অনলাইন গ্যাম্বলিং বা জুয়ার আসক্তি বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে ঘরে বসেই জুয়া খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা অনেককে গভীর আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই আসক্তি কেবল আর্থিক ক্ষতিই করে না, বরং মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অনলাইন গ্যাম্বলিং আসক্তিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘গ্যাম্বলিং ডিজঅর্ডার’ বলা হয়। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তি ফলাফল জেনেও বারবার জুয়া খেলার তাড়না অনুভব করেন। এটি মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’-এ ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা অনেকটা মাদকাসক্তির মতোই শক্তিশালী।
১. আসক্তি শনাক্তকরণ: প্রথম ধাপ
চিকিৎসা শুরুর আগে প্রথম কাজ হলো সমস্যাটি স্বীকার করা। কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যায় কেউ আসক্ত কি না:
- সব সময় জুয়া খেলার কথা চিন্তা করা।
- হেরে যাওয়া টাকা ফিরে পেতে আবার জুয়া খেলা (Chasing losses)।
- জুয়া খেলার জন্য মিথ্যা বলা বা ধার করা।
- জুয়া খেলা বন্ধ করার চেষ্টা করলে খিটখিটে মেজাজ বা বিষণ্ণতা অনুভব করা।
চিকিৎসা কোথা থেকে শুরু করবেন?
জুয়ার আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এটি শুরু করার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা জরুরি:
২. মানসিক প্রস্তুতি ও স্বীকৃতি
আসক্তি মুক্তির প্রথম এবং সবচেয়ে কঠিন ধাপ হলো নিজের কাছে স্বীকার করা যে, “আমি সমস্যায় আছি এবং আমার সাহায্য প্রয়োজন।” যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি নিজের সমস্যাটি স্বীকার করবেন না, ততক্ষণ কোনো চিকিৎসাও কার্যকর হবে না।
৩. পেশাদার সাহায্য গ্রহণ (Professional Help)
অনলাইন গ্যাম্বলিং আসক্তি একটি মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা, তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।
- সাইকোথেরাপি: আসক্তির চিকিৎসায় Cognitive Behavioral Therapy (CBT) সবচেয়ে কার্যকর। এটি রোগীকে জুয়া খেলার নেতিবাচক চিন্তাধারা শনাক্ত করতে এবং তা পরিবর্তন করতে সাহায্য করে।
- কাউন্সেলিং: ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সামাজিক এবং মানসিক অস্থিরতা কমিয়ে আনা যায়।
- চিকিৎসক বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ: অনেক সময় আসক্তির সাথে বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তা (Anxiety) যুক্ত থাকে। প্রয়োজনে চিকিৎসকরা স্বল্প মেয়াদে ঔষধ দিতে পারেন।
৪. ডিজিটাল সীমাবদ্ধতা আরোপ (Digital Barriers)
যেহেতু এটি একটি অনলাইন সমস্যা, তাই ডিজিটাল মাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
- অ্যাপ ব্লকার ব্যবহার: মোবাইলে বা কম্পিউটারে ‘BetBlocker’ বা ‘GamBan’-এর মতো সফটওয়্যার ইনস্টল করা, যা জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোতে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেয়।
- সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ: জুয়া সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন বা পেজগুলো আনফলো করা।
৫. আর্থিক নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর
জুয়াড়িদের জন্য টাকা হলো আসক্তির জ্বালানি। আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ পরিবারের কোনো বিশ্বস্ত সদস্যের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। ক্রেডিট কার্ড বা অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর অ্যাক্সেস সীমিত করা একটি অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ।
দীর্ঘমেয়াদী নিরাময় ও সাপোর্ট সিস্টেম
কেবল চিকিৎসা শুরু করলেই হবে না, আসক্তি যাতে ফিরে না আসে (Relapse), সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
৬. সাপোর্ট গ্রুপে যোগদান
বিশ্বজুড়ে Gamblers Anonymous (GA)-এর মতো অনেক সংগঠন রয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন অনলাইন এবং অফলাইন সাপোর্ট গ্রুপ গড়ে উঠছে। একই সমস্যায় আক্রান্ত অন্যদের সাথে কথা বললে একাকীত্ব দূর হয় এবং পুনরুদ্ধারের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়।
৭. জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
খালি সময় জুয়ার নেশাকে উসকে দেয়। তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখা প্রয়োজন:
- নতুন কোনো শখ (Hobby) শুরু করা।
- নিয়মিত ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম।
- পরিবার ও বন্ধুদের সাথে গুণগত সময় কাটানো।
৮. ধৈর্য ধারণ করা
জুয়ার আসক্তি রাতারাতি দূর হয় না। এই পথে চড়াই-উতরাই থাকবে। কোনো একদিন পুনরায় ভুল হয়ে গেলেও হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, এটি একটি দীর্ঘ লড়াই।
বাংলাদেশে সাহায্যের উৎস
বাংলাদেশে সরাসরি গ্যাম্বলিং ক্লিনিক খুব বেশি না থাকলেও, মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো এই সমস্যার চিকিৎসা দিয়ে থাকে।
১. জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।
২. বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BMU)-এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগ।
৩. সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ।
৪. বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, যারা বর্তমানে ডিজিটাল আসক্তি নিয়েও কাজ করছে।
অনলাইন গ্যাম্বলিং আসক্তি কোনো নৈতিক পরাজয় নয়, বরং এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যা সঠিক চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ এই জালে আটকা পড়ে থাকেন, তবে দেরি না করে আজই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং মানসিক শান্তি ফিরে পাওয়ার একমাত্র পথ হলো আসক্তিকে বিদায় জানানো।
ভা. মো. মাহমুদুর রহমান
ফেজ বি রেসিডেন্ট, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ, সিলেট
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও পড়ুন:


