অপরাধ একটি অন্যতম জনসমস্যা, বিশেষ করে নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। কৈশোরে অপরাধ প্রবণতা পরবর্তী জীবনে একজন অপরাধী হয়ে ওঠার লক্ষণ। তাই কিশোর অপরাধের কারণসমূহ অথবা ঝুঁকি বাড়ায় এমনসব বিষয়ের মধ্যে যেগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য কিংবা পরিবর্তনযোগ্য তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে শিশু-কিশোরদের নিজস্ব পরিবেশ এবং পরিবারের সাথে জড়িত বিভিন্ন বিষয়াবলি অপরাধ প্রবণতার সাথে কতখানি কিংবা কীভাবে সম্পর্কিত তা এখনো অজানা।
অপরাধ-যেমন খুন, রাহাজানি, মাদক চোরাচালান, অন্যের প্রতি সহিংস আচরণ, ডাকাতি এগুলো এখন বড়ো সামাজিক সমস্যা। বিশ্বে তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম বা ৪র্থ প্রধান কারণ হলো তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সহিংসতা-যা খুব আশঙ্কাজনক। ল্যাটিন আমেরিকার নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১৫-১৯ বছর বয়সির মধ্যে এটা প্রথম কারণ! সুতরাং এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, অপরাধ প্রবণতা-মানুষের জীবনের পরিধি এবং মান দুটোর সাথেই সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কিশোর বয়সে স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিংবা বেকারত্ব অনেক সময় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার নির্দেশক। অগ্রিম নির্দেশক হিসেবে শিশুর প্রতি সহিংসতা, অনাদর অবহেলা এবং পারিবারিক নিম্ন আয়। সেই সাথে শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন আচরণগত সমস্যা যেমন কন্ডাক্ট ডিজর্ডার, এটেনশন ডেফিশিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিজঅর্ডার ইত্যাদি বিষয় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে।
আলোচ্য গবেষণাটি করা হয়েছে ব্রাজিলে। যেখানে প্রথমে ৫-১৪ বছরের ২৫১১ জনকে ইন্টারভিউ করা হয়েছে। বিভিন্নরকম প্রায় ২২টি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছিল।
গবেষণায় ৭ বছর পর তাদের মধ্যে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার হার দেখা হয়েছে। ১৩-২১ বছর বয়সিদের মধ্যে ১৯০৫ জনের তথ্য নেওয়া হয়েছে। ফলাফল ছিল ৪.৩% অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। অপরাধসমূহ ছিল চুরি ৩৪.২%, মাদক চোরাচালান ১৪.৬%, সহিংসতা ১৪.৬% (একটি হত্যাসহ), ডাকাতি ৭.৩%। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের অপরাধ প্রবণতা বেশি ৩:১ অনুপাতে। কিন্তু বয়সের সাথে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। এদের মধ্যে রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে ২২টি পরিবর্তনযোগ্য বিষয় পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে, জন্ম পূর্ববর্তী সমস্যা থেকে শুরু করে শৈশব এবং কৈশোরে মানসিক, সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় কিশোর অপরাধ সংঘঠনের সাথে সম্পৃক্ত।
মায়ের গর্ভে থাকাকালীন মায়ের মদ বা ধূমপান, ১৮ বয়সের নিচে মায়ের বয়স, অপরিকল্পিত গর্ভধারণ, প্রিম্যাচ্যুর বেবি এবং স্বল্প ওজন নিয়ে জন্ম ইত্যাদি বিষয়। জন্মের পরপর বাচ্চার সঠিক পরিচর্যার অভাব, মাতৃদুগ্ধপান। শিশুবয়সে সঠিক এবং পরিমিত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ, বাবার সাথে সম্পর্ক, মায়ের বা বাচ্চার কোনো মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক পরিবেশ, চাইল্ডহুড অ্যাবিউজ বা বুলিংয়ের শিকার হওয়া, পড়ালেখায় খারাপ ফলাফল, শিশুর ওপর বাবা মায়ের নিয়ন্ত্রণহীনতা ইত্যাদি অনেক বিষয়কে অপরাধ নামক জটিল একটা সমস্যার কারণ হিসেবে বলা হয়। কিন্তু গবেষণার ফলাফলে যেন কোনোরকম Type 1 error না হয় সেজন্য ২৪টি এনালাইটিকাল পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, একমাত্র দারিদ্র্যতার সাথে কিশোর অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা পাওয়া গিয়েছে, যেটা দূর করতে পারলে বা কমিয়ে আনতে পারলে অনেকাংশে অপরাধও অনেক কমে আসবে। পারিবারিক আয়, বাসস্থান, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, শিক্ষার সুযোগ ইত্যাদি দরিদ্রতার সাথে অসামাজিক কার্যকলাপ বা অপরাধ প্রবণতা কম দেখা দিবে। আমরা জানি যে দারিদ্র্য এমন একটি দুষ্টচক্র যা কিনা একটা শিশুর মানসিক এবং শারীরিক পরিপূর্ণতার সাথে সম্পর্কিত। তাই এগুলোর উন্নয়ন একটা শিশু বা কিশোরের বেড়ে ওঠার পথকে অনেক সহজ করে তোলে। যার কারণে ভাবা হয়েছে যে, তাদের মধ্যে বিকাশের অন্তরায়। সম্পদের অসমতা সামাজিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগেও বাধার কারণ। বিভিন্ন অসামঞ্জস্যতা তখন দারিদ্র্য নামক একটা ছাতার নিচে চলে আসে যার বিভিন্ন ফলাফলের একটি হলো কিশোর অপরাধ। যদিও গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন-গবেষণায় কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড থেকে তথ্য নেয়া হয়নি, বরং অংশগ্রহণকারীদের বাবা মা এবং তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে।
ব্রাজিলে এটাই প্রথম longitudinal evaluation যেখানে শিশু কিশোরদের অপরাধের সাথে মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক এবং শিক্ষা বিষয়গুলো জড়িত কিনা তা দেখা হয়েছে। যেহেতু দরিদ্রতা এই অপরাধের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তাই গবেষকবৃন্দ প্রস্তাব করেছেন দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কিশোর অপরাধ অন্ততপক্ষে এক চতুর্থাংশ কমিয়া আনা সম্ভব।
Reference
Childhood individual and family modifiable risk factors for criminal conviction: a 7-year cohort study from Brazil. Carolina Ziebold, Sara Evans-Lacko, […], and Ary Gadelha.
- ডা. সাদিয়া আফরিন
- শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ,
- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।



