অপেক্ষা করতে শেখার গুরুত্ব

অপেক্ষা করতে শেখার গুরুত্ব

যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি কখনো কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করেছেন? সবার আগে উত্তরে কী বলবেন?’ আমরা প্রতিদিনই ট্রাফিক জ্যামে বসে অপেক্ষা করি, জ্যাম কখন ছুটবে, কখন পৌছাবো! লিফটের জন্য অপেক্ষা, ঘরে ফিরে ডোর বেল চেপে অপেক্ষা, ফোনে অপর পক্ষের হ্যালো শোনার অপেক্ষা, ডাক্তারের কাছে গেলে অপেক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল জানার অপেক্ষা, অনলাইনে অর্ডার করে ডেলিভারিম্যান আসার অপেক্ষা ইত্যাদি আমাদের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে গেছে।

তবে চাকরির পরীক্ষার অপেক্ষমান তালিকায় নিজের নাম দেখলে সত্যিই তা আশাহত হবার মতো বিষয়। অন্যদিকে প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা বেশ মধুর আর রোমান্টিকও বটে। কিন্তু অপেক্ষারত সময়ের মাত্রা কমবেশির কারণে বদলে যেতে পারে আমাদের আবেগ, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সম্পর্ক।

এজন্যই অপেক্ষা করতে শেখাটাও হতে পারে একটি দক্ষতা। নিশ্চয়ই ভ্রু কুচকে ভাবছেন, উপদেশ দেয়া সহজ, পাব্লিকবাসে ঝুলে গরমে সিদ্ধ হয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় চলে গেলে বুঝতেন অপেক্ষা করা কি প্যারা!

অপেক্ষা কী :
অপেক্ষা হচ্ছে অনির্দিষ্ট, তবে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য! অপেক্ষার শুরু খেয়াল করা যায়। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Wait। যেমন, আমি ১ ঘন্টা যাবৎ বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি নির্দিষ্ট সময় ‘১ ঘন্টা’ ধরে চলছে, ১ ঘণ্টা পর অপেক্ষার অবসান হবে বলে মনে করছি। অন্যদিকে, প্রতীক্ষা হচ্ছে দীর্ঘ সময়ের জন্য। সাধারণত এর শুরুটা আমাদের জানা থাকে না। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ-ও Wait। যেমন, আমি ২ বছর যাবৎ প্রতীক্ষায় রয়েছি! এটি দীর্ঘ এবং অনির্দিষ্ট।

কেনো আমরা স্বেচ্ছায় অপেক্ষা করি :
সাধারণত আমরা কিছু পাবার আশায় অপেক্ষা করি। যেমন, ফসলের বীজ বুনি, চাষ করি, যত্ন নেই, শ্রম দেই। একটি নির্দিষ্ট সময় পরে ফসল ঘরে তুলবো সেই আশায়।

অপেক্ষা করা কেনো শিখবো :
কথায় আছে, ‘‘সবুরে মেওয়া ফলে’’! একটু খেয়াল করলে দেখবেন, আমরা যে জিনিস সহজেই পেয়ে যাই তার মর্ম বুঝি না। মাথা ঠান্ডা রেখে, ধৈর্য্য ধরে পরিশ্রম করে গেলে সফলতা আসবেই আর তাই অপেক্ষা করতে শেখা জরুরী। অপেক্ষা আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আমার প্রতিটি আচরণই আমার ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ। তাই অপেক্ষারত অবস্থায় হিতাহিতজ্ঞান শূন্য আচরণ করলে তা আমার শিক্ষা ও মান-মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। দীর্ঘমেয়াদী ধৈর্য্য বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমায়। ধৈর্য্য জীবনের সন্তুষ্টির সাথে যুক্ত।

কিভাবে অপেক্ষা করব :
আজকাল আমরা এক সেকেন্ড ইন্টারনেট কানেকশন না থাকলেই অস্থির হয়ে যাই, লোডশেডিং হলে কীভাবে কী করব ভেবে অন্যের ওপর রেগে যাই। ধরুন, আপনি একটি লম্বা লাইনে সকাল থেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন আর আপনার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একটু ভেবে দেখুন, আপনার মেজাজ খারাপ হবার সাথে সাথে আপনার ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে, ঘাম হচ্ছে, হৃদ কম্পন বেড়ে যাচ্ছে, কথা বলতে গেলে গলার স্বর উঁচুতে উঠে যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে উদ্বেগ!

অপেক্ষা করাটাকে যদি একটি সমস্যা হিসেবে ধরে নেই তাহলে প্রথমে নিজেকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করতে হবে। যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝাতে হবে। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক সবকিছুর শেষ আছে। তাই এই লাইন যতই দীর্ঘ হোক এক সময় শেষ হবে। তবে লম্বা লাইনের কারণ এবং কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে খোঁজ খবর নিয়ে জানার চেষ্টা করতে হবে। এই ফাঁকে জরুরি ফোনকল এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কাজগুলো করে নেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ অপেক্ষারত সময়টুকুও যেনো অর্থবহ হয়। কেননা বিশ্বাস করতে হবে যে, জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডই অমূল্য সম্পদ।

আজীবন অপেক্ষা নয় :
একটি সুন্দর সকালের অপেক্ষায় আমি প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে উঠি। কিন্তু আমি কী এক কাপ চা-এর জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করব? নিশ্চয়ই না! ধরুন, আপনার প্রিয়জন কেউ দেশের বাইরে থেকে ফিরলে নির্দিষ্ট কোনো আয়োজন হবে। সেই অপেক্ষায় আছেন। তার ফিরে আশার সময়টা এতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে যে, আপনি আর অপেক্ষা করতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে অপেক্ষারত অবস্থায় মন পরিবর্তন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে হুট করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিবার ও কাছের মানুষের সাথে আলোচনা করুন। জীবনের সিদ্ধান্তগুলো আবেগ এবং যুক্তির যথার্থ সংমিশ্রণে নিন। জীবন যাতে সুন্দর হয় সে চেষ্টাই করতে হবে।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘‘আমি তোমারি বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস–দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ-মাস’’। পরিশেষে, বলতে চাই অপেক্ষা কষ্টের হলেও তা অনুশীলন করুন। সফলতা অনিবার্য। ‘আমার এখনই চাই’ এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন।

-ফারজানা ফাতেমা (রুমী)
মনোবিজ্ঞানী, প্রতিষ্ঠাতা সোনারতরী

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন :

/এসএস/মনেরখবর/

No posts to display

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here