মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা মনের খবরের মৌলিক এজেন্ডা। মনের খবর চায় সব মানুষ তার নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকুক। এজন্য সাধারণ মানুষের মাঝে আদৌ মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে কিনা সেটা জানতে মনের খবর প্রায়ই একেবারে প্রান্তিক মানুষের মুখোমুখি হয়। এবার আমরা একজন ফ্রিল্যান্সারের মুখোমুখি হয়েছিলাম। তার কাছে জানতে চেয়েছি মানসিক স্বাস্থ্যের খুঁটিনাটি নানা বিষয়। ফ্রিল্যান্সার মারুফ আহমেদের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায় । বয়স ২৭ বছর। বর্তমানে তিনি একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন । তার সাথে কথা বলেছেন, মনের খবরের প্রতিবেদক মো. আবদুর রহমান।
মনের খবর: আসসালামু আলাইকুম।
মারুফ আহমেদ: ওয়ালাইকুম আসসালাম।
মনের খবর: কেমন আছেন?
মারুফ আহমেদ: এই তো, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভালোই যাচ্ছে।
মনের খবর: আপনার কাছে ফ্রিল্যান্সিং ও ফ্রিল্যান্সারদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু বিষয় জানার ছিলো।
মারুফ আহমেদ: জি অবশ্যই । আমি আমার সাধ্য মতো তথ্য দিয়ে আপনাকে সাহায্য করবো
মনের খবর: কত বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিং করছেন?
মারুফ আহমেদ: আমি প্রায় তিন বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত আছি।
মনের খবর: কোন ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন?
মারুফ আহমেদ: আমি UI/UX নিয়ে কাজ করি। এটিকে ডিজিটাল প্রোডাক্ট ডিজাইনও বলা যায়।
মনের খবর: ফ্রিল্যান্সিং পেশায় আসার পেছনে আপনার প্রধান অনুপ্রেরণা কী ছিল?
মারুফ আহমেদ: শুরুতে আমি গ্রাফিক ডিজাইনের ওপর একটি কোর্স করি। এরপর নিজে নিজে বিভিন্ন বিষয় এক্সপ্লোর করতে থাকি। একপর্যায়ে দেখলাম, UI/UX ডিজাইন আমার কাছে বেশি ভালো লাগছে। কারণ এই কাজের মধ্যে চিন্তাভাবনার একটি প্রক্রিয়া আছে, গবেষণার সুযোগ আছে এবং ভবিষ্যতে ভালো করার সম্ভাবনাও রয়েছে। মূলত এসব কারণেই আমি এই পেশায় আসি।
আরও পড়ুন…
মনের খবর: একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে সবচেয়ে বড়ো মানসিক চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
মারুফ আহমেদ: একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আমি চুক্তিভিত্তিক কাজ করি। তাই যখন হাতে কোনো ক্লায়েন্ট থাকে না, তখন এই পেশাটাকে বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে হয়। পাশাপাশি ক্লায়েন্ট খোঁজাও কঠিন, কারণ এই ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি।
মনের খবর: দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে কাজ করার কারণে মানসিক ক্লান্তি অনুভব করেন কি?
মারুফ আহমেদ: আমি দীর্ঘ সময় কাজ করলেও সাধারণত মানসিক ক্লান্তি অনুভব করি না, কারণ এই কাজটা আমার প্যাশন। তবে অনেকের কাছেই শুনেছি, দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে তারা মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন। অনেকে আবার ব্যাকপেইনেও ভোগেন। আমার ক্ষেত্রে যখন ডেডলাইনের চাপ বা কাজের চাপ থাকে, তখনও আমি সাধারণত এসব সমস্যা অনুভব করি না।
মনের খবর: ফ্রিল্যান্সিংয়ে একা কাজ করতে হয়। এতে কি কখনো একাকিত্ব অনুভব করেন?
মারুফ আহমেদ: হ্যাঁ, অনেককে বলতে শুনেছি যে একা কাজ করতে করতে তারা বিরক্তি বা একাকিত্ব অনুভব করেন। কিন্তু আমি কাজ করার সময় তেমন একাকিত্ব অনুভব করি না। বরং যখন কাজের ফ্লো চলে আসে, তখন একাকিত্বকে আরও ভালোভাবে উপভোগ করি।

মনের খবর: মানসিক স্বাস্থ্য বলতে আপনি কী বোঝেন?
মারুফ আহমেদ: আমার কাছে মানসিক স্বাস্থ্য বলতে মানসিকভাবে সুস্থ থাকাকে বোঝায়। অনেকের পরিবারের বিভিন্ন সমস্যা থাকতে পারে, যার কারণে কাজে মনোযোগ থাকে না বা মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। আবার বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে সে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করছে। কিন্তু শুধু স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারলেই যে একজন মানুষ মানসিকভাবে সুস্থ, তা নয়। মানসিক সুস্থতার বিষয়টি আরও গভীর।
মনের খবর: আপনার কী মনে হয়, মানুষ কেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যায়?
মারুফ আহমেদ: মূলত একজন মানুষ যখন মানসিকভাবে ভালো থাকে না, তখন সে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণেও মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায়। কেউ বিষণ্নতায় ভোগে, কেউ ট্রমার মধ্যে থাকে, আবার কারও বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা থাকতে পারে—যেমন শুচিবায়ু, সিজোফ্রেনিয়া, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ইত্যাদি। এসব কারণেও মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়।
মনের খবর: মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে আপনি কী কী অভ্যাস অনুসরণ করেন?
মারুফ আহমেদ: এই যে কাজ থেকে মাঝে মাঝে ব্রেক নেওয়া, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করা, মাঝে মাঝে সামান্য গেমস খেলা, বাইরে ঘুরতে যাওয়া এই আরকি। কাজের মাঝে মাঝে এগুলো করলে একটু রিফ্রেশমেন্ট আসে। কাজের ফ্লো বাড়ে।
মনের খবর: মানসিক চাপ কমাতে কোনো বিশেষ কৌশল ব্যবহার করেন কি?
মারুফ আহমেদ: আসলে আমি ওই পর্যায়ের তীব্র মানসিক চাপে কখনো পড়িনি। আমার পরিবার খুবই সাপোর্টিভ। তাই যখনই কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে, আমি পরিবারের কাছ থেকে তা পেয়েছি। তবে যখন কোনো মানসিক চিন্তা আসে, তখন সেসব চিন্তা থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি পেতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি, তাদের মতামত নিই, নামাজ পড়ি এবং সেই মুহূর্তে যেটা করা প্রয়োজন, সেটাই করার চেষ্টা করি।
মনের খবর: আমাদের দেশে ফ্রিল্যান্সারদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা কতটা আছে বলে মনে করেন?
মারুফ আহমেদ: আমার মনে হয়, আমাদের দেশের ফ্রিল্যান্সাররা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যতটা সচেতন থাকা দরকার, ততটা সচেতন নন। অনেকেই নিজের মানসিক সমস্যাগুলো সঠিকভাবে বুঝতে বা উপলব্ধি করতে পারেন না। ফলে প্রয়োজন হলেও চিকিৎসকের কাছেও যান না।
মনের খবর: নতুন যারা ফ্রিল্যান্সিং শুরু করছেন, তাদের মানসিক সুস্থতার জন্য আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
মারুফ আহমেদ: ফ্রিল্যান্সিংয়ে যখন ভালো কাজ পাওয়া যায়, তখন আয় করার সুযোগ থাকে। আবার যখন কাজ পাওয়া যায় না, তখন আয়ের পথও অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে।
তাই যারা নতুন করে ফ্রিল্যান্সিং পেশায় আসতে চাচ্ছেন, তাদের বিষয়টি ভালোভাবে বিবেচনা করে এগোনো উচিত। বর্তমানে এআই মানুষের কাজের ধরনেও পরিবর্তন আনছে। ফলে ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে নিতে হলে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। কেউ যদি এই পেশায় আসেন, তাহলে অভিজ্ঞ ও ভালো একজন মানুষের পরামর্শ নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি করে সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া ভালো।
মনের খবর: আমাদেরকে আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মারুফ আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

আরও দেখুন…

