ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম: পেটের সমস্যায় মানসিক চিকিৎসকের ভূমিকা- ২য় পর্ব

0
146

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আই বি এস) নিয়ে প্রথম পর্বে এ রোগ কী, কেন হয়, এর লক্ষণগুলো কী কী এবং এর চিকিৎসা পদ্ধতি কেমন হবে তা নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
আগের লেখাতে মুনির সাহেবকে (যিনি একজন আই বি এস রোগী) যখন বলা হয়েছিলো মানসিক চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হতে তখন তিনি অবাক হয়েছিলেন, প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আই বি এস কি মানসিক রোগ?’
এ  লেখায় মুনির সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে আই বি এ- এর সঙ্গে মানসিক রোগের সম্পর্ক ও এর চিকিৎসায় মানসিক চিকিৎসকের ভূমিকা কী তা জানানোর চেষ্টা থাকবে।
আই বি এস ও মানসিক সমস্যা একই সঙ্গে থাকতে পারে, কিন্তু একটির কারণেই অন্যটি হয়, এমন কোনো প্রমাণ বা এ দুটোর মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় নি।
আই বি এস শুরু হতে পারে জীবনের কোনো ঘটে যাওয়া খারাপ ঘটনা, জীবাণু সংক্রমনের পর, দীর্ঘ রোগে ভোগার পর, এমনকী আগে থেকেই চলে আসা মানসিক রোগের কারণেও।  মানসিক চাপ, মানসিক বা শারীরিক আঘাত বা নির্যাতন যা আই বি এস এ আক্রান্ত করতে বা তা বাড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।  ঠিক একইভাবে অনেক মানসিক সমস্যার উৎস এই আই বি এস।  যেমন- দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া, বিষন্নতা, সোমাটিক সিমটম ডিজঅর্ডারসহ আরো নানা কারণে এ রোগ দেখা দিতে পারে।  গবেষণায় দেখা গেছে ২০-৬০ ভাগ মানসিক সমস্যা আই বি এস রোগীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিন ধরে পেটের সমস্যা, রোগ নিয়ে ভয়-ভীতি মানুষের মন ও শরীরের ওপর সমানভাবে খারাপ প্রভাব ফেলে।  একটি আরেকটিকে প্রভাবিত  করতে থাকে। একটানা আই বি এস সমস্যায় ভোগার ফলে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই মানসিক সমস্যা ও মানসিক চাপ আই বি এস-এর লক্ষণগুলো বাড়িয়ে দেয় দিন দিন।  মানসিক চাপ অন্ত্রের কার্যকারিতা ও প্রদাহ বাড়িয়ে দেয়। এমনকী অল্পতেই পেটে ব্যথা তৈরি করে।
রোগের কারণে বারবার শারীরিক পরীক্ষা করানো, রোগ সম্পর্কে ধারণা কম থাকা, রোগীর মধ্যে দুঃশ্চিন্তা, ভয় ও রোগ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা যা রোগীর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয় এবং রোগের লক্ষণগুলো বৃদ্ধি পেতে থাকে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে আই বি এস এর লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই রোগী মানসিক কোনো সমস্যায় ভুগতে থাকে যা রোগী গুরুত্বহীন মনে করে।  আবার অনেক সময় দেখা যায় আই বি এস-এর সঙ্গে বিষন্নতার বিষয়টি পাশাপাশি থাকে। কিন্তু রোগী চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হন শুধু শারীরিক সমস্যাগুলোর জন্য।  ফলে দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যাগুলোর কোনো চিকিৎসা হয় না এবং এই সব মানসিক সমস্যার জন্য রোগী তার আই বি এস নিয়ে দিনের পর দিন ভুগতে থাকেন।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, মস্তিষ্ক-অন্ত্র অক্ষের জটিলতা আই বি এস-এর একটি কারণ।  কিছু কিছু জৈব রাসায়নিক যেমন-সেরটনিন (Serotonin),   নরইপিনেফ্রিন (Norepinephrine) এবং অপিওয়েডস (Opiods)  অন্ত্রের অতিরিক্ত কার্যকারিতা বা সংবেদশীলতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ব্যবহৃত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টগুলো (Antidepressant) সেরটনিন (Serotonin) ও নরইপিনেফ্রিন (Norepinephrine) নামক জৈব রাসায়নিকগুলোর মাধ্যমে কাজ করে সরাসরি  মস্তিস্ক-অন্ত্র অক্ষে পরিবর্তন সাধন করে।
যারা অনেক বেশি এবং দীর্ঘদিন ধরে আই বি এস-এর সমস্যায় ভুগছেন তাদের কেন্দ্রীয় ব্যথা নিয়ন্ত্রণকারী পদ্ধতিতে জটিলতা সৃষ্টি হয় যা সাধারণত কার্যকর হয় এইসব একই জৈব রাসায়নিকের জন্য। এসব জৈব রাসায়নিক যেমন সেরটনিন, নরইপিনেফ্রিন এবং অপিওয়েডস অন্যান্য মানসিক সমস্যার জন্যও দায়ী।
যদিও একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত তবুও আই বি এস কোনো মানসিক রোগ নয়।  আই বি এস-এর কারণে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে আবার কোনো মানসিক চাপ বা মানসিক সমস্যার কারণে  আই বি এস শুরু হতে পারে।  তাই আই বি এস চিকিৎসায় মানসিক চিকিৎসকের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক চিকিৎসকের ভূমিকা:
১) দীর্ঘদিন রোগের কারণে রোগীর রোগ সম্পর্কে ভয় বা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়। অনেকে ভাবতে থাকেন এটা কোনো ক্যান্সার কিনা। চিকিৎসকের রোগীকে রোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না দেওয়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।  তাই প্রথমত রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে রোগটা সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে মানসিক চিকিৎসক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন।
২) আই বি এস-এর যেসব রোগী পূর্ব থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন যাদের অনেকে এসব সমস্যাকে কোনো সমস্যাই মনে করেন নাই, চিকিৎসাও নেন নাই, আবার যাদের আই বি এস এর পাশাপাশি মানসিক সমস্যা রয়েছে, একজন মানসিক চিকিৎসক সেসব সমস্যা খুঁজে বের করে তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
৩) বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে কিছু কিছু ওষুধ যেমন- অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (Antidepressent), অ্যাংসিওলিটিস (Anxiolytics), মুড স্টেব্যুলাইজারস (Mood stabilizers), অ্যান্টিসাইকোটিকস (Antipsychotis) এর  যথাযথ প্রয়োগ একজন মানসিক চিকিৎসকই করতে পারেন। অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ব্যথা কমাতে, দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যকারিতা বাড়াতে এমনকি আই বি এস এর লক্ষণগুলো কমাতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা যায়, যেসব রোগীকে আই বি এস-এর ক্ষেত্রে অ্যান্টিডপ্রেসেন্ট দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে প্রতি তিন থেকে চার জনের মধ্যে একজনের রোগের লক্ষণ হ্রাস পেয়েছে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিসাইকোটিকস  যেমন রিসপারিডন (Risperidone), ওলানজাপেইন (Olanzepine) এবং কোটাইয়াপেইন (Quietapine) ব্যবহার করে উপকার পাওয়া গেছে।  বিশেষ করে পেটের ব্যথা কমানোর ক্ষেত্রে। পেটের ব্যথা কমানোর জন্য মুড স্টেব্যুলাইজারের  ভূমিকাও খুঁজে পাওয়া গেছে।
৪) যেসব রোগী এক বছর পরেও অন্য চিকিৎসায় ভালো হন না তাদের জন্য সাইকোথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে যা একজন মানসিক চিকিৎসকই সঠিকভাবে দিতে পারেন। যেমন-কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি, মাইন্ডফুলনেস এবং হিপনোথেরাপি।
সাইকোথেরাপি চাপের প্রতি প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে আই বি এস-এর লক্ষণগুলো কমাতে সাহায্য করে।
প্রায়শই দেখা যায় আই বি এস চিকিৎসায় অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের ব্যবহার জেনারেল প্র্যাকটিশনার থেকে শুরু করে পাক ও পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞ পর্যন্ত করে থাকেন কোনো ধরনের মানসিক এসেসমেন্ট ছাড়াই।
অনেক রোগীই আছেন যারা দীর্ঘদিন রোগে ভোগার পরও ঠিকমত জানেন না তাদের রোগটা কী? আই বি এ- এর সঙ্গে বা কারণে যে মানসিক সমস্যা থাকতে পারে বা নতুন রূপে দেখা দিতে পারে তাও অনেকের অজানা।
তাই শুরুতেই একজন রোগীকে রোগ এবং এর চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারলে মুনির সাহেবদের মতো  বিভ্রান্তিতে পড়তে হবে না। শুধু তাই নয় দীর্ঘদিনের রোগে ভোগার হাত থেকেও নিস্তার পেতে পারেন।
১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here