ঘুমের কথা: পর্ব- ২

অলস শব্দটি ভিত্তিহীন

১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ঘুম হলো ক্লান্তি অবসন্নতা ঝেড়ে ফেলে নতুন জীবন শুরুর এক ধাপ, ঘুম মানে পরিপূর্ণতা। সুস্থ এবং অসুস্থ সব মানুষের জন্যই ঘুম অতি প্রয়োজনীয়। অসুস্থতার জন্য রোগের চিকিৎসার যেমন প্রয়োজন ঠিক তেমনি প্রয়োজন সুস্থ স্বাভাবিক ঘুমের মাত্রা, পরিমাণ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ঘুম মানেই প্রশান্তি ও আরামের অনুভূতি। দিনের সকল ক্লান্তি মুছে নতুন জীবনের শক্তি ও প্রেরণা হলো ঘুম। বিজ্ঞান মতে, শরীরকে নতুন করে প্রস্তুত করাই হলো ঘুমের লক্ষ্য।
ঘুমের সমস্যার সাধারণ ধরন
যার কোনো শারীরিক বা মানসিক রোগ নেই তার ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যার তিনটি কারণ থাকতে পারে
এক, ঘুম সম্পর্কে ভুল ধারণা
দুই, স্বাভাবিক ঘুমের প্রয়োজনীয় কিছু আচরণের পরিবর্তন
তিন, স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ঘুমের পরিপন্থি অবস্থার ভেতর দিয়ে যাওয়া।
ঘুম সম্পর্কে ভুল ধারণা
ঘুম সম্পর্কে ভুল ধারণা মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের চক্রকে নষ্ট করে। ফলে ভিন্ন ধরনের আরেকটি চক্রের আবির্ভাব ঘটে যা স্বাভাবিক ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করে। নিচে ঘুম নিয়ে কিছু ভুল ধারণা ও তার সম্ভাব্য ফলাফল এবং তার সাথে কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হলো।
ভুল ধারণা- রাতে ঘুম না হলে দিনে সে ঘুম পুষিয়ে নেন।
এই চিন্তাটি স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দের সম্পুর্ণ পরিপন্থী। এমন ধারণার বশবর্তী হলে ঘুমের আচরণ সম্পুর্ণ বদলে যায়। সুতরাং দেহ ঘড়িকে ছন্দবদ্ধ ভাবে কাজ করাতে ঘুমের জন্য রাতকে অথবা নিজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নির্ধারিত সময়কে বেছে নেয়া জরুরি।
ভুল ধারণা- আমার ঘুমের ক্ষমতা হারিয়ে গেছে।
এটিও একটি ভুল ধারণা। মানুষের ঘুমের সক্ষমতা কখনও হারায় না বা হারাতে পারে না। বরং ঘুমের আচরণ পরিবর্তনের কারণেই ঘুমের সক্ষমতা কমে যায়। এই সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান জরুরি এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
ভুল ধারণা- বয়স হলে ঘুমের সমস্যা স্বাভাবিক।
এমন ধারণা কখনোই যুক্তিসংগত নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বয়সের সাথে সাথে ঘুমের সময়ের পরিবর্তন ঘটে। বয়স হলে অনেকে তুলনামূলক আগে ঘুমাতে যান এবং আগে ঘুম থেকে উঠেন। এটা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই যখন এই সময়কে কেউ স্বেচ্ছায় পরিবর্তন করতে চান। আর সমস্যাটি এভাবে ধরে নিলে যদি অন্য কোনো কারণে ঘুমে সমস্যা হয় তখন সেটিও আড়ালে চলে যায়। সে সমস্যার দিকে আর নজর দেয়া হয় না।
ভুল ধারণা- যেকোনো ভাবেই ৭ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবেই।
এই ধারণাটি ভুল। একেক জনের ঘুমের চাহিদা একেক রকম।
ভুল ধারণা- অন্যের ঘুমের সাথে নিজের ঘুমের তুলনা। অর্থাৎ আমার ঘুম অমুকের মতো হওয়া উচিত।
এটিও একটি ভুল ধারণা। কারো ঘুম হালকা আবার কারো ঘুম ভারী। কেউ বিছানায় গিয়ে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে আবার কারো ঘুম আসতে একটু সময় লাগে। ব্যক্তি ভেদে ঘুমের ধরন ভিন্ন হয়। তাই অন্যের ঘুমের সাথে নিজের ঘুমের তুলনা করা কখনোই উচিত নয়।
ভুল ধারণা- যেহেতু আমি ঘুমাতে পারছি না সেহেতু ঘুমের জন্য আমাকে আরো চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
ঘুম আরাম এবং রিলাক্সের একটি বিষয়। জোর করে ঘুম আনতে যাওয়া মানে নিজের চিন্তাকে আরো বেশি সচল রাখা যা ঘুমের পরিপন্থি। সুতরাং ঘুমের জন্য চিন্তা করে ঘুম বরবাদ করার চাইতে নিজেকে চিন্তামুক্ত এবং রিলাক্সে থাকাটাই ঘুমের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। প্রয়োজনে ‘রিলাক্সেশন’ শিখে নিতে হবে।
স্বাভাবিক ঘুমের প্রয়োজনীয় কিছু আচরণের পরিবর্তন
ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে উঠার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নিতে হবে, যা দেহ ঘড়ির স্বাভাবিক ছন্দকে ঠিক রাখতে সাহায্য করবে এবং কাজের সময় নিজেকে ফ্রেশ রাখা যাবে।
দিনের বেলা না ঘুমানোই উত্তম। প্রয়োজনে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ঘুমানো যেতে পারে তবে এর বেশি নয়। এবং লক্ষ্য রাখতে হবে এর কারণে আবার রাতের ঘুমের যাতে ব্যাঘাত না ঘটে।
যেকোনো ধরনের উত্তেজক পানীয় যেমন চা, কফি ইত্যাতি ঘুমাতে যাওয়ার কমপক্ষে তিন ঘন্টা আগে থেকে বন্ধ রাখতে হবে। এছাড়াও ঝাল জাতীয় খাবার রাতের বেলা না খাওয়া।
ঘুমের গভীরতা আনতে হালকা ব্যায়াম উপকারী। তবে তা শেষ করতে হবে ঘুমাতে যাওয়া কমপক্ষে দুই ঘন্টা আগে।
ঘুমের প্রয়োজনীয় পরিবেশ।
ঘুমের জন্য বিছানাকে আরামদায়ক করতে হবে।
ঘুমের জন্য তাপমাত্রা, শব্দ ও আলোর ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। খুব বেশি ঠান্ডা বা গরম, শব্দ এবং আলো ঘুমের সমস্যার কারণ হতে পারে।
শোবার ঘরে প্রয়োজনীয় বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা।
বিছানাটি শুধু ঘুমের জন্যই ব্যবহার করতে হবে। বিছানায় শুয়ে টিভি দেখা, গল্প করা বা বই পড়ার অভ্যাস বর্জন করতে হবে।
শোবার ঘরে টিভি না রাখাই ভালো। আর রাখলেও শোয়ার সময় তা বন্ধ করে বিছানায় যেতে হবে।
ঘুমের ঠিক আগের মুহুর্তের প্রস্তুতি
ঘুমের ঠিক আগে কাজের চিন্তা, দুঃখ বেদনা কোনোভাবেই যাতে আপনার বিছানার সঙ্গী না হয়। সম্পুর্ণ চিন্তামুক্ত হয়ে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট কাজ করা যেতে পারে। যেমন বই পড়া বা হাত মুখ ধোয়া। ঘুমের আগ মুহুর্তে একটি নির্দিষ্ট কাজ করলে সেটি আপনার অবচেতনে ঘুমের কথা মনে করিয়ে দিবে।
যে পজিশনটা আপনার ঘুমের জন্য বেশি আরামদায়ক হয় সেই পজিশনে শুতে হবে।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে টিভি দেখা ঘুমকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
অনেকে ঘুমের আগে হালকা মিউজিক পছন্দ করেন। অনেকক্ষেত্রে মিউজিক রিলাক্সেশনের কাজ করলেও এটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।
ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর আসতে দেরি হলে।
বিছানায় শুয়ে ঘুম আনার চেষ্টা করাটা বোকামী। তার চাইতে বরং উঠে পড়া ভালো। সম্ভব হলে অন্য রুমে যাওয়া যেতে পারে, হালকা কিছু কাজ করা যেতে পারে। তবে গভীর মনোযোগ দিয়ে করতে হয় এমন কোনো কাজ না করা ভালো। এমন সময় টিভি দেখাও ঠিক নয়। ঘুম ঘুম ভাব লাগলেই শুয়ে পড়ুন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও যখন ঘুমের সমস্যা
হঠাৎ জায়গা পরিবর্তন, দেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে সময়ের পরিবর্তন, দিনে বা রাতে বিভিন্ন সময় কাজের সময়ের পরিবর্তন হওয়া ইত্যাদি কারণেও ঘুমের সমস্যা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং একই সাথে উপযুক্ত পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
চিকিৎসা
ঘুমের সমস্যা মূলত নির্ভর করে সমস্যার পেছনের কার্য-কারণের উপর। যেমন কোনো চাপ থাকলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কোনো রোগ থাকলে সেটির চিকিৎসা করতে হবে। সেই সাথে ‘স্লিপ হাইজিন’ নামে একটি বিষয় আছে যা ঘুমের সমস্যা সমাধানে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে। স্লিপ হাইজিন হলো কিছু নিয়ম এবং আচার আচরণের যা ঘুমকে স্বাভাবিক ছন্দে রাখতে সহযোগিতা করে। ওষুধের ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ঘুমের অনেক ওষুধ নির্ভশীলতা বা নেশার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। যা থেকে আবার নতুন করে বিষণ্নতা, যৌন সমস্যা সহ নতুন নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই ঘুমের ওষুধ খুব সাবধানে এবং সতর্কতার সাথে খেতে হবে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here