বাঙালির জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে আড্ডা। আড্ডা একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটা মানুষের জীবনের এক চলমান সংস্কৃতি। মানুষ তার কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে একটু সময় ও সুযোগ পেলেই আড্ডায় মেতে ওঠে। এলাকার চায়ের দোকান, বাড়ির উঠানে, বারান্দায় ও পাড়ার মোড়ে আড্ডার জমপেশ আসর জমে ওঠে। আড্ডার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে নিবিড়় সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহানুভুতি। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এর মাধ্যমে বহু সামাজিক ও ব্যক্তিগত সমস্যারও সমাধান করা যায়।
আড্ডার প্রকারভেদঃ
আড্ডা নানান ধরনের হতে পারে। গানের আড্ডা, কবিতার আড্ডা, চায়ের আড্ডা, সাংস্কৃতিক,, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আড্ডা, এরকম আরও অনেক কিছুর আড্ডা। আড্ডায় যত নানান শ্রেণী পেশার মানুষ যুক্ত হয় সে আড্ডা তত বেশি আকর্ষণীয় হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, যারা যে বিষয়ে বেশি আগ্রহী, তারা সেই বিষয় নিয়েই সমমনাদের সাথে বসে আড্ডা দিতে ভালবাসেন। তবে আড্ডা এমন হওয়া উচিত যেখানে সবাই নিঃশর্তভাবে বিনাদ্বিধায় অংশগ্রহণ করতে পারে। আড্ডাকে অর্থবহ করতে হলে একজন কে দায়িত্ব নিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সে কাউকে বেশি সুযোগ যেমন দিবে না ঠিক তেমনি আবার কাউকে তিরস্কার করবে না বা চটানোর সুযোগ দিবে না। আবার একজনই যদি কাউকে বলার সুযোগ না দিয়ে সে একাই সারাক্ষন বলতে থাকে তাহলে আড্ডা অর্থহীন হয়ে পড়বে এবং স্থায়ী হবে না। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের মতে, বইমেলা, পিঠামেলা, বানিজ্যমেলা বা আরও অনেক ধরণের মেলার মত আড্ডারও মেলা হওয়া প্রয়োজন।
আড্ডার ইতিহাসঃ
আড্ডার ইতিহাস অতি প্রাচীন। রোমানরা সাংঘাতিক আড্ডাবাজ ছিল। বাংলাদেশে বা পশ্চিম বাংলায় বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সত্যজিৎ রায়ের মত জাঁহাবাজ লোকজনও ছিল ভীষণ আড্ডাপ্রিয়। সত্যজিৎ রায় তার বিখ্যাত পথের পাঁচালি উপন্যাসের ভাবনা পেয়েছিলেন এমন আড্ডাতে বসেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম সহ বিভিন্ন পেশার অনেক বিখ্যাত মানুষকে ঘিরে সবসময় আড্ডাপ্রিয় মানুষের জমজমাট থাকত। যীশু খৃষ্টের জন্মের অনেক বছর আগেই প্লেটো আড্ডার মত করে অ্যাকাডেমিক, সিনকোজিম করত। এসব আড্ডা থেকে মানুষ তার মনের খোরাক পেয়েছে যুগে যুগে। এটা এক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো যেখানে কোন বিষয়ের নানা দিক, অভূতপূর্ব সব যুক্তি, পাল্টা যুক্তি দিয়ে সবাই কথা বলে। এর মাধ্যমে সবাই শিখতে পারে, সবার হৃদয় আন্দোলিত হয় এবং একে অপরের সাথে ভ্রাতিত্ববোধ সুদৃঢ় হয়। মান্নাদের ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটা আমরা যতবার শুনি ততবারই কল্পনাতে যেন কোন এক অজানা আড্ডাতে হারিয়ে যাই। তবে বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের কারণে সবাই কেমন যেন একা হয়ে পড়েছে। আড্ডা গুলো অনেকটাই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। সত্যি সত্যিই আজ মনে হয়,‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’।
আড্ডার আবেশঃ
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আড্ডার প্রভাব ব্যাপক। আড্ডার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়। আড্ডায় মানসিক চাপ অনেকাংশে কমে যায়। আড্ডার ছলে অনেক বিষয় আলোচনা হয় এবং সেখানে সবাই যার যার মত করে নানারকম পরামর্শ ও উপদেশ দেয়, যার কোন একটির মাধ্যমে হয়ত আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। ভাল মানুষ ও ভাল বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা দিলে ভাল অনেক কিছু শেখা যায়। আড্ডার মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরি হয় যা হৃদয়ের বন্ধনকে আরও মজবুত করে। হিংসা বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ ভুলে তৈরি হয় শান্তি সুখের একটি সমাজ, যেখানে সবাই একে অপরের ক্ষতির চিন্তা না করে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করার চিন্তা করে। মহৎ চিন্তার মানুষের সাথে আড্ডা দিলে মনের অশ্লীলতা দূর হয়, মাদকসহ নানা রকমের অপকর্ম থেকে দূরে থাকা যায়। নিঃসঙ্গ মানুষের মন সবসময় উপযুক্ত মানুষের সঙ্গ পেতে উন্মুখ থাকে। আড্ডার মাধ্যমে একে অপরকে গভীর ভাবে অনুভব করা যায় বা ছুয়ে দেখা যায় যা স্মার্ট ফোনে বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজ করে করা সম্ভব নয়।
আড্ডার ক্ষতিকর প্রভাবঃ
আড্ডার পরিবেশ দুর্নীতিমুক্ত থাকা খুবই জরুরী। আড্ডার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল আড্ডার পরিবেশ ও অংশীজন নির্বাচন করা। খারাপ মানুষ বা মাদকসেবীদের সাথে আড্ডা আপনাকে বিপথগামী করে তুলতে পারে। কেউ একজন ইচ্ছার না থাকলেও সঙ্গদোষের কারণে মাদকে সেবনে বা নানান অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে পারে। বর্তমান সময়ে আড্ডার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে কারণ কিছু ক্ষেত্রে আড্ডায়় মদ, গাঁজা, জুয়া ও অশ্লীল কর্মকাণ্ড করতে দেখা যায়।
সবসময় পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে মাঝে মাঝে বন্ধু–বান্ধবীদের সাথে খোলা আকাশের নিচে প্রাণভরে আড্ডা দিন। আড্ডার গুণগত মান বজায় রেখে সমাজে সুস্থ, সুন্দর এবং নৈতিক সংস্কৃতির ধারক হিসেবে এটিকে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। সৃজনশীল আড্ডার মাধ্যমে মানুষ হোক আরও বেশি সৃজনশীল, সংবেদনশীল ও মানবিক। আড্ডার মাধ্যমে হৃদয় কলুষমুক্ত হোক, শক্তিশালী হোক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। তাই আড্ডাকে অবহেলা না করে বরং ভালোবাসুন।
ডা. মো. আব্দুল মতিন
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মানসিক রোগ বিভাগ
রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-


