জন্ম থেকে মানুষ নানান সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও নারী-পুরুষের ভালোবাসার সম্পর্কেই জীবনের বড় অংশ কাটে। ভালোবাসা যেমন সত্য, তেমনি বিচ্ছেদও জীবনের অংশ। কখনও একসাথে বুড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায়, পথ আলাদা হয়ে যায়। ভালোবাসা হারালেও থেকে যায় হাজারো স্মৃতি, অভ্যাস আর আবেগের ক্ষত।
বেশিরভাগ মানুষ বিচ্ছেদের পরও প্রাক্তনের কথা ভাবেন—এটি স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘদিন ধরে ভুলতে না পারলে মানসিক যন্ত্রণা বাড়ে এবং নতুন জীবন শুরুতে বাধা দেয়।
এই যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুবাইয়াৎ ফেরদৌস দিয়েছেন এক মাসের হিলিং প্ল্যান। ধাপে ধাপে মানসিক শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য চার সপ্তাহের পরিকল্পনা:
প্রথম সপ্তাহ: স্বীকারোক্তি ও ডিটক্স
লক্ষ্য: বাস্তবতা মেনে নেওয়া, আবেগকে বের হতে দেওয়া।
- দিন-১ ও ২: কাঁদতে চাইলে কাঁদুন। এই সম্পর্ক ভাঙার আসল কারণগুলো কী ছিল- তা লিখে ফেলুন।
- দিন-৩: মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে প্রাক্তনের ছবি, মেসেজ, নম্বর মুছে ফেলুন বা হাইড করুন। যোগাযোগ বন্ধ করুন।
- দিন-৪ ও ৫: প্রাক্তনের ভালো ও খারাপ দিকগুলো লিখুন। খারাপ দিকগুলো বারবার পড়ুন। এই সম্পর্ক ভাঙার কারণ মনে করুন।
- দিন-৬ ও ৭: দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন। এতে শরীরের এন্ডরফিন মুড উন্নত হবে।
দ্বিতীয় সপ্তাহ: নতুন রুটিন তৈরি
লক্ষ্য: পুরোনো অভ্যাস ভেঙে নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হোন।
- দিন-৮: প্রতিদিন সকালে ১০ মিনিট মেডিটেশন/যোগব্যায়াম শুরু করুন।
- দিন-৯: নতুন কোনো বই পড়া শুরু করুন। নিজেকে সমৃদ্ধ করতে অর্থাৎ মানসিক বা শারীরিক বিকাশে নতুন কোনো কোর্সে ভর্তি হতে পারেন।
- দিন-১০: দৈনন্দিন রুটিনের যে সময়টাতে প্রাক্তনের সাথে যুক্ত থাকতেন সে সময়ে অন্য কিছু করুন। যেমন- এক্সারসাইজ, রান্না বা সৃজনশীল কোনো কাজ।
- দিন-১১: নিজের জন্য ছোট্ট উপহার কিনুন। এটি সেল্ফ-কম্প্যাশন বা নিজের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের প্রতীক।
- দিন-১২ ও ১৩: বন্ধুর সঙ্গে বাইরে ঘুরতে যান, গল্প করুন। সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন।
- দিন-১৪: আপনার স্বপ্নের তালিকা তৈরি করুন। পরবর্তী ৬ মাসে কী কী অর্জন করতে চান, তা নিয়ে ভাবুন।
তৃতীয় সপ্তাহ: মানসিক শক্তি তৈরি
লক্ষ্য: চিন্তাভাবনার পরিবর্তন, পুনরায় মানসিক শক্তি অর্জন
- দিন-১৫: আপনার মনে আসা নেগেটিভ চিন্তাগুলো লিখে ফেলুন, তারপর পাশে যুক্তিযুক্ত উত্তর লিখুন।
- দিন-১৬ ও ১৭: জার্নাল থেরাপি নিতে পারেন। প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা লিখুন: ‘আজ আমি কী শিখলাম?’
- দিন-১৮: চোখ বন্ধ করে ভিজ্যুয়ালাইজেশন করুন- আপনি ভারী ব্যাগ নামিয়ে সামনে এগোচ্ছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন।
- দিন-১৯: নতুন কোনো জায়গায় ভ্রমণ করুন। একটি ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে হলেও ঘুরে আসুন।
- দিন-২০: নিজের পুরোনো সাফল্যের তালিকা তৈরি করুন। যাতে মনে হয়, আপনি যথেষ্ট সক্ষম। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
- দিন-২১: নিজের ভবিষ্যতের ছবি আঁকুন বা কল্পনা করুন। অর্থাৎ, নিজেকে শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী, সুখী হিসেবে ভাবুন।
চতুর্থ সপ্তাহ: নতুন জীবন শুরু
লক্ষ্য: নিজের সাথে নতুন সম্পর্ক গড়া
- দিন-২২: প্রতিদিন অন্তত ১টি কৃতজ্ঞতার বিষয় লিখুন।
- দিন-২৩ ও ২৪: নতুন বন্ধুত্ব বা নেটওয়ার্কিং করুন।
- দিন-২৫: নতুন হেয়ারস্টাইল, নতুন পোশাক বা নতুন কিছুতে নিজের লুক পরিবর্তন করুন।
- দিন-২৬: ‘ভবিষ্যৎ স্বপ্নের ভিশন বোর্ড’ তৈরি করুন (ছবি বা কাগজে লিখে)।দিন-২৭: এক দিনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া এড়িয়ে চলুন।
- দিন-২৮: আপনার ছোট-বড় যেকোনো অর্জন বা সাফল্য উদযাপন করুন। বন্ধুর সঙ্গে বাইরে যান বা নিজের জন্য বিশেষ কিছু করুন।
- দিন-২৯: জার্নাল থেরাপিতে প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা করে যা লিখেছেন তা পড়ে দেখুন। কী কী শিখলেন বা কষ্ট কতটা কমেছে, ভাবুন।
- দিন-৩০: নিজের জন্য একটি অঙ্গীকার লিখুন- ‘আমি নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত’।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুবাইয়াৎ ফেরদৌস বলেন, ৩০ দিনের এই হিলিং প্ল্যান শেষে মানসিক যন্ত্রণা অনেকটাই কমবে, মন পরিষ্কার হবে এবং আপনি নতুন সম্ভাবনার পথে এগোতে পারবেন।
ডা. রুবাইয়াৎ ফেরদৌস
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
সিরিয়ালের জন্য ভিজিট করুন- এপোয়েন্টমেন্ট
আরও দেখুন-


