আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে এমন একটি সিস্টেম যার ফলে কম্পিউটার সিস্টেম বা যন্ত্র মানুষের মতো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, চিন্তা করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে, পরিকল্পনা করে, এমনকি বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও করে। প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে যন্ত্রটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে এটি নিজের বুদ্ধিমত্তা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জটিল কাজও সম্পন্ন করতে পারে।
এআই মূলত বিপুল পরিমাণ তথ্য (Data) সংগ্রহ করে এবং পরবর্তিতে ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করে কাজ করে। ফলে নতুন কোনো তথ্যের মুখোমুখি হলে পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে প্যাটার্ন বা ধরন খুঁজে বের করে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারে। আমরা বর্তমান সময়ে প্রতিনিয়তই প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজনে নিজের অজান্তেই এআই ব্যবহার করে থাকি। যেমন: চ্যাটজিপিটি (ChatGPT), গুগলের জেমিনি, সিরি (Siri) ইত্যাদি।
এআই দিয়ে কীভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞান তথা মানসিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে সহজলভ্য করা যায় কিংবা এই ক্ষেত্রে এর আদৌ গুরুত্ব কতটুকু? এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানসিক রোগ নির্ণয় তথা চিকিৎসাকে সহজলভ্য করে তুলতে সক্ষম। এটি দীর্ঘ অপেক্ষার সময় কমায় এবং ২৪ ঘণ্টা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদানে সাহায্য করতে পারে। তবে এটি মানুষের তৈরি করা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে কখনোই কাজ করতে পারে না, বরং তাঁদের পরিপূরক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে।
আরও দেখুন…
কীভাবে এআই মানসিক চিকিৎসাকে সহজলভ্য করতে পারে?
তাৎক্ষণিক জরুরি সহায়তা: এআই এর মাধ্যমে চালিত চ্যাটবট দিয়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই মানসিক চাপের মুহূর্তে প্রাথমিক পরামর্শ ও রিলাক্সেশন কৌশল গ্রহণ করা সম্ভব। কারণ চ্যাটবট হলো এমন এক ধরণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা মানুষের কথোপকথন অনুকরণ করে। এটি মেসেজ বা কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলতে বা বিভিন্ন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে পারে।
দূরবর্তী চিকিৎসা (Telepsychiatry): ভিডিও কনফারেন্সিং ও রিমোট মনিটরিং টুলের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরাও ঘরে বসেই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারছেন।
সাশ্রয়ী: প্রচলিত থেরাপির চেয়ে এআই অ্যাপ ব্যবহারে সময় ও খরচ অনেক কম হয় এবং বুকিং করার কোনো ঝামেলা থাকে না।
স্টিগমা মোকাবিলা: অনেক রোগী সরাসরি মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিজেদের সমস্যাগুলো বলতে লজ্জা পান বা দ্বিধা বোধ করেন। এআইয়ের সাথে খোলামেলা কথা বলার ক্ষেত্রে এই সামাজিক লজ্জা বা ভীতি কাজ করে না।
প্রাথমিক রোগ নির্ণয়: বিভিন্ন ডিভাইস (যেমন-স্মার্টওয়াচ) এবং এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর ঘুমের ধরন, হার্টের স্পন্দন বিশ্লেষণ করে বিষণ্নতা বা উদ্বেগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা যায়।
চিকিৎসা সহায়তা: এআই বিপুল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করে প্রতিটি রোগীর জন্য উপযোগী চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করে চিকিৎসকদের চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে মানসিক রোগ চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে কিছু ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতাও আছে। যেমন:
মানবিক আবেগের অভাব: এআই মানুষের আবেগ, শারীরিক ভাষা বা চোখের ভাষা বুঝতে পারে না, যা জটিল মানসিক রোগ নির্ণয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তাৎক্ষণিক বিবেচনা: এআই গুরুতর মানসিক রোগ বা সংকটপূর্ণ উপসর্গ মোকাবিলা করতে মানবিক বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে সক্ষম নয়।
গোপনীয়তা ও নির্ভরযোগ্যতা: সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়া বা এআই থেকে ভুল নির্দেশনা পাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
তবে এআই কখনোই একজন পেশাদার চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারে না। জটিল মানসিক রোগের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মানবিক আবেগ, বিচক্ষণতা ও বিবেচনাবোধের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। তাই এআই-কে প্রাথমিক সহায়তা টুল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার একটি আধুনিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করাই শ্রেয়।
- অধ্যাপক ডা. সুস্মিতা রায়
- অধ্যাপক, মানসিক রোগ বিভাগ,
- সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ।


