ক্রোধের ক্ষতি : নিজেকে রক্ষা করার কৌশল

0
427
ক্রোধের ক্ষতি : নিজেকে রক্ষা করার কৌশল
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

মনের মতো সেজেছে ফারিহা। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে এখন। মাঝে মাঝে ব্যালকনিতে যাচ্ছে। উঁকি দিয়ে দেখছে দূরের গলিপথ। অস্থিরতা বাড়ছে ওর।

রিশাদ বলেছিল সাতটার মধ্যেই ফিরবে, একত্রে বের হবে। ফারিহার ছোটো বোন ববির প্রথম ম্যারেজ ডে আজ। অথচ সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। রিশাদের খবর নেই। একবারের জন্যও ফোন করেনি সে। বিয়ের দুই বছরের মাথায় কি সব রোমান্স শেষ হয়ে গেল?

ইতিমধ্যে দুই বার ফোন করেছে ববি। আপু! আসছিস না কেন? সবাই তোদের জন্য বসে আছে। মাথার মধ্যে কেবল ঘুরঘুর করছে বাক্যটা। একই সঙ্গে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে ও।

রাত নটায় বাসায় ফিরেছে রিশাদ। অনুষ্ঠানের কথা ভুলেই গিয়েছিল সে। এসে দেখে ফারিহা নেই, অপেক্ষা করে করে একাই চলে গেছে ববির বাসায়।

ফারিহা-ববি সমবয়সি, দুই বছরের বড়ো-ছোটো। বান্ধুবীর মতো সম্পর্ক। তাই সব ক্ষেত্রেই উভয়ের প্রতি উভয়েরই আশা অনেক বেশি। দায়িত্বও কম নয়। এমন এক সিস্টার ইন লর প্রথম ম্যারেজ ডেতে যেভাবে যে-পোশাকে যাওয়ার কথা, তার ধারেকাছেও গেল না রিশাদ। বাইরে থেকে ফিরে সেই পোশাকেই চলে এসেছে অনুষ্ঠানে। ফারিহার মনের অবস্থার কথা ভাবতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছিল যে ড্রেস চেঞ্জ করে নিতে হবে।

জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ববির স্বামী জিদনি। ঘিয়ে রঙের সুট পরেছে সে। দুর্দান্ত লাগছে তাকে। দূর থেকে ফারিহা দেখল রিশাদকে। এমন এক আসরে স্বামীর পোশাকের অবস্থা দেখে ক্রোধ আরো বেড়ে গেল ওর। রাগের আগুনে কেরোসিন ঢেলে দিয়েছে রিশাদ। ফারিহার চোখ-মুখ থেকে ছুটে আসছে অগ্নিলাভা!

রাত গভীর হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে একটা কথাও বলেনি ও। রাতে পাশ ফিরে শুয়েছে ফারিহা। অনড় পাথর যেন পড়ে আছে বিছানায়। একবার ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছে রিশাদ। আরো বেশি শক্ত হয়ে গেছে ফারিহা। যেন রিশাদ বলে কেউ নেই। ওর এই অস্তিত্বের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই ফারিহার।

ফারিহার মনোবিশ্লেষণ

আমরা শান্তি চাই। সুখ চাই। ভালোবাসা চাই। যথানিয়মে কি সব চাওয়া পূরণ হয়? পাওয়ার অপূর্ণতার ফাঁক দিয়ে আমাদের মনে ঢুকে যায় রাগ, ক্রোধ। রাগ জীবনেরই একটি বড় অনুষদ। এটি এক ধরনের নেগেটিভ ইমোশন। কেউ অল্পতে রেগে যায়, কেউ সহজে রাগই করে না। কেউ রেগে গিয়েও বাইরে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় না, পুষে রাখে নিজের গভীরে।

মূলত মনের মধ্যে জমিয়ে রাখা অবদমিত রাগ আমাদের ভালো থাকার পেছনের শত্রু। অবদমিত রাগ মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক নষ্ট করে। মনের শান্তি হরণ করে। এই মহুর্তে তেমনটিই ঘটেছে ফারিহার ক্ষেত্রে। ফারিহার শত্রু-অবস্থান প্রকাশ করছে কঠিন রাগ পুষে রেখে সে পাথর হয়ে আছে।

ক্রোধের সময় কী ঘটে দেহে

ব্রেন সিগন্যাল পাঠায়। ঝোড়ো গতিতে নিঃসরণ ঘটে সক্রিয় হরমোন নরঅ্যাড্রিনালিন। নিশ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়, গভীর হয়। রক্তচাপ বেড়ে যায়। চোখের মণির স্ফীতি ঘটে। দেহের অন্যান্য অংশ থেকে রক্তপ্রবাহ দ্রুত ছুটে আসে হৃৎপিন্ডে, মস্তিষ্ক ও পেশির দিকে। হজম ক্রিয়া থেমে যায়। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়।

পুরুষের মধ্যে ছলকে বেড়ে ওঠে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা। হাতের মুঠি বন্ধ হয়ে আসে, দাঁতে দাঁত খিঁচে আসে, পরিপাকতন্ত্র খামছে ধরে। মূলত ক্রোধের সময় দেহমনে জেগে ওঠে ডেঞ্জার সিগন্যাল, লালবাতি।

রাগ হচ্ছে স্বাভাবিক আবেগীয় ও দৈহিক প্রতিক্রিয়া। যখন কেউ থ্রেট-এর মুখোমুখি হয় তার রাগ হতেই পারে। মাতৃজঠর থেকে পৃথিবীতে এসে কান্নার মাধ্যমে কষ্টের কথা, চাহিদার কথা জানান দিলেও শিশু প্রথম আবেগের যে অভিজ্ঞতা লাভ করে, সেটি হচ্ছে রাগ।

শিশুর হয়ত খিদে পেয়েছে, দুধ খেতে ইচ্ছে করছে। মুখ ফুটে খিদার কথা সে জানাতে পারছে না। প্রয়োজনের সময় অপ্রাপ্তিই তার মনে রাগের প্রকাশ ঘটায়। হাত-পা ছুঁড়ে কেঁদেকেটেই সে আবেগের প্রতিক্রিয়া ঘটিয়ে থাকে।

নরঅ্যাড্রিনালিনের মাত্রা ছলকে বেড়ে উঠলে, আমাদের মধ্যে তীব্র উদ্ধতভাব জেগে উঠতে পারে। দেহের ফ্যাটসেল থেকে ফ্যাটি অ্যাসিড বেরিয়ে আসে, দ্রুত গতিতে শরীর-মন তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় লড়াই করার ক্ষমতা বেড়ে যায়, কিংবা পরিস্থিতির মধ্যে থেকে পালিয়ে আসার শক্তিও বাড়তে পারে।

বাড়তি চাপ মোকাবিলা কিংবা বাড়তি লড়াইয়ের ক্ষমতা বাড়ে অতিরিক্ত ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের কারণে। যারা ঘোড়দৌড় কিংবা মোটর রেসে বা রেসলিংয়ে অংশ নেয়, তাদের হয়ত অতিরিক্ত ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের

প্রয়োজন থাকতে পারে, গবেষণায় এই সত্যের বৈজ্ঞানিক প্রমাণও পাওয়া গেছে। এদের রক্তে এই অ্যাসিডের পরিমাণ বেশিই পাওয়া গেছে।

একই সঙ্গে প্রমাণ পাওয়া গেছে, যারা ঘন ঘন উত্তেজিত হয় তাদের রক্তেও ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা থাকে বেশি। দীর্ঘদিনব্যাপী এদের রক্তে ফ্যাটি অ্যাসিডের উচ্চমাত্রা রক্তনালির জন্য ক্ষতিকর ধমনি সংকুচিত হয়ে যেতে পারে, রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। ফলে হৃৎপিন্ডে নিজস্ব অক্সিজেন খরচের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। যেকোনো মূহুর্তে হার্ট অ্যাটাক ঘটে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, যারা ঘন ঘন ক্রোধে উন্মত্ততা প্রদর্শন করে তারা করোনারি হার্ট ডিজিজের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গবেষণার আলোকে বিজ্ঞানীরা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, ক্রোধই প্রধান শত্রু নয়। কী ভঙ্গিতে ক্রোধের প্রকাশ ঘটছে সেটাই নির্ধারণ করে হার্ট অ্যাটাকের বিষয়টা।

যারা ক্রোধ দমিয়ে রাখে, অবদমিত করে রাখে, তারাই অসুস্থতা দ্রুত ডেকে নিয়ে আসে। তাদের হৃৎস্পন্দনে ছন্দের বিঘœ ঘটতে পারে। ছন্দময় তাল হারিয়ে যেতে পারে, Arrythmia হতে পারে। এটি ভয়াবহ একটা অবস্থা। এ সময় হার্ট পাম্প করে ব্রেনসহ অন্যান্য জরুরি প্রত্যঙ্গে রক্ত পাঠাতে পারে না। এরকম রাগের প্রকাশভঙ্গি আমরা দেখছি ফারিহার বৈশিষ্ট্যে।

উচ্চ রক্তচাপ, ধুমপান, ডায়াবেটিস, এমনকি ক্রোধ থেকেও হৃৎপিন্ডের এই অবস্থা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, বেশি আশঙ্কাযুক্ত। ক্রোধের কারণে রোগপ্রতিরোধ-ক্ষমতা তথা ইমমিউন সিস্টেম বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে। খুব দ্রুতই তখন রোগে-শোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

এছাড়াও দমিয়ে রাখা ক্রোধের কারণে অ্যাংজাইটি হতে পারে, নিজেকে পরিস্থিতি থেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে যে কেউ। উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা, ভয়রোগ ফোবিয়া, হিস্টেরিয়া, ওজনের সমস্যা, অনিদ্রা ও যৌন সমস্যা লেগেই থাকতে পারে অবদমিত রাগের কারণে।

ক্রোধের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করার কৌশল কী?

প্রধান শর্ত হচ্ছে ক্রোধ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ধারণা লাভ করা। এই জ্ঞানই ক্রোধান্ধ মনোভাব পালটাতে সাহায্য করবে, সতর্ক হতে শক্তি জোগাবে। সর্বোপরি আমাদের সচেতনতা বাড়াবে। সচেতনতার মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।

যাদের একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তাদের করণীয় কী?

গবেষণায় দেখা গেছে, অবাধে ক্রোধ প্রকাশের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে পারেন তারা। ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্রোধের সময় নিচের কৌশলগুলো অবলম্বন করা গেলে ক্ষতি মোকাবিলা করা সহজতর হয়:

শোয়া অবস্থায় রাগ উঠলে বালিশে উপর্যুপরি ঘুষি দেওয়া, হাতের কাছে ব্যাগ বা নরম যা কিছু আছে, পাঞ্চ করতে পারেন। চেঁচিয়ে রাগ বের করে দিতে পারেন নিজের ভেতর থেকে।

নিয়ন্ত্রিত ইতিবাচক ক্রোধ দৃঢ়প্রত্যয়ী হওয়ার পথ সহজ করে দেয়, সার্বিক মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার অর্থ ইতিবাচক পথে এগিয়ে যাওয়া, অযৌক্তিক দাবি প্রতিহত করা। কী চাই, কী চাই না, কী চাওয়া উচিত নয়, বিষয়টি সম্পর্কে নিজের কাছে নিজেকে স্বচ্ছ রাখতে হবে।

পক্ষান্তরে অ্যাগ্রেশনের রয়েছে ভিন্ন চিত্র। রাগের সঙ্গে মোটিভেটেড আচরণ মিলেমিশে আমাদের মধ্যে সহিংস আচরণ জাগিয়ে তোলে। এ সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা লোপ পায়, অন্যকে জোরপূর্বক ভূপাতিত করতে ইচ্ছা হয়, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার শক্তি হারিয়ে যায়। উদ্ভুত সমস্যা থেকে সমাধানে পৌঁছানো যায় না।

ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের কারণেও সহিংসতা বা অ্যাগ্রেশন রিলিজ হতে পারে। সেরোটোনিনের মাত্রা কমে গেলেও অ্যাগ্রেশন হতে পারে। টেস্টোস্টেরনের কারণেও এমনটা ঘটতে পারে। ব্যক্তিগত হতাশা, সামাজিক শিক্ষণ, কিংবা ব্যক্তিবিশেষের কথার খোঁচায়ও অ্যাগ্রেশন রিলিজ হতে পারে।

রাগ প্রকাশের অধিকার আছে প্রতিটি মানুষের। যিনি অন্যের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছেন, তার সামনে খোলামেলাভাবেই রাগের প্রকাশ ঘটতে পারে। এই প্রকাশের অর্থ আলাদা। এর ফলে ক্ষোভ উবে যায়, ব্যবধান কমে আসে। সুসম্পর্ক বজায় রাখার সব বাধা দূর হয়।

এ ক্ষেত্রে ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স (ইকিউ) বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আবেগীয় সমস্যা সমাধানে আইকিউর চেয়ে ইকিউ বড় টুলস। এটি ডেনিয়েল গোলম্যানের কথা। তিনি আবেগের সমস্যা ও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন, বই লিখেছেন।

তাঁর মতে, ইকিউ হলো কিছু দক্ষতার সমাহার, যেটির সাহায্যে মানুষ অন্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, নিজেদের মধ্যে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান টানতে পারে, দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করতে পারে।

মূলত ইকিউয়ের মাধ্যমে নিজের আবেগের প্রতিক্রিয়ার দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়। আবেগের দায়িত্ব নিজে বহন করতে পারলে, নিজের ক্ষমতা নিজেই ব্যবহার করার কৌশল আয়ত্তে চলে আসে। ব্যক্তিগত অনুভূতি তখন নানা দিক থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করে।

এ কারণে বলা হয়েছে, ইকিউ টুলস ব্যবহারের প্রথম ধাপ হচ্ছে নিজের অনুভূতির প্রতি মনোযোগী হওয়া, অন্যের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক আচরণের উৎস বের করা, নিজের আগ্রাসী মনোভাব শনাক্ত করা।

ওই মূহুর্তে করণীয় কী?

অপেক্ষা করতে হবে, কমপক্ষে তিন থেকে ছয় সেকেন্ড। অপেক্ষা করার অর্থ রাগ অবদমন নয়। এই অপেক্ষার অর্থ ক্রোধের সময় যে ইলেকট্রো-কেমিক্যাল পদার্থের নিঃসরণ ঘটে, তা বিক্রিয়া নিষ্ক্রিয় হতে সময় দেওয়া, মাত্রা কমতে সুযোগ তৈরি করা। ফলে রাগ থেকে যে-সহিংস আচরণের আশঙ্কা ছিল সেটা কমে যায়।

প্রকৃতপক্ষে এ সময় অপেক্ষা করা কঠিন। কিন্তু মানসিক চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে কৌশলটা রপ্ত করা যায়। যখন শান্ত হতে থাকবেন নিজের প্রতিক্রিয়া নিজেই বুঝতে পারবেন। এ সময় বুঝতে সহজ হবে, কী ধরনের নেতিবাচক বিভ্রমে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। এই নেতিবাচক বিষয়টা বুঝতে পারলেই পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষমতা বেড়ে যাবে।

প্রকৃত মনোভাব বা আচরণ কী হওয়া উচিত ছিল এই উপলব্ধি ও শিক্ষা দুটোই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে সমৃদ্ধ করবে। ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে নিজের আবেগ নিজেকে রক্ষা করবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে, নিজেকেই মানসিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে এগিয়ে আসতে হবে। এ ব্যাপারে বাড়াতে হবে গণসচেতনতা।

ক্রোধ বাগে রাখার নতুন কৌশল

সাম্প্রতিক মনোগবেষণা থেকে জানা যায়, ক্রোধ পোষমানানোর যেসব সনাতন পদ্ধতি চলে আসছিল তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। দৈহিক ভঙ্গিমা, যেমন বালিশে বা নরম কিছুতে পাঞ্চ করে রাগ ঝাড়ায় যে কৌশলের প্রচলন আছে, বলা হয়েছে সাময়িকভাবে পজিটিভ ফলাফল থাকলেও এসব পদ্ধতি মূলত পরিস্থিতি থেকে নিজেকে আঁড়াল করে রাখার প্রবণতাই আমাদের বৈশিষ্ট্যে গেথে দেয়।

রাগ প্রশমনের এ ধরনের কৌশলের উলটো পিঠে এভাবেই আগ্রাসী আচরণের বীজ রোপিত হয়ে যেতে পারে। একটি বিষয় খোলাসা হওয়া দরকার, নতুন কৌশল বর্ণনায় রাগ অবদমিত করে রাখার বিষয়কে উৎসাহিত করা হচ্ছে না। বরং রাগ পোষ মানানোর পরীক্ষিত নতুন গবেষণা নিয়েই আলোচনা করা হবে পর্যায়ক্রমে।

বর্তমান বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অংশ হিসেবে ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি ইত্যাদি চিকিৎসায় সাফল্যের সঙ্গে কগনিটিভ বেহেভিয়ার থেরাপির সুনির্দিষ্ট প্রটোকল ব্যবহার করা হয়। ক্রোধের ক্ষেত্রেও একই কৌশলে রাগ শাসন করার কৌশল রপ্ত করা যায়।

এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে, কেবল দীর্ঘমেয়াদি রাগই ক্ষতিকর নয়। রাগ থেকে মানসিক চাপও সৃষ্টি হয়। এই চাপ হার্টের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নিম্নবর্ণিত উপায়ে ক্রোধের কোপানল থেকে বাঁচার জন্য যে কেউ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করতে পারেন:

কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি প্রটোকলের মূল বিষয় রাগ প্রশমনের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়:

ক্রোধান্ধ ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া মনিটর করা। ক্রোধ উসকে ওঠার সব কারণ শনাক্ত করা। ব্যক্তির সামগ্রিক সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেই বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া হয়। রাগ নয়, রাগের প্রতিক্রিয়াই গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা।

উদ্ধত মেজাজের সময় ব্যক্তি যেভাবে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন, একই ঘটনা ওই ব্যক্তিকে পুনরায় ঠাণ্ডা মাথায় মূল্যায়নের জন্য উৎসাহিত করা হয়। সাধারণত রাগের সময় পরিস্থিতি সঠিকভাবে মেপে দেখা যায় না, ভুলভাবে কিংবা বিকৃতভাবে মানুষ পুরো পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক জরিপ করে নেয়, ফলে হঠাৎই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাগ্রেশন জেগে ওঠে।

সঠিকভাবে এই নেতিবাচক বিষয়-আশয় ধরার জন্য কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপিতে উৎসাহিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট অন্তর্নিহিত কারণ অনেক সময় চ্যালেঞ্জ করা হয়। ফলে ভুল ব্যাখ্যা বা নেতিবাচক ধারণার খোলস নিজের কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়। এভাবেই ইতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়। ইতিবাচক মূল্যায়নের ক্ষমতা নিজের মধ্যে বেড়ে যায়।

রাগকে বাগে আনা তখন মোটেই কঠিন বিষয় বলে মনে হবে না। নিজেকে অনেক বেশি দৃঢ় ও প্রত্যয়ী মনে হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলা করার শক্তি এভাবেই রপ্ত করা যায়।

রিলাক্সেশন:

ক্রোধের কারণে দেহে সক্রিয় আলোড়িত অবস্থা সৃষ্টি হয়। রিলাক্সেশন টেকনিক চর্চার মাধ্যমে সেই আলোড়ন ভিন্ন খাতে সরিয়ে দেওয়া যায়। নিজের দেহকে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা যায়।

ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা:

ক্রোধের আড়ালে অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন কিংবা মেনিয়ার মতো মানসিক রোগ লুকিয়ে থাকতে পারে। এসব রোগ রাগের তীব্রতা নানাভাবে জটিল করে তুলতে পারে। সমস্যার জট থেকে হঠাৎই যেন অগ্নুৎপাত ঘটে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরাই পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন করে ওষুধ ব্যবহার করে চিকিৎসা করবেন। ক্ষেত্রবিশেষে মুড দৃঢ় ও সুস্থিতি করার জন্য প্রয়োজনীয় অন্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

নিজের চেষ্টায় রাগ পোষ মানানোর নতুন কৌশল

পরিস্থিতি সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে। অধৈর্য বা বিরক্তি সৃষ্টি করে, এমন ঘটনা প্রথমে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করুন। নোট করে রাখুন। পরবর্তীকালে শান্ত থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেকে প্রকাশ বা এক্সপ্রেস করুন। তাড়াহুড়ো বা আক্রমণাত্মকভাবে পরিস্থিতির ভেতর সেঁটে যাওয়া নয়, অন্যকে দোষারোপ করাও নয়, এমনকি বিতর্কিত শব্দ ব্যবহার করা থেকেও নিজের জিহ্বাকে শাসন করতে হবে এ সময়।

মনে রাখুন, ক্রোধের সময় ছুড়ে দেওয়া শব্দ আপনার দেহ ও মনে স্ট্রেস রিঅ্যাকশন ঘটায়। এই রিঅ্যাকশন মানেই দেহের ক্ষতি, মনের ক্ষতি, মস্তিষ্কের ক্ষতি, হার্টের ক্ষতি। ধীরে ধীরে উচ্চরণ করুন ওম ম ম! রিলাক্স। রিলাক্স।

এভাবে চর্চা করতে শিখুন। হাস্যরসের কিছু নেই এতে। পুরো প্রক্রিয়াটাই বিজ্ঞাননির্ভর। চর্চার মাধ্যমে নিজের দক্ষতা বাড়ানো যায়। নিজেকে বিব্রত করে, নিজের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় এমন পরিস্থিতিতে যদি কৌশলটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে নিজের দক্ষতা শাণিত হবে। ক্রোধ উসকে ওঠার ঘটনা তখন আপনাকে বিপর্যস্ত করতে পারবে না, দেহে সক্রিয় আলোড়ন তুলতে ব্যর্থ হবে।

প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই ভেবে নিতে হবে

গবেষণায় দেখা গেছে, নিজস্ব মনোভাবই প্রথমে নিজের মনে রাগ উথালপাতাল করে তোলে। কেউ কেউ আছেন, প্রথম প্রতিক্রিয়ার শুরুতেই নিজেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাবতে শুরু করেন। হীনতা বা অপমানবোধে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। অন্যায়ভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সেই আলোকেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেন।

ভাবার প্রয়োজন নেই যে, কেউ আপনাকে ছোটো করতে চায়, অপমান করতে চায়। যে অপমানবোধ আপনাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, আপনার ভেতর রাগের সঞ্চার করেছে, সেটির সম্ভাব্য ভিন্ন ব্যাখ্যাটি খুঁজে দেখুন। আর একটু ভাবুন। মনোযোগ দিয়ে শুনুন। অন্যের মতামতের গুরুত্বপূর্ণ দিক অনুধাবন করার চেষ্টা করুন।

মনে রাখবেন, মানুষ নিজের অবস্থান থেকে নিজের ভুল ধরতে পারে না। নিজের ভুল স্বীকারও করতে চাই না আমরা। প্রায় সব সময়ই যেকোনো ঘটনার জন্য নিজেকে স্বচ্ছ ভাবি, অন্যকেই দায়ী মনে করি। এর উল্টোপিঠে নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখতে হবে।

প্রত্যেকেরই নিজের কাজের জন্য নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রকৃত খুঁত কোথায়, তা ধরতে হবে আবেগীয় ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে। সঠিক খুঁত ধরতে পারলেই নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এভাবেই ইতিবাচক পথে এগিয়ে যাওয়া যায়। এভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিজের হাতে চলে আসে।

দশ পর্যন্ত গণনা শুরু করুন

উন্মত্ততার সময় এই প্রক্রিয়াটি চর্চা করার কৌশল রপ্ত করে নিন। ধীরে ধীরে চর্চা করতে হবে। গভীর টানে প্রশ্বাস নিন। নিশ্বাস ছাড়–ন। অথবা রাগ উসকে ওঠার ঘটনা থেকে মহুর্তের জন্য দূরে সরিয়ে নিন নিজেকে। এর অর্থ এই নয় যে, পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে গেলেন।

শান্ত হলেই আবার ফিরে আসুন। ঘটনাটা পুনরায় মূল্যায়ন করুন। প্রয়োজনে এক-দুই দিন অপেক্ষা করুন। তারপরই আপনার প্রতিক্রিয়া জানান। কেন ক্ষুব্ধ ভাব জেগেছে, ব্যাখ্যা করুন। সামগ্রিক পরিবেশের জটিল গিট এভাবে শিথিল করা যায়।

রাগজাগানিয়া ঘটনার ভেতর হাস্যরসের উপাদান আছে কি না খুঁজে দেখুন

রসবোধই মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ঘটনা থেকে আপনাকে খানিকটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে। ঘটনার ভেতরই ঘুরপাক খেয়ে দেখুন কৌতুকের কিছু উপাদান পাওয়া যায় কি না। দ্রুত কোথাও যেতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছতে হবে কোনো বিশেষ ফাংশনে। গাড়িতে চেপে বসে শুনলেন ড্রাইভার চাবি হারিয়ে ফেলেছে। সে হয়ত তার পক্ষে হালকা যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করছে। আপনার মেজাজ নিশ্চয় চড়ে যাবে, তাই না?

খেপে না গিয়ে এমনি করে ভাবলে কেমন হয়? চাবি হারানোর সে-ই তো উপযুক্ত ব্যক্তি। নিজের চড়ে যাওয়া রাগ কি এভাবে হালকা করা যায় না? যায়। চর্চা করে দেখুন-না একবার। রাগ তরল করার জন্য রসবোধ যেকোনো পরিস্থিতি থেকেই খুঁজে বের করা যায়। ব্যক্তিবিশেষে রসবোধ অনুভব করার বৈশিষ্ট্য ভিন্নতর হয়। সবার জন্য সবকিছু সমানভাবে প্রযোজ্য না হলেও ইতিবাচক বিষয়-আশয় নেড়েচেড়ে দেখার প্রবণতা বাড়াতে পারলে লাভ বই ক্ষতি নেই।

নিজ প্রতিক্রিয়া প্রকাশের নতুন কৌশল রপ্ত করতে হবে

আমাদের চারপাশে অনেকে আছেন, দক্ষতার সঙ্গে যেকোনো হতাশাজনক পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। এমন কাউকে খুঁজে দেখুন, পেয়ে যাবেন নিশ্চয়। তাঁর যোগ্যতাকে মডেল হিসেবে নিন। সেভাবে চেষ্টা করুন। এভাবে ব্যক্তিবিশেষের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্যরে আলোকে নিজের প্রতিক্রিয়া জানানোর কৌশল রপ্ত করে নিতে পারেন। নিজের দক্ষতা অবশ্যই গড়ে উঠবে।

উদাহরণ হিসেবে সরকারি অফিসের একজন দক্ষ প্রশাসকের গল্প বলি, শুনুন। সহকর্মীদের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হলে, সমস্যা জট পাকালে ধীরেসুস্থে দ্বন্দ্ব মোকাবিলায়, সমস্যার দুটি সমাধানের পথ সবার সামনে তুলে ধরেন তিনি। সহকর্মীদের ওপর কিছু চাপিয়ে না-দিয়ে, ক্ষুব্ধতা প্রকাশ না-করে এভাবেই মীমাংসায় পৌঁছে যাওয়া যায়। আপনিও এ ধরনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত সমস্যা সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে পারেন।

চিন্তার গণ্ডি বাড়াতে হবে

কোনো কোনো চিন্তা নিজের মনে ক্ষোভ জাগাতে পারে। বিক্ষুব্ধ করতে পারে। প্রথমে সেই চিন্তাকে জটিল গিঁট খুলে মুক্ত করতে হবে। তারপর বিকল্প চিন্তার পথ বের করে নিতে হবে। এরপর পালটা অ্যাগ্রেশন বা সহিংসতা জাগে, এমন পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা চালাতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হয়ত বস অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব আপনার কাঁধে চাপিয়ে দিলেন। এমন অবস্থায় আপনি ভাববেন, বস নিশ্চয় আপনাকে টার্গেট করেছে, আপনার ভোগান্তি বাড়ানোর জন্যই অতিরিক্ত লোড বাড়িয়ে দিয়েছে।

এভাবে ভাবলে নিজের মনে ক্ষোভ জাগাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি এমন পরিস্থিতি থেকে বিকল্প চিন্তা বের করে ভাবা যায় বস আপনার ওপর সন্তুষ্ট, আপনার দক্ষতা, সততা ও নিয়মানুবর্তিতায় মুগ্ধ, আপনাকে নির্ভরশীল মনে করেন। এসব ভাবনা থেকে কি আপনার দক্ষতা আরো বেড়ে যাবে না? রাগ কি সেখান থেকে পালিয়ে যাবে না?

ক্রোধ বিষয়ক কোনো বই বা জার্নাল হাতের কাছে রাখুন

যখন নিজের মধ্যে ক্রোধের উন্মত্ততা জাগবে, ১০ ডিগ্রি রাগের স্কেলে, তা মেপে নিন। যদি স্কোর ৪ বা তার বেশি হয়, পরিস্থিতি বিষয়ক চিন্তা ও দৃশ্যমান ইমেজগুলো নোট করে রাখুন। ক্রোধের মেয়াদকাল, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি কী কী, বিস্তারিত লিখে রাখুন।

কী পদ্ধতিতে, কী পরিস্থিতিতে, কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, পুরো বিষয়টা তখন আপনার কাছে খোলাসা হয়ে যাবে। সঠিক করণীয় দায়িত্ববোধই তখন পজিটিভ দিক আপনার সামনে তুলে ধরবে।

নিজের দিকে ফিরে তাকাতে হবে

ক্রোধের কারণে নিজ জীবনে কতটকু মূল্য দিতে হয়েছে একবার মনে করে দেখুন। রাগের কারণে কি কোনো মধুর সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? ভেঙে গেছে? কর্মক্ষেত্রে কি কোনো জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে? এর ফলে কি কোনো ধরনের দৈহিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া ঘটেছে? যেমন মাথাব্যথা, বিষণœতা, ইত্যাদি।

হঠাৎ সৃষ্ট উন্মত্ততা কি সামাজিকভাবে আপনাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল? বাস্তব প্রমাণ হাতে এলে, মূল্যায়ন সঠিক হবে। নিজেকে সামাল দেওয়ার কৌশল ভেতর থেকেই আপনাকে তখন রক্ষা করবে।

রিলাক্সেশনকৌশলগুলো চর্চা করতে হবে

যেসব ঘটনা আপনার মনে ক্ষুব্ধতা জাগিয়েছিল, অলস সময় ঠান্ডা মাথায় পুরো ঘটনা ভেবে নিন। এবার প্রগ্রেসিভ মাসকুলার রিলাক্সেশনের কৌশল চর্চা করুন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের কাছ থেকে আপনাকে তা শিখে নিতে হবে। এটি মানসিক স্বাস্থ্য সেবার একটি অংশ।

মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত প্রতিটি বড়ো ধরনের পেশির সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে রিলাক্স করবেন। এ সময় মনঃসংযোগ ধরে রাখতে হবে। গভীরভাবে শ্বাস নিতে হবে এবং ছাড়তে হবে।

প্রধান লক্ষ্য হলো, নিজের অনুভূতির ব্যাপারে নিজস্ব সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা। ক্রোধের সময় নিজেকে তাৎক্ষণিকভাবে রিলাক্স করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে পেশির রিলাক্সেশন চর্চার মাধ্যমে।

নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে

নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের হতাশা মোকাবিলা করার কৌশল রপ্ত করা যায়। মনে রাখতে হবে, হতাশা থেকেও অ্যাগ্রেশন রিলিজ হয়। সেই সহিংসতার চিত্র হয় ভয়াবহ।

ছোটোখাটো ভুল ক্ষমা করার শক্তি থাকতে হবে নিজের মনে ক্রোধের ব্যাপারে দায়িত্বটুকু নিজের কাঁধে নিতে হবে। অভিজ্ঞতার আলোকে নিজস্ব ট্র্যাকে ফিরে আসতে হবে। অন্যের যেনতেন ভুল উদারভাবে বিবেচনা করার শক্তি অর্জন করতে হবে।

যদি এরপরও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রোধের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন, ম্যানিয়া ইত্যাদি মানসিক রোগ। ওষুধের মাধ্যমে এমনতরো পরিস্থিতিতে চিকিৎসা করা সম্ভব। আগেই এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ : প্রসঙ্গ দাম্পত্য সম্পর্ক

যদি কেউ ঘটনা পরম্পরায় উন্মত্ত হয়, পুরোপুরিই নিজের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে নিজের প্রচেষ্টায় রাগ পোষ মানানোর কৌশলগুলো কাজে লাগবে না।

দাম্পত্য সম্পর্কের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এমন পরিস্থিতিতে করণীয় কী

উত্তেজিত পার্টনারকে বলুন, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি শান্ত না হবে, আমাকে সম্মান দেখাতে যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে কথা বলব না। যতক্ষণ পর্যন্ত পার্টনারের উদ্যত মেজাজ কমে না আসে, সেই ফাঁকে সমস্যা সম্পর্কে খানিকটা ভেবে নিন।

কেন রাগ হলো? কী করা উচিত? কীভাবে কম্প্রোমাইজ বা সমঝোতা করতে চান? পুরো ঘটনা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখুন। সঙ্গী বা সঙ্গিনীর দোষ ধরার চেষ্টা করবেন না। তার যতই দোষ হয়ে থাকুক, তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করে খোলামেলা নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরুন। আলাপ করুন।

আমি ফিল করছি, আমি চিন্তা করছি, আমি চাই ইত্যাদি ঢঙে আলাপ শুরু করুন। দোষ লেবেল করার প্রবণতা পরিহার করতে হবেই। নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেও বকাঝকা চলবে না, ব্যঙ্গবিদ্রুপের মাধ্যমে অপরকে হাস্যস্পদ করার পথে কখনোই এগিয়ে যাবেন না।

কী চাচ্ছেন? কী চাচ্ছেন না? পার্টনারের কাছে খোলামেলা বিষয়টি নিয়ে আলাপ করে রাখুন। মনে মনে কিছু একটা চাচ্ছেন, মুখ ফুটে তা সঙ্গীকে কখনোই বলেননি। আশা নিয়ে বসে আছেন, নিজে থেকেই সঙ্গী আপনার চাওয়ার বিষয় বুঝে যাবে, সেই হিসেবে পদক্ষেপ নেবে।

অগ্রিম এমন আশা করে বসে থাকবেন না। বরং অন্যের বক্তব্য শুনুন। নিজের সব কথা তাকে খুলে বলুন। এই প্রচেষ্টা হয়ত অভিমানের তলে চাপা পড়ে থাকে। চাপা পড়লেই ভুল হবে। এতে সংঘাত বাড়বে। আপনার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, ক্রোধ তরল হবে না। উত্তরোত্তর রাগের তীব্রতা ও মেয়াদকাল বাড়তেই থাকবে।

এই ধরনের বাড়তি প্রবণতা দাম্পত্য সম্পর্কে ধস নামিয়ে দেয়। বিপদ অবশ্যম্ভাবী পথে হানা দেয়। নিজের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, রাগ সামাল দিয়ে দাম্পত্য সম্পর্ক মধুর রাখার জন্য কাউন্সেলিংয়ের আশ্রয় নিতে পারেন আপনি।

ক্রোধের স্কেল : মেপে নিন ক্রোধের মাত্রা অন্যান্য অনুষঙ্গ

আপনার রাগ কি দেহ-মনের জন্য ক্ষতিকর?  মেপে দেখতে চান রাগের তীব্রতা, মেয়াদকাল কিংবা রাগের ফ্রিকোয়েন্সি?

হ্যা, রাগ মাপা যায়। নিচের প্রশ্নগুলোর জবাব দিন। ক্রোধ পরিমাপ করে নিন। প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠজন বন্ধু-বান্ধবীর সহায়তা নিন, সঠিক উত্তরের জন্য সৎ হোন, সংকোচমুক্ত হোন।

গত সপ্তাহে কতবার রাগান্বিত হয়েছিলেন?

একবারও না। পুরো সপ্তাহে এক বা দুই বার। পুরো সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচবার। প্রতিদিন প্রায় দুই বার। প্রতিদিন প্রায় তিন বার। প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ বার। প্রতিদিন প্রায় ৬-১০ বার। প্রতিদিন ১০ বারেও বেশি।

স্কোর দেওয়ার কৌশল :

সঠিক উত্তরের বা পাশের বক্সে টিক চিহ্ন দিন। যদি রাগের পুনঃপুন সংঘটন (ফ্রিকোয়েন্সি) সপ্তাহে ৩-৫ বা তদূর্ধ্ব বার সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে নিজেকে স্কোর দিন ২। অন্যথায় স্কোর করুন ১।

কতক্ষণ ধরে আপনার ক্রোধ বজায় থাকে?

৫ মিনিটের কম। ৫-১০ মিনিট। ৩০ মিনিটের কম। ৬০ মিনিটের কম। এক-দুই ঘণ্টা। অর্ধ দিবস। পুরো দিন। এক দিনেরও বেশি।

স্কোর দেওয়ার কৌশল :

সঠিক উত্তরের বা পাশের বক্সে টিক চিহ্ন দিন। যদি রাগের মেয়াদকাল এক দিনেরও বেশি হয়। তাহলে নিজেকে স্কোর দিন ২। অন্যথায় স্কোর করুন ১।

তীব্রতার দিক থেকে গড়পড়তা আপনার ক্রোধের মাত্রা কত?

১: ২ : ৩ : ৪ : ৫ : ৬ : ৭ : ৮ : ৯ : ১০

মৃদু তীব্র

স্কোর দেওয়ার কৌশল :

মাত্রা যদি আট বা তার বেশি উঠে যায়, তাহলে নিজেকে স্কোর দিন ২। অন্যথায় স্কোর করুন ১।

স্কোর মূল্যায়ন করে নিন

নিচের পদ্ধতিতে তিনটি ধাপের স্কোর যোগ করুন।

এখানে ক্রোধের পুনঃপুন সংঘটন (ফ্রিকোয়েন্সি), তীব্রতা ও মেয়াদকাল পরিমাপ করা হয়েছে:

প্রশ্ন ১          প্রশ্ন ২        প্রশ্ন ৩        মোট

…………….. x …………… x ………….. = …………..

ফ্রিকোয়েন্সি  মেয়াদকাল  তীব্রতা

স্কোরের ব্যাখ্যা

যদি স্কোর হয় ১: আপনার ক্রোধ শাসন করার ক্ষমতা অসাধারণ। নিজের প্রতি, পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবীর প্রতি এই স্কোর মোটেই ক্ষতিকর নয়।

যদি স্কোর হয় ২: ক্রোধের তিনটি অনুষঙ্গের (ফ্রিকোয়েন্সি, মেয়াদকাল ও তীব্রতা) যেকোনো একটিতে আপনার সমস্যা রয়েছে। মাত্র একটি

ডাইমেনশনে সমস্যা থাকার অর্থ এই নয় যে আপনি বিপদমুক্ত। যেমন ধরুন- ক্ষেত্রবিশেষে হঠাৎই অতি উন্মত্ততা, ক্ষুব্ধতা দেখিয়ে ফেলেন আপনি। এটি কি সমস্যা নয়?

চোখের পলকে এ ধরনের ঝলসে ওঠা অবশ্যই নিজ দেহের ওপর প্রভাব ফেলে। এমনটি ঘটলে অবশ্যই অন্যের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের ভিত কাঁপিয়ে দেবে। খুশির খবর এই যে, এ ধরনের ক্রোধের কোপানল থেকে নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন। ওপরে বর্ণিত নিজের চেষ্টায় রাগ পোষ মানানোর নতুন কৌশলগুলো চর্চা করে যেতে থাকুন। বিপদ হানা দিতে পারবে না আপনার জীবনে।

জেনে রাখুন, শিশুকাল থেকেই সামাজিক শিক্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের মেজাজ আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠে। এসব শোধরানো সম্ভব। প্রয়োজন নিয়মিত কৌশলচর্চা ও অধ্যবসায়।

যদি স্কোর হয় ৪: এর অর্থ এই যে, ক্রোধের যেকোনো দুটি অনুষঙ্গে আপনার সমস্যা রয়েছে। স্কেল এই অবস্থানে থাকলে কখনোই আপনি ভালো বাবা বা মা হতে পারবেন না। আপনার দাম্পত্য সম্পর্ক নড়বড়ে হয়ে যাবে। সর্বোপরি আয়ুষ্কালও কমে যাবে আপনার।

যাদের রাগ মধ্যম মানের তারাই ক্রোধের নিম্নলিখিত তিনটি ধারার যেকোনো একটিতে অবস্থান করছেন:

উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি/উচ্চমাত্রা → জীবন্ত আগ্নেয়গিরির তুল্য।

উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি/দীর্ঘ মেয়াদকাল → ধীরে দহনকারী।

উচ্চমাত্রা/দীর্ঘ মেয়াদকাল → ঘুমন্ত সিংহের সঙ্গে তুল্য।

এ ধরনের ক্রোধ একাকী মোকাবিলা করা কঠিন। নিজের চেষ্টায় রাগ পোষ মানানোর নতুন কৌশলগুলো চর্চা করে দেখতে পারেন। ব্যর্থ হলে অবশ্যই কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিতে হবে আপনাকে।

যদি স্কোর হয় ৮: এর অর্থ এই যে, ক্রোধের তিনটি অনুষঙ্গেই আপনার বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। স্কোরের এই উচ্চমান অবশ্যই টক্সিক (Toxic) রাগেরই বহিঃপ্রকাশ। জেনে নিন। আপনার ভয়াবহ শত্রু ওত পেতে বসে আছে। ক্রোধের বিষাক্ত ছোবল নিঃশেষ করে দিচ্ছে আপনাকে। বিলম্ব না করে অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করতে হবে আপনাকে।

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল

কথাসাহিত্যিক ও প্রাক্তন পরিচালক

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট

more

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here