আপনি কি ভাল বোধ করার জন্য খাবার খাচ্ছেন?

আপনার মনে আছে গতবারে আগুনের মতো গরম খিচুড়ি খেতে খেতে আপনি একেবারে ক্লান্ত ও বিষণ্ণ হয় পড়েছিলেন? অথবা আপনার যখন খুব একঘেয়ে লাগত তখন আপনি চীজ দিয়ে তৈরি পিৎজা এবং মুচমুচে আলুভাজা বা চিপস্‌ খেতে চাইতেন? পরীক্ষায় ভালো নম্বর বা ব্যবসায় সফল হওয়ার পরে আপনি সবসময়ে মিষ্টিমুখ করতে চাইতেন? কিংবা বৃষ্টির দিনে আপনার পকোড়া ও আদা দিয়ে চা খেতে ভীষণ ইচ্ছে করত?
খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে কেন আমাদের আবেগানুভূতির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে?
আমাদের জীবনে খাওয়াদাওয়া একপ্রকার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমরা যখন সবে জন্মাই তখন মায়ের দুধই হয় আমাদের একমাত্র খাবার। মায়ের দুধ একটি বাচ্চার বেঁচে থাকার রসদ এবং লালন-পালনের জন্য যতটা জরুরি ঠিক ততটাই এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মায়ের স্নেহ-মায়া-মমতা এবং সম্পর্কের উষ্ণতা। আমরা যখন ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে থাকি খাদ্য আমাদের মৌলিক চাহিদা হয়ে দাঁড়ায়। যখন আমরা পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করি তখন তাদের সঙ্গে আমাদের এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে; যখন আমরা একে অপরকে খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করি তখন আমরা মানসিকভাবে খুবই আনন্দ পাই; কোনও বিশেষ অনুষ্ঠান বা  পরিস্থিতিতে যখন আমরা বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করি তখন তা উৎসব উদ্‌যাপনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
মাঝে মাঝে যখন আমরা মনের দিক থেকে অস্থির হয়ে উঠি বা আমাদের একঘেয়ে লাগে কিংবা মন খারাপ হয় তখন মনকে ভালো রাখার জন্য আমরা ভালো-মন্দ খাই। কিছু খাবার রয়েছে যা আমাদের মানসিক চাপের মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। এই পরিস্থিতিতে খাবারের থেকে অন্য কোনও বস্তু এত বেশি সময় ধরে কার্যকরী ফল দেয় না। অনেকসময়ে দেখা যায় যে, কম খাবার খেলে কিছু বিশেষ অনুভূতি বা আবেগ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। যেমন- যখন আমরা ইন্টারভিউ বা পরীক্ষা দেওয়ার জন্য উত্তেজনায় ভুগি তখন সাধারণভাবে আমাদের খেতে ভালো লাগে না বা আমরা খাই না।
ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট বোনা কোলাকো বলেছেন, ”প্রতিটি মানুষ আলাদা  আলাদা উপায়ে নিজেদের মর্জি ও অনুভূতিগুলির মোকাবিলা করে থাকে”। কোলাকোর মতে, ”যখন আমরা রেগে যাই, দুঃখ পাই বা অধীর হয়ে উঠি তখন  নানারকম উপায় অবলম্বন করে আমরা ভালো থাকতে চেষ্টা করি। খাদ্য হচ্ছে এমন একটি বস্তু, যা আমাদের ভালো থাকতে খুব তাড়াতাড়ি ফল দেয়।” কিছু খাবার যেমন- মিষ্টি খুব তাড়াতাড়ি আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নিঃসরণ করে আমাদের মস্তিষ্ককে চনমনে করে তুলতে সাহায্য করে। বিশেষ করে খুব মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে আমাদের মন বেশ ভালো হয়ে যায়। তাই যখন আমাদের খুব বিষণ্ণ বা একঘেয়ে লাগে বা যখন আমরা হতাশায় ভুগি তখন ভালো-মন্দ খাবার খেলে আমরা মনে মনে স্বস্তি বোধ করি।
গবেষণার মাধ্যমে দেখা গিয়েছে যে, আমাদের মানসিক চাপ, চিন্তা বা উদ্বেগের মতো আবেগানুভূতির সঙ্গে খাওয়াদাওয়ার একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু এটা কি ক্ষতিকারক বিষয়?
কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ‘আবেগজনিত খাওয়া’- এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন সেই সব মানুষের খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে অনুভূতিগত আচরণের সাযুজ্য বজায় রেখে, যারা মূলত নেতিবাচক মনোভাবাপূর্ণ। কারণ খাদ্য আমাদের উজ্জীবিত করে ভালো থাকতে সাহায্য করে। যখন আমরা মানসিক চাপ বা উদ্বেগে ভুগি তখন তা দূর করতে ভালো-মন্দ খাওয়াই যেন শেষ কথা বলে। যখন সুস্থ বা ভালো থাকাটা আমাদের লক্ষ্য হয়, তখন আমাদের আচার-আচরণের মধ্যে নানা সূক্ষ্ম অনুভূতি জেগে ওঠে। যখন কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে আমরা খাওয়াদাওয়া করি তখন আমরা চেষ্টা করি আমাদের তাৎক্ষণিক বা প্রত্যক্ষ সমস্যাগুলির (অস্বস্তিকর অনুভূতি) সমাধান করতে। তবে এর মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
আবেগের বশবর্তী হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে খাওয়াদাওয়া করলে তা থেকে শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন- এমন কিছু খাবার যা খুব মিষ্টি জাতীয় বা অস্বাস্থ্যকর প্রকৃতির। শরীরে সুগারের আধিক্যের প্রত্যক্ষ প্রভাব হল আলস্য এবং কুঁড়েমি।
কিছু ক্ষেত্রে আবেগজনিত খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে মানসিক উদ্বেগ বা অবসাদ জড়িয়ে থাকে। যদি এমন কোনও লক্ষণ দেখতে পাওয়া যায় তাহলে অবিলম্বে একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি।
অনেকসময় মানুষ তার প্রিয়জনকে হারানোর শোক ভোলে ভালো-মন্দ খাওয়াদাওয়া করে। কাছের মানুষ মারা গেলে বা সম্পর্কে ভাঙন দেখা দিলে এরকম  আচরণ দেখা দেয়। এহেন পরিস্থিতিতে একজন মানুষের উচিত কাউন্সেলরের সাহায্য নিয়ে হারানোর দুঃখকে জয় করা।
কী করে আমরা বুঝব যে আমরা ক্ষুধার্ত বলে খাওয়াদাওয়া করছি, নাকি আবেগের বশবর্তী হয়ে আমরা খাবার খাচ্ছি?
কোলাকোর মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আমাদের শরীরে খাওয়াদাওয়ার ফলাফল কী হচ্ছে সেদিকে ভালোভাবে খেয়াল রাখা। ”যখন আমাদের খুব খিদে পায় তখন আমাদের মধ্যে খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা জেগে ওঠে। মেটাবলিকাল এবং গ্যাস্ট্রিক প্রক্রিয়া আমাদের খিদে বোধকে জাগাতে সাহায্য করে। যখন আমরা খাই তখন এই বোধটাই আমাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। আমরা অনুভব করি যে, আমাদের  খাওয়া পূর্ণ হয়েছে বা খেয়ে আমরা স্বস্তি পাচ্ছি কিনা। এই ধরনের স্বস্তিদায়ক সচেতনতাই আমাদের উপলব্ধি করতে সাহায্য করে আমাদের শারীরিক খিদের উদ্রেগকে এবং এভাবেই আমরা নিজেদেরকে সুস্থ বোধ করি।”
প্রয়োজন যথাযথ সাহায্যের
যদি আপনি ভাবেন যে খাওয়াদাওয়া করে মানসিক চাপ কাটাবেন এবং খাদ্যাভ্যাসের ধরনে পরিবর্তন আনবেন তাহলে একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা একান্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা আপনাকে এহেন জটিলতা ও অনুভূতির মধ্যেকার সমস্যা চিহ্নিত করতে সাহায্য করবেন এবং সেগুলির সঙ্গে মানিয়ে নিতে দিশা দেখাবেন।
আপনি নিজে থেকেও মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু ব্যবস্থা নিতে পারেন-
শারীরিকভাবে নেওয়া ব্যবস্থা- প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে, প্রতিদিন শরীরচর্চা বা শারীরিক কসরত করা দরকার। দৈনন্দিন শরীরচর্চার ফলে মস্তিষ্কে এন্ড্রোফিনস্‌ উৎপন্ন হয় যা শরীরে সুপ্রভাব বিস্তার করে এবং খাবারের উপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করে।
মনোগতভাবে নেওয়া ব্যবস্থা- এমন মানসিক চাপ যা আপনাকে খাদ্যের উপর নির্ভরশীল করে তুলছে, তাকে চিহ্নিত করতে হবে এবং নিজেকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ধ্যান করা বা মনোনিবেশ করার অভ্যাস করা একান্ত জরুরি। বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সাহায্য দরকার। নিজের পছন্দসই কাজ করতে হবে, যেমন- ছবি আঁকা, বই পড়া বা গান শোনা
খাওয়ার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়ার চারটি ধাপ
খাওয়ার সময়ে ফোন, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র দূরে রাখা এবং টেলিভিশন বন্ধ রাখা প্রয়োজন।
সামনে রাখা খাবারের দিকে চোখ রাখা জরুরি। খাবারের সুগন্ধ, উষ্ণতা এবং স্বাদের দিকে মন দেওয়া প্রয়োজন।
লোভনীয় খাবারের স্বাদ নিয়ে, ধীরে ধীরে সচেতনভাবে চিবিয়ে খেতে হবে।
নিজের কতটা খিদে রয়েছে সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকা প্রয়োজন। খাবার খাওয়ার সময়ে পেট ভর্তি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে চলবে না। যদি বোঝেন যে খাওয়া পর্যাপ্ত পরিমাণে হয়ে গিয়েছে তাহলে তখন আর খাবেন না।

Previous articleমানসিক অস্থিরতায় কি করতে চায় শিক্ষার্থীরা?
Next articleপরীক্ষায় ভয় – কখন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here