অভিভাবকগণ প্রতিদিন বাসায় বসে রাজার মতো মাদক গ্রহণ করে

0
14
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

সমস্যা : শুধু ছেলে-মেয়েদের মাদক গ্রহণ নিয়ে এতো আলোচনা কিন্তু যখন অভিভাবকগণ অহরহ প্রতিদিন বাসায় বসে রাজার মতো মাদকগ্রহণ করে সেটা নিয়ে কি সোচ্চার হওয়া উচিত নয়? আমার ধারণা মতে শতকরা ৫০-৬০% ছেলেমেয়ে অভিভাবকেরা এসব লজ্জাহীন কাজের জন্য পাবলিক প্লেসে লজ্জিত হয়। যার ফলে তারাও এক সময় মাদকে আসক্ত হয় এর থেকে পরিত্রাণের উপায় আছে কি? -মাহমুদুল হাসান

অধ্যাপক ডা. মহাদেব চন্দ্র মন্ডল : মাহমুদুল হাসান সাহেব আপনার সুন্দর প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। বর্তমান সময়ের জন্য উপযুক্ত প্রশ্ন কারণ অভিভাবকগণ যদি রাজার মতো মাদক গ্রহণ করে তাদের দেখে দেখে ছেলে-মেয়েরাও কৌতূহলবশত মাদক গ্রহণ করতে পারে। আবার উল্টোটাও হতে পারে। যেমন-কোনো পরিবারের যদি এক ছেলে নেশা করে তবে অন্য বড়ো বা ছোটোদের নেশা করার ঝুঁকি বেড়ে যায় এমনটি অভিভাবকদের নেশা করার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যে পরিবারে মুরব্বিরা নেশা করে তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে বা রাস্তাঘাটে তাদের অভিভাবকদের নেশার কারণে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। টিটকারী সহ্য করতে হয়। নেশাখোরের ছেলে-মেয়ে বলে। ফলে ছেলে-মেয়েরা না বুঝে বিপথে চলে যায়। নেশা করে, খারাপ পথেও চলে যেতে পারে। মাদক নেশার অন্যকারণও হতে পারে। যেমন-সমবয়সীদের চাপ, বেকারত্ব, মাদকের সহজলভ্যতা, কৌতূহল, পারিবারিক কলহ, ধূমপান, চিকিৎসা সৃষ্ট মাদকাসক্তি ইত্যাদি। মাদকসক্তের মধ্যে ৯৮ ভাগই ধূমপায়ী। অতএব বলা যায় মাদকসক্তির নাটের গুরু হচ্ছে সিগারেট। সে দিন এক অভিভাবক এসেছেন তার ছেলেকে নিয়ে আমার কাছে চিকিৎসা করাতে গাঁজা খায় বলে। তাকে চিকিৎসা দিলাম পরে রোগীর বাবা আমাকে টেলিফোন করে বলে যে, স্যার আমিও আপনার কাছ থেকে চিকিৎসা নিবো। আমি উইড খাই।

তখন তাকে একটি গল্প বললাম যে, একটি স্কুল পড়ুয়া ছেলে রোজ মিষ্টি খেত। তার বাবা খুব গরীব ছিল তাই এক হুজুরের কাছে নিয়ে গেল সমস্যা সমাধানের জন্য। হুজুর কয়েকদিন পর আসতে বলল এবং তারা আসল হুজুরের সাথে দেখা করল। আবার কয়েকদিন পর আসতে বলল এরপর আসার পর ছেলেকে সুন্দর করে, ভালো কথা বলে বুঝিয়ে বলল, তখন অভিভাবক বলল এই কথা আসেনি। প্রথমদিনই কাউন্সেলিং করতে পারতেন। তখন তিনি বললেন যে, তিনি নিজেও মিষ্টি খেতেন। নিজেরটা নিজের মিষ্টি খাওয়ার লোভ সংবরণ করে তারপর উপদেশ দিলেন। তাই যে পরিবারে অভিভাবক নেশা করে সেই পরিবারের সবাইকে একই সাথে চিকিৎসা নিতে হবে। আর যারা মাদকাসক্তিতে ভুগে অর্থাৎ আসক্ত ব্যক্তির সাথে সাধারণত মা নেশা না করেও মাদকাসক্তিতে ভুগে ফলে চিকিৎসা বাধাপ্রাপ্ত হয়। অতএব এখানে তার চিকিৎসা অর্থাৎ কাউন্সেলিং করা জরুরি।

এর থেকে পরিত্রানের উপায় হচ্ছে তিনভাবে,

১. চাহিদা হ্রাস (Demand Reduction)

২. সরবরাহ হ্রাস (Supply Reduction)

৩. ক্ষতি হ্রাস (Harm Reduction)

সরবরাহ হ্রাস : মাদকের একটা অন্যতম কারণ হলো Availability of the substance in the society অর্থাৎ মাদকের সহজলভ্যতা। যে কেউ কৌতূহলবশত বা যেকোন অবস্থায় নেশা করে ফেলতে পারে। দেখা গেছে বন্ধুবান্ধবদের চাপে পড়ে কেউ যদি পরপর কয়েকদিন নেশা করে তবে তার নেশার ওপর নির্ভরশীলতা (Dependency) হওয়ার সমূহ সম্ভবনার ঝুঁকি থাকে। তখন তার চিকিৎসা প্রয়োজন। তাই দেশে সরবরাহ অন্য দেশ হতে সরকারি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।

ক্ষতি হ্রাস : ক্রমাগত মাদক গ্রহণের ফলে কিডনি, লিভার ও ফুসফুসের ক্ষতি হয়। যৌনসক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, হার্ট ও ত্বকের সমস্যা, গর্ভপাত হওয়া, স্মৃতি শক্তি লোপ, এনজাইটিং, ডিপ্রেশন, রক্তশূন্যতা, আত্মহত্যার প্রবণতা, সন্দেহ প্রবনতা এছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে।

আই ডি ইউ (IDU) অর্থাৎ ইনজেকশনের ফলে ফোঁড়া, ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়া, এন্ডোকাডটিস, এম্বোলিজম এই সমস্ত ক্ষতি হওয়ার সমূহ সম্ভবনা থাকে।

IDU এর ফলে HIV/AIDS, Hepatities B ও C এর প্রতিরোধ করা অতএব এজন্য চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজন হয়।

চাহিদা হ্রাস বা নিরোধ শিক্ষা কার্যμম (Demand Reduction): মনে রাখতে হবে চাহিদা হ্রাস করতে পারলে মাদকের সরবরাহ ও কমে যাবে তিনভাবে এটা করা যেতে পারে।

Primary Prevention -প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

Secondary Prevention – প্রতিকার, চিকিৎসা করা

Teritary Prevention – পুনর্বাসন করা ও পুনঃআসক্তি প্রতিরোধ

Primary Prevention: জনসচেতনতায় সব শ্রেণীর মানুষকে সম্পৃক্ত করা, মাদক বিরোধী প্রচার, মাদক বিরোধী কার্যক্রম-দেয়াল লিখন, ডিজিটাল প্রচার, সভা, সেমিনার, ডকুমেন্টারি,  শর্টফিল্ম, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিলেবাসে মাদকের কুফল সম্বন্ধে অন্তর্ভূক্তিকরণ, ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা ইত্যাদি কার্যক্রম সরকারি এবং বেসরকারিভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।

Secondary Prevention: নেশাগ্রস্ত রোগীদেরকে ও অভিভাবকদের সঠিক চিকিৎসা ও পুনঃআসক্তি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, এর জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলর, থেরাপিস্ট, শিক্ষক, অভিভাবক, রিকোভারি ড্রাগএডিক্ট, ধর্মীয় শিক্ষক ইত্যাদি এর মাধ্যমে সমন্বিত চিকিৎসা। এখানে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিকমূলক চিকিৎসা লাগবে।

Teritary Prevention: পুনর্বাসন করা অর্থাৎ যে সমস্ত আসক্ত ব্যক্তিরা সুস্থ হওয়ার পর তাদেরকে স্ব স্ব কাজে ফিরে গিয়ে সুস্থভাবে কর্ম করা বা চাকুরি করা। যারা নিজে ফিরে যেতে অক্ষম, তাদেরকে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োজিত করা। বাকিদেরকে হ্যাবিলিটেশন (Habilitation) করে নিয়োগের মাধ্যমে ব্যবস্থা করা।

তবে সব ক্লাইন্টদের ফলোআপের মাধ্যমে চিকিৎসার আওতায় রাখতে হবে কম পক্ষে দু-বছর বা তার বেশিও লাগতে পারে। সেটা নির্ভর করে তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা হওয়ার ওপর এবং এসেসমেন্টের ওপর কত দিন চিকিৎসা লাগবে।

পরিশেষে বলা যায়, এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিকভাবে মাদকের হ্রাস করা এবং এর ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া।

 

পরামর্শ দিয়েছেন

অধ্যাপক ডা. মহাদেব চন্দ্র মন্ডল

মনোরোগ ও মাদকাসক্ত বিশেষজ্ঞ

সাবেক পরিচালক (এসি), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট।

সূত্রঃ মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ৪র্থ বর্ষ, ৯ম সংখ্যায় প্রকাশিত।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে 

“মনের খবর” ম্যাগাজিন পেতে কল করুন ০১৮ ৬৫ ৪৬ ৬৫ ৯৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here