মাদক-জুয়ার ফাঁদে পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ক্রিকেটার টেলরের

0
20

ক্রিকেটের অলিগলিতে পথচলা থাকলে জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটার ব্রেন্ডন টেলরের নাম শোনাটা স্বাভাবিক। জিম্বাবুইয়ান এই ক্রিকেটার দেশটিতে কিংবদন্তিতুল্য। এমনকি বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটের অনেক বড় এক নাম। জিম্বাবুয়ের হয়ে মাঠে অনেক কীর্তি গড়েছেন, জিতিয়েছেন দলকে। এই জিম্বাবুইয়ান কিংবদন্তি সম্প্রতি অন্ধকারে পথ হারিয়েছেন।

মাদক, জুয়ার মতো বিষয়ে জড়িয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন এই জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটার। গত দুই বছর ধরে জীবনের বিভিন্ন ঝামেলায় জড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্যে ক্ষতি হয়েছে এই ক্রিকেটারের। আর তাই বর্তমানে সুস্থ হওয়ার জন্য রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি হয়েছেন এই জিম্বাবুইয়ান। সম্প্রতি নিজের জীবনের সব খারাপ সময় এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে মুখ খুলেছেন ব্রেন্ডন টেলর।

মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরতে ‘মনের খবর’ এর পাঠকের জন্য ব্রেন্ডন টেলরের সেই কাহিনী তুলে ধরা হলো।

‘আমার বন্ধু, পরিবার ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলছি, আমি গত দুই বছর ধরে একটা ভার বয়ে চলছিলাম। যেটা আমাকে দুঃখজনকভাবে অন্ধকার জায়গায় নিয়ে গেছে ও আমার মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলেছে। আমি সেটা সম্প্রতি কাছের মানুষ, বন্ধু ও সমর্থকদের কাছে বলতে পেরেছি। আমার মনে হয় শুরুর দিকে আমি লজ্জিত ও ভীত ছিলাম।

এটা হয়তো পড়ার জন্য ভালো কিছু হবে না। কিন্তু আইসিসির পাওয়া একটি বিষয়ে আমাকে বিবৃতি দিতেই হবে। আইসিসিও হয়তো শিগগিরই জানাবে।

২০১৯ সালের অক্টোবরের শেষদিকে, আমাকে ভারতের এক ব্যবসায়ী অনুরোধ করেন, জিম্বাবুয়েতে একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আয়োজনের স্পন্সরশিপের বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে। আমাকে বলা হয়েছিল ভারতে যাওয়ার জন্য ১৫ হাজার ডলার পাবো।

আমি সেটাকে প্রত্যাখান করতে পারিনি, কারণ আমি ভীত ছিলাম। কিন্তু সময়টাও এমন ছিল যখন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট বোর্ড ছয় মাস আমাদের বেতন দিতে পারছিল না। এটাও নিশ্চিত ছিলাম না জিম্বাবুয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালিয়ে যেতে পারবে নাকি। তাই আমি ভারতে যাই। আলোচনাও হয়, আমারা একটা ডিনারে বসি।

সেখানে সে ড্রিংকস নিয়ে হাজির হয়। একই সঙ্গে আমাকে কোকেইন খাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, বোকার মতো আমি সেটা কিছুটা গ্রহণও করে ফেলি। এরপর অনেকবার সেটাতে ফিরে গেছি। আমার পেটে এখনও অসুস্থতা বোধ করি। তারা কিভাবে আমার সঙ্গে ওই রাতে এমনটা করলো, সেটা নিয়ে ভাবি।

পরের দিন সকালে ওই একই লোক ঝড়ের মতো আমার হোটেলের রুমে আসে আর একটা ভিডিও দেখায় কোকেইন খাওয়ার। সে আমাকে বলে, যদি আমি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাদের জন্য স্পট ফিক্সিং না করি। তাহলে তারা ভিডিওটা ভাইরাল করে দেবে।

আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আমার হোটেল রুমে ছয়জন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, নিজেকে নিয়েই ভয়ে ছিলাম। আমি তাদের ফাঁদে পা দিলাম। আর ধীরে ধীরে এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলাম যেটা জীবনের তরে ক্যারিয়ারটাকে শেষ করে দিল।

আমাকে ১৫ হাজার ডলার ঠিকই দেওয়া হলো, কিন্তু সঙ্গে এটাও বলা হলো যে ফিক্সিংয়ের জন্য এটা একটা ডিপোজিট। যদি কাজটা হয়ে যায়, তাহলে আরও ২০ হাজার ডলার পাবো। আমি টাকাটা নেই, যেন ভারত ছাড়তে পারি। আমার মনে হয়েছিলো আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ সেখানে না বলার মতো অবস্থা ছিল না। আমি তখন কেবল সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথাই ভেবেছি।

যখন আমি বাড়িতে ফিরে আসলাম। যা কিছু হয়েছে সেটা আমার শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্যতে প্রভাব ফেললো। আমার অবস্থাটা জগাখিচুড়ির মতো হয়ে গিয়েছিল। আমার দাদ হয়ে গিয়েছিল এবং অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ-অ্যামিট্রিপটাইলাইন খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

ওই ব্যবসায়ী এসে আমাকে দিয়ে কাজটা করাতে চেয়েছিল যেটা আমি করিনি। আইসিসিকে জানাতে চার মাস সময় লেগে গিয়েছিল। বুঝতে পারছি এটা অনেক দেরি কিন্তু আমি ভেবেছি সবাইকে বাঁচাতে পারবো। বিশেষত আমার পরিবারকে। আমি নিজের মতো করে আইসিসিকে জানিয়েছি।

আশা করেছিলাম, যদি আইসিসিকে ঠিকমতো বুঝাতে পারি যে, আমার কতটা দুর্দশা ছিল। আমার নিরাপত্তা ও ভালো থাকার ব্যাপারটা সত্যিকারার্থে বুঝতে পারবেন। তাহলে হয়তো তারা বুঝবেন কেন আমি দেরি করে জানিয়েছি।

দুর্ভাগ্যবশত তারা সেটা পারেনি। কিন্তু আমি ওই বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি না। আমি অনেকগুলো দুর্নীতি বিরোধী সভায় অংশ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে। আমরা জানি কখন, কীভাবে জানাতে হবে।

আমি এটা একই সঙ্গে জানাতে চাই, কখনো কোনো ধরনের ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমি হয়তো অনেক কিছু করেছি কিন্তু ধোঁকা দেইনি। ক্রিকেটের মতো সুন্দর খেলাটার জন্য আমার ভালোবাসা অনেক বেশি। যেকোনো হুমকিকে পথে ছুঁড়ে ফেলতে পারি এটার জন্য।

আইসিসিকে জানানোর পর অনেকগুলো সাক্ষাৎকার দিয়েছি। পুরো তদন্তের সময় আমি সৎ ছিলাম। ভেতরে ও বাইরে আমি অনেক যন্ত্রণা পাচ্ছি। এখনও অনেক বিষয়ের জন্য আমার সমর্থন ও পরামর্শ দরকার।

আমাকে বলা হয়েছে, আইসিসি কয়েক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। আমি এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছি। আশা করছি আমার গল্পটা আইসিসি অন্য ক্রিকেটারদের দ্রুত জানাবে।

গত দুইটা বছর আমার জন্য ছিল অনেক চ্যালেঞ্জের। ব্যক্তিগত ও পেশাদার দুই জীবনেই। আমার বানানো এই জগাখিচুড়ি জীবন থেকে আমি বের হতে চাই এবার। আমার পরিবার ও বন্ধুরা আমাকে অবিশ্বাস্য সমর্থন দিয়েছে। আমি এমন একটা সমস্যা তৈরি করেছি যেটা আরও আগে সমাধান করা দরকার ছিল।

আপনাদের এটাও জানাতে চাই, গত ২৫ জানুয়ারি আমি একটা রিহ্যাব সেন্টারে এসেছি নিজেকে শুদ্ধ করতে ও জীবনের সঠিক পথে ফিরে আসতে। আমাকে এখন নিজের গল্পটা শোনাতে হবে। কারণ আমি জানি তারা আমার গল্প শুনতে চাইবে। তবে কয়েক সপ্তাহের জন্য আমি বাইরে চলে যাচ্ছি ও ভালো হতে চাচ্ছি।

আমার নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা জন্মেছে। পরিবারের জন্য নিজেকে শুদ্ধ করতে চাই। নিজের ভেতর এমন একটা পদার্থ ঢুকিয়েছি, যেটা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে ও আমার স্বপ্নকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আমার নৈতিকতা ও সম্মানকেও। যেটাকে আমি অনেক গুরুত্ব দেই।

আমি এটাও আশা করি আমার গল্প যারা শুনেছে, তাদের এটা অনুপ্রাণিত করবে যেখানে তাদের এমন সাহায্য দরকার ওই ক্ষেত্রে। আমি বুঝতে পারিনি, সামনে এগিয়ে আসা ও কথা বলা আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবে। যেখানে আমি কয়েক বছর ধরে আছি। শেষে এসে বলতে চাই, যাদেরকে দুঃখ দিয়েছি তাদের কাছে ক্ষমা চাই।’

করোনায় স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

“মনের খবর” ম্যাগাজিন পেতে কল করুন ০১৮ ৬৫ ৪৬ ৬৫ ৯৪

শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।
       
 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here