মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডারঃ কীভাবে বুঝবেন আপনি গুরুতর বিষন্নতা রোগে ভুগছেন?-পর্ব ১

0
204
গাঁজায় মাদকাসক্তি কেন মাদক

আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই, সুখী হতে চাই। কিন্তু এই ভালো থাকার জন্য কিংবা সুখের সন্ধানে তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হয়। আর নিজেকে গড়ে তোলার পথটাও সব সময় সহজ হয় না, নানা ঘাত-প্রতিঘাত বা প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। যে কারণে মানুষ নানা ধরনের মনো-সামাজিক চাপের সম্মুখীন হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কখনো কখনো আমাদের মন বিষন্ন হয়ে ওঠে। আর এই বিষন্নতাই এক সময় রোগে পরিণত হয় যাকে বলা হয় গুরুতর বিষন্নতাজনিত রোগ (major depressive disorder)।
বর্তমানে বিষন্নতার সমস্যা পৃথিবীতে তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু ২০৩০ সাল নাগাদ এটি বিশ্বের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু আমাদের দেশ নয়, মানসিক রোগ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে বিশ্বের অনেক দেশেই মানুষ মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। তবে এখন পিছিয়ে থাকার সময় নয়। আমরা চাইলেই জেনে নিতে পারি কী ধরনের সমস্যাগুলোকে বিষন্নতাজনিত সমস্যা বলা হয়।
এ বিষয়ে আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক প্রকাশিত ডায়গনস্টিক অ্যান্ড এস্টাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল ফর মেন্টাল ডিজঅর্ডারে (ডিএসএম-৫) ডিপ্রেশন বা বিষন্নতাজনিত রোগটিকে নির্ণয়ের জন্য কতগুলো লক্ষণের বর্ণনা করা হয়েছে। লক্ষণগুলো কী মাত্রায় থাকলে বিষন্নতাজনিত রোগ কোন পর্যায়ে রয়েছে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
ডিএসএম-৫ এর আলোকে একজন মানুষ যখন গুরুতর বিষন্নতাজনিত রোগে (major depressive disorder) আক্রান্ত হয় তখন তার মধ্যে প্রাথমিক দুটি লক্ষণ দেখা যায়। আর তা হলো বিষন্ন মন বা মেজাজ এবং সব কিছুতে আগ্রহ ও আনন্দ হারানোর অনুভূতি।
এ দুটো লক্ষণের মধ্যে কখনো একটি আবার কখনো কখনো দুটো লক্ষণই একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। লক্ষণগুলোর প্রভাবে ব্যক্তি আগে যেভাবে কাজ-কর্ম চালিয়ে নিতে পারতেন এখন আর সেভাবে পারেনন না।
যেভাবে বুঝবেন বিষন্নতার রোগে ভুগছেন
এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ দিন বা প্রায় প্রতিদিনই যে তার মন খারাপ থাকে তা ব্যক্তি নিজেই বুঝতে পারেন। এ ছাড়া সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তির খালি খালি লাগার অনুভূতি বা গভীর দুঃখবোধ কাজ করবে। ব্যক্তির চোখ অশ্রুসজল থাকে যা অন্যদের চোখেও ধরা পড়ে। এ ছাড়া কিছু কাজ-কর্ম বা সবধরনের কাজ-কর্মের ক্ষেত্রেই ব্যক্তির আগ্রহ বা আনন্দের ঘটতি দেখা যায়। এক্ষেত্রেও বিষয়টি তার নিজের বর্ণনা বা অন্যদের পর্যবেক্ষণে বোধগম্য হয়।
ফলস্বরূপ সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তির শরীরের ওজন কমে যায় বা বেড়ে যায় (একমাসে শতকরা ৫ ভাগের বেশি বা কম) । যদিও তিনি হয়ত খাবার গ্রহণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো পদক্ষেপই নেননি। তার পরও প্রায় প্রতিদিনই তার রুচির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। সেই সঙ্গে নিদ্রাহীনতা বা ইনসোমনিয়া কিংবা অতিনিদ্রা বা হাইপার ইনসোমনিয়া দেখা দেয়।
এ ছাড়া মনোদৈহিক অস্থিরতা বা স্থবিরতা দেখা যায়। ব্যক্তি প্রায় প্রতিদিনই অতিমাত্রায় ক্লান্ত অনুভব করেন বা শক্তিহীনতা বোধ করেন। সেই সঙ্গে মূল্যহীন অনুভূতি, অতিরিক্তি অপরাধবোধ বা যথাযথ নয় এমন অপরাধ বোধে ভোগেন।
কোনো বিষয়ে চিন্তা করা বা মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া। বার বার মৃত্যু চিন্তা বা আত্মহত্যার চিন্তা মনে ঠাঁই করে নেওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিভাবে আত্মহত্যা করবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও থাকে না, কিন্তু তিনি ঠিকই আত্মহত্যার কথা ভাবেন।
আবার এমনও হয় যে আত্মহত্যার প্রচেষ্টাও নেন অথবা কীভাবে আত্মহত্যা করবে সে বিষয়ে একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেন।
এই উপসর্গ বা লক্ষণগুলোর কারণে ক্লিনিক্যালি তাৎপর্যপূর্ণভাবে তার সামাজিক, পেশাগত এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে বিঘ্ন বা সমস্যার সৃষ্টি হয়। তবে এসব উপসর্গগুলো কিন্তু সরাসরি সাবস্টেন্স (মাদক) ব্যবহারের ফলে শারীরিক প্রতিক্রিয়া বা শারীরিক রোগের কারণে হয়নি।
তবে ওপরে বর্ণিত লক্ষণগুলোর সবগুলো একজন ব্যক্তির মধ্যে নাও থাকতে পারে। লক্ষণগুলোর উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে একজন মনোচিকিৎসক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে রোগী ডিপ্রেশন বা বিষন্নতার কোন পর্যায়ে রয়েছে। উপরিউক্ত লক্ষণগুলো কারো দেখা দিলেই দেরি না করে তার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
চলবে…
পারভীন বেগম
মনোবিজ্ঞানী, হারমনি
বনানী, ঢাকা।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here