স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা। মানুষের যতগুলো স্ট্রেস আছে তাঁর মধ্য সবথেকে বড়ো স্ট্রেস হলো জীবন সঙ্গীর মৃত্যু। এটা একটা শোকাবহ বিষয়। মেডিক্যালের ভাষায় শোককে বলে ‘গ্রিপ রিয়েকশন’। একজন জীবন সঙ্গী মারা গেলে তা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় বিশ্বাস করা যায় না, একটা অস্বীকারবোধ কাজ করে, ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড রাগের সঞ্চার হয়, সৃষ্টিকর্তার সাথে তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে মনের মধ্য। এরপর আসে বিষণ্ণতার পর্ব, নিঃসঙ্গতা কাজ করে যা আস্তে আস্তে কেটে যায় ধীরে ধীরে মানতে শুরু করে সঙ্গীর মৃত্যু। শোকের এই পর্বগুলো শেষ হতে সাধারণত ছয় মাসের মতো লেগে যায়। তবে কারো কারো এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। তবে সঙ্গীর মৃত্যু জীবনকে বদলে দেয়। জীবন আর আগের মতোন থাকে না।
উইডো ব্রেন বা বিধবা মস্তিষ্ক বলে একটি কথা আছে। সঙ্গীর মৃত্যুর পর মনের কুয়াশাচ্ছন্নতা এবং বিচ্ছিন্নতা বোঝাতে ‘উইডো ব্রেন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। উইডো ব্রেনের লক্ষণগুলো প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। যেমন:
- ভুলে যাওয়া
- অতিরিক্ত দুঃখবোধ
- ব্রেন ফগ (কোনো কোনো বিষয় বেমালুম ভুলে যাওয়া)
- খিটখিটে মেজাজ
- ক্লান্তি বোধ
- অসার বোধ হওয়া
- বমি ভাব হওয়া
এগুলো সবই শোকাবহ অবস্থার লক্ষণ। যা স্বাভাবিক নিয়মেই আবার চলে যায়। যাদের ছয় মাসের অতিরিক্ত সময় ধরে শোকাবহ অবস্থা থাকে তাদের ঐ মানসিক অবস্থাকে বিষণ্নতা রোগ বলে চিহ্নিত করা যায়। কারণ বিষণ্নতা নামক মানসিক রোগটির অনেক লক্ষণ বা উপসর্গ তাদের মধ্যে বর্তমান থাকে। যেমন দিনের বেশিরভাগ সময় মন খারাপ থাকা। কাজকর্মে আগ্রহ না পাওয়া, অশান্তি-অস্থিরতা বোধ করা, ঘুম না আসা বা ঘুম আসলেও পর্যাপ্ত সময় ধরে ঘুমাতে না পারা, অহেতুক নিজেকে দোষারোপ করা, অসহায় বোধ করা, ঘন ঘন মৃত্যু চিন্তা আসা। শোকের সময় বিষণ্নতা সব দম্পতিদের ক্ষেত্রেই হয়। আবার তা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। তবে যাদের ক্ষেত্রে ছয় মাসেরও অধিক সময় ধরে বিষণ্নতা থাকে তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে হয়। ঔষধ এবং কাউন্সেলিং তাদেরকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করে।
কারো ক্ষেত্রে কনভারশন ডিজঅর্ডার দেখা দিতে পারে। জীবনের এই পথচলায় আগে দুইজন মিলে সকল সুখ-দুঃখ সব কিছু একসাথে মোকাবেলা করতে পারতেন তবে এখন তাঁর একাই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে তাই বিষয়গুলো খুব কঠিন হয়ে উঠে। তবে একেক বয়সে একেক রকম সমস্যা হয়। কম বয়সে এক রকম সমস্যা হয় আবার বয়স একটু বেশি হলে সমস্যাগুলো হয় ভিন্ন। কম বয়সে অনেকেই এই ধরনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে দ্রুত। একজন কম বয়সির ক্ষেত্রে অনেকে দ্রুত এই সমস্যা কাটিয়ে অন্য জনের সাথে নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন, নতুন করে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন। অনেকের মধ্য পর্ন দেখার প্রবণতা খুব বেড়ে যায়। অনেকে আবার নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
যাদের মধ্যে দাম্পত্যকলহ কম থাকে তারা সহজে স্বাভাবিক নিয়মে কাটিয়ে উঠতে পারেন, তবে যাদের মধ্যে কলহ বেশি তারা সহজে কাটাতে পারে না তাঁদের মধ্য অনেকে অপরাধবোধে ভোগেন। তাই সুস্থ সুন্দর দাম্পত্য সম্পর্ক সকল সময় কাম্য। এতে মৃত্যু পূর্ববর্তী সময় যেমন সুখময় হয় তেমনি মৃত্যু পরবর্তী জীবন ও সহজ স্বাভাবিক থাকে।
- ডা. এস এম আতিকুর রহমান
- সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

