় ব্যয় হয় খুব বেশি এবং বিনোদনের মাধ্যমে আনন্দ পেতে গিয়ে অন্য কোনো প্রকার কাজে কোনো উদ্যম ও আনন্দহীন করে সেটি আসলে সুস্থ বিনোদন নয়, অসুস্থতা বা আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। এরকম কিছু আচরণ যেমন অনলাইনে বা অফলাইনে অতিরিক্ত ডিজিটাল খেলাগুলোয় ব্যস্ত থাকা, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, অতিরিক্ত টেলিভিশন সিরিয়াল দেখা, অতিরিক্ত সিনেমা দেখা এবং সেই জগতেই বিচরণ করা, অতিরিক্ত কেনাকাটা এসব মাদকাসক্তির মতোই আসক্তি তৈরি করতে পারে।
এগুলো প্রতিরোধের জন্য উপায়গুলো হচ্ছে-
১. বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের আনন্দ উপকরণ খুঁজে বের করে রাখা।
২. একই ধরনের বিনোদন মাধ্যমে সারাদিন উল্লেখযোগ্য সময় (১ ঘণ্টা বা তার বেশি) ব্যয় হয়ে যাচ্ছে কিনা সেটা খেয়াল করা। যেমন-দেখা গেল কোনো পেশাগত বা শিক্ষাগত কাজ ছাড়া কেউ দুই ঘণ্টা মোবাইলে বিভিন্ন ভিডিও দেখে কাটিয়ে দিচ্ছে, এই ক্ষেত্রে সতর্কভাবেই সেটা আধা ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে হবে।
৩. পরিবারের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করা।
৪. বই পড়া, পত্রিকা পড়া, ব্যায়াম, খেলাধুলা, রান্না করা, গাছ লাগানো, ঘর গোছানো এই ধরনের কাজগুলো দৈনন্দিন রুটিনে নিয়ে আসা।
৫. সৃষ্টিশীল অভ্যাস (যেমন: ছবি আঁকা, গান গাওয়া প্রভৃতি) থাকলে সেটার চর্চা বজায় রাখা।
৬. বিষণ্ণতা, সামাজিক উদ্বিগ্নতা, অহেতুক সন্দেহপ্রবণতা থাকলেও বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন, মোবাইল এসবের প্রতি নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। এরকম ক্ষেত্রে উল্লিখিত মানসিক রোগগুলোর জন্য যথাযথ চিকিৎসা করতে হবে।
- ডা. সৃজনী আহমেদ
- সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,
- ঢাকা কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা।



