আমাদের শিশু ও তাদের ভাষা সমস্যা

সাধারণত আমরা একটিস্বাভাবিক শিশুবলতে বুঝি সেই শিশুটির শারীরিক, মানসিক স্নায়ুবিক সমস্যা ছাড়া সুস্থ সবলভাবে বেড়ে উঠা। রোগ শোকের কারণে শিশুর শারীরিক মানসিক বৃদ্ধি হঠাৎ করেই যেমন থেমে যেতে পারে, তেমনি বিভিণ্ণ স্নায়ুজাত শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে শিশুর সম্ভাবনাময় ভাষার বিকাশ পর্বটি পরিপূর্ণ নাও হতে পারে, অথবা তার বিকশিত ভাষা দক্ষাতাটি হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
আজকের পৃথিবীতে ‘ভাষা সমস্যা’ এই অণিবার্য বাস্তবতা। পৃথিবীর সব ভাষা সমাজেই ভাষা সমস্যায় আক্রান্ত শিশু পাওয়া যায়। ভাষা সমস্যা শুধু বর্তমান সময়ের সমস্যা নয়, বরং সব যুগেই এর অস্তিত্ব ছিল। যেহেতু ‘ভাষা সমস্যা’ বিষয়টির ব্যাপারে মানুষ তখন সচেতন ছিল না, সেহেতু ধরনের সমস্যা নিয়ে তাদের ভাবনার অবকাশও ছিল না। তার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, তখন ভাষা সমস্যা ছাড়াও আরও অনেক তীব্র দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক মানসিক সমস্যাদি বর্তমান ছিল, যার দরুণ সে সময়কার মানুষ সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকার তেমন কোনো প্রয়োজনীয়তা বোধ করতেন না।
গত ২৯ জুন মনেরখবরে প্রকাশিত প্রবন্ধটি থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে ভাষা ব্যাপারটি কি, এবং কীভাবে ‘ভাষা বিকাশ’ পর্বটি পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। আসুন এবার আমরা জানতে চেষ্টা করি ‘ভাষা সমস্যা’ বলতে আসলে আমরা কী বুঝি?
সাধারণভাবে ‘ভাষা সমস্যা’ অভিধাটি ইঙ্গিত করে শিশুর এমন একটি ভাষিক অবস্থা যার ফলে তার স্বাভাবিক ভাষাগত উপাদানসমূহের বিকাশ বা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। শিশুর ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে ধরনের প্রতিবন্ধকতার দু’টি মাত্রা আছে। একটি হচ্ছে ভাষা বিলম্ব এবং অন্যটি হচ্ছে ভাষা বৈকল্য।
উপরের উল্লেখিত মাত্রা দুটি ভাষা সমস্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। যদিও ভাষা সমস্যা বিষয়ে ধরনের পার্থক্য সব সময় পরিষ্কার নয় তথাপি দুটির সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো
ভাষা বিলম্ব
ভাষা বিলম্ব হচ্ছে ভাষা বিকাশের এমন একটি অবস্থা যাতে শিশুর ভাষাগত উপাদানসমূহ যেমনধ্বনি, অক্ষর, শব্দ, বাক্য ইত্যাদি উপাদানসমূহের দেরিতে বিকাশ ঘটে। ধরনের ভাষা বিলম্ব যদিও গুরুতর ভাষা সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় না, তথাপি কোনো শিশুর মধ্যে যদি ভাষা বিলম্বের উপসর্গ পরিলক্ষিত হয় তাহলে দেরি না করে যেকোনো ভাষা বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয়।
ভাষা বৈকল্য (Language Disorder)
ভাষা বৈকল্য হচ্ছে ভাষা অনুধাবন এবং ব্যবহার। বিশেষ করে বাচনিক এবং অবাচনিক-এ সংক্রান্ত প্রতীকী চিহ্নসমূহের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকারগ্রস্থ একটি বিশেষ অবস্থা। শিশুর ভাষা বৈকল্য সাধারণত তার মস্তিষ্কের কোনো না কোনো অসম্পুর্ণতা বা ক্ষতির কারণে হয়ে থাকে। তবে শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি বা প্রদাহ যদি তার স্বাভাবিক ভাষা বিকাশের পরে হয় এবং এ কারণে ভাষা সমস্যা দেখা দেয়, তখন এ ধরনের ভাষা বৈকল্যকে অর্জিত ভাষা বৈকল্য (Acquired Language Disorder) বলা হয়। আর মস্তিষ্কের অসম্পুর্ণতা বা অদৃশ্য ক্ষতি যদি শিশু তার জন্মের সময় নিয়ে আসে এবং তার ফলে শিশুর ভাষা সমস্যা দেখা যায়, তখন তাকে বর্ধনমূলক ভাষা বৈকল্য (Developmental Language Disorder) বলা হয়।
উপরে উল্লেখিত মাত্রা দুটি ‘ভাষা সমস্যার’ সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। নিম্নে কারণগুলোকে বিষয়ভিত্তিক আকারে সাজিয়ে প্রকাশ করা হলো-
১) বংশগত বা জন্মকালীন কারণ-
বংশগত বৈকল্য
বাবা, মা থেকে প্রাপ্ত জটিলতা
অপরিপক্ক জন্ম
২) চিকিৎসা বিজ্ঞানগত কারণ-
শ্রবণ সমস্যা
ভোলার ক্ষেত্রে সমস্যা
ক্লেপ্ট পেলেট
স্নায়ুগত বিকাশের ক্ষেত্রে সমস্যাদি
দীর্ঘকালীন শারীরিক সমস্যা
সীসাজনিত বিষ সংক্রামন
৩) পারিবারিক/পরিবেশগত কারণ-
শ্রবণ বাচন বা ভাষা সমস্যার পারিবারিক ঐতিহ্য।
পিতামাতার শ্রবণগত বা জ্ঞানমূলক সীমাবদ্ধতা
পালক পিতা-মাতা কর্তৃক অবহেলিত শিশু।
পরিবারে কর্মজীবি পিতামাতা কর্তৃক অবহেলিত শিশু।
পরিবারে ভুল চিকিৎসার ইতিহাস।
একটি শিশু যদি ‘ভাষা সমস্যায়’ আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে আমরা সহজেই নিম্নে উল্লেখিত প্রধান উপসর্গ দিয়ে চিহ্নিত করতে পারি।
ক) সরাসরি বক্তার দিকে মুখ তুলে চোখে চোখে (Eye Contact) না তাকানো।
খ) শিশুর আয়ত্তকৃত শব্দের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বিশেষ করে যাই, করি, খাই ইত্যাদি পরিচিত ক্রিয়াপদ ব্যতীত বৈচিত্রময় ক্রিয়াপদের সংখ্যা নেই বললেই চলে।
গ) ভাষা অনুধাবনের (Reception of Language) তাৎপর্যপূর্ণ ঘাটতি।
ঘ) স্বল্প পরিমাণ প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি, যথা- টা টা (Abving) বা অঙ্গুলি নির্দেশে কিছু দেখানো (Pointing)।
ঙ) প্রতীকী খেলা (Symbolic Play) খেলতে অসামর্থ্য
চ) সমবয়সীদের সাথে অন্তরঙ্গ (Peer Relationship) হতে সমস্যা।
ছ) কিছু স্বরের পুনঃ পুনঃ (Imitative Babble) অনুকরণ।
জ) সংলাপ (Conversation) চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা।
ঝ) আচরণগত সমস্যা (Behavioural Problem)।
ঞ) ধ্বনিগত সমস্যা, বিশেষ করে সীমিত বাকপস্ফুট (babbling) এবং স্বল্প স্বরগত রূপায়ন (Vocalization)।
একটি স্বাভাবিক শিশুর ৪-৫ বছরের মধ্যে মৌলিক ভাষা সমন্বয় ভিত্তি গঠিত হয়ে যায়। যদি কোনো শিশু ৪-৫ বছরের মধ্যে দৈনিক ৫-১০টি শব্দ পরিবেশ (Situation) এবং প্রতিবেশ (Context) অনুযায়ী প্রকাশ করতে না পারে তাহলে তা আশঙ্কাজনক বা উদ্বেগজনক লক্ষণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

Previous articleবিষণ্নতা সম্পর্কে যা জানা প্রয়োজন
Next articleআজ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস
ডা. ফাহমিদা ফেরদৌস
চিকিৎসা ভাষাবিদ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক (মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ) জেড,এইচ, সিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here