মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার মধ্যে বিবেক, বিচারবুদ্ধি এবং নৈতিকতা কাজ করে বলেই সে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা। নীতি ও মূল্যবোধ মানুষকে সুপথে পরিচালিত করে, সভ্য সমাজ গঠনে সহায়তা করে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে তার এই নৈতিকতা বিলুপ্ত হতে থাকে। সে হয়ে ওঠে দায়িত্বহীন, আত্মকেন্দ্রিক এবং সমাজবিরোধী। তাই যথার্থই বলা হয়, “নেশায় যত আসক্তি, তত বেশি নীতিহীনতা।”
নেশা ও নৈতিকতার বিপরীতমুখী সম্পর্ক
নেশা মূলত একটি মানসিক ও শারীরিক আসক্তি, যা ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, কাজকর্ম এবং জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলে। একজন ব্যক্তি যখন নেশায় ডুবে যায়, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তার বিবেকের কণ্ঠ স্তিমিত হয়ে যায়। নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, ভালো-মন্দের পার্থক্য— সবকিছুই গুলিয়ে যায়। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি শুধু নিজের সুখ ও চাহিদার দাস হয়ে পড়ে।
নেশার কারণে নীতিহীনতার বাস্তবচিত্র
আমাদের সমাজে নেশাগ্রস্ত অনেক যুবককে দেখা যায় যারা পরিবারের অর্থ চুরি করছে, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, এমনকি মাদক জোগাড়ের জন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা, যৌন নির্যাতন, খুন— এসব অনেক ক্ষেত্রেই নেশার প্রভাবে ঘটে থাকে। নেশার কারণে একজন মানুষ তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, এমনকি নিজের সন্তান-স্ত্রী পর্যন্ত আঘাত করতে দ্বিধা করে না। ধীরে ধীরে সে একটি “নৈতিক মৃতদেহে” পরিণত হয়।
পরিবার ও সমাজে প্রভাব
একজন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি শুধু নিজের ক্ষতি করে না, তার দ্বারা পুরো পরিবার এবং সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিবারের শান্তি নষ্ট হয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সমাজে অপরাধ বাড়ে, নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। এককথায়, নেশা একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়— এটি একটি সামাজিক ব্যাধি, যা গোটা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়।
কারণ ও প্রতিকার
নেশায় আসক্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে নানা কারণ: কৌতূহল, বন্ধুদের প্ররোচনা, মানসিক চাপ, পারিবারিক অবহেলা, শিক্ষার অভাব, কর্মহীনতা ইত্যাদি। এই সমস্যার সমাধানে চাই সম্মিলিত প্রয়াস। পরিবারে শিশুদেরকে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজে নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হাতে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
নেশা মানুষকে শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও নৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। একজন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি কেবল নিজের জীবন নয়, তার চারপাশের সমাজকেও কলুষিত করে তোলে। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্তরে আমাদের প্রতিজ্ঞা নিতে হবে— নেশামুক্ত সমাজ গড়ার। আমাদের মনে রাখতে হবে, “নেশায় যত আসক্তি, তত বেশি নীতিহীনতা।” এই সত্য উপলব্ধি করে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুস্থ ও নৈতিক সমাজ তৈরি করতে হবে।
ডা. অনন্যা কর
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও পড়ুন:


