“হতাশার মধ্যেই থাকি, চব্বিশ ঘণ্টাই মানসিক চাপে থাকি”

0
70

আলমগীর
রিকশা চালক

মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ‘মনের খবর’র মৌলিক এজেন্ডা। মনের খবর চায় সব মানুষ তার নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকুক। এজন্য সাধারণ মানুষের মাঝে আদৌ মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে কিনা সেটা জানতে মনের খবর প্রায়ই একেবারে প্রান্তিক মানুষের মুখোমুখি হয়। এবার আমরা একজন রিকশা চালকের মুখোমুখি হয়েছিলাম। তার কাছে জানতে চেয়েছি মানসিক স্বাস্থ্যের খুঁটিনাটি নানা বিষয়। রিকশা চালক আলমগীরের বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগেঞ্জ। বয়স মাত্র ২২। ছোটোবেলায় বাবা হারিয়েছেন। পরিবারে রয়েছে মা, স্ত্রী ও এক সন্তান। তার সাথে কথা বলেছেন, মনের খবর প্রতিবেদক।

আপনার নাম পরিচয়, পরিবারের কে কে আছে?

আমি আলমগীর, বয়স ২২। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে আমার বাড়ি। বিয়ে করেছি, এক ছেলে আছে। ৩ বছর বয়স। বাবা নেই। আমার যখন ৭/৮ বছর বয়স তখনই বাবা মারা যান।

পড়াশোনা করেছেন?

ছোটোবেলাতেই বাবা মারা গেছে। অভাবের সংসারে তো আর পড়ালেখা হয় না। তেমন করতে পারিনি। ক্লাস ফাইভে (পঞ্চম শ্রেণি) পড়েছিলাম।

ঢাকায় থাকেন কতবছর ধরে?

অনেক বছর থেকেই। ছোটোবেলায় ঢাকায় আসি। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারে আর কেউ নেই রোজগার করার। অল্প বয়স থেকেই কাজ করি।

রিকশা চালিয়ে কত টাকা আয় হয় প্রতিদিন?

এই হাজার/বারোশ টাকা হয়। মাঝে মাঝে কম হয়, বেশিও হয়।

খরচ কেমন হয়? থাকেন কোথায়?

মালিকরে রিকশার ভাড়া দিতে হয় ১৩০ টাকা। রাতে মালিকের গ্যারেজেই থাকি। মগবাজার ওয়ারলেসে।

মন খারাপ হয় কখনো?

মন খারাপ তো হবেই। কত সময় কত কারণে মন খারাপ হয়।

মন ভালো না থাকার কারণ কী?

মন ভালো থাকা না থাকার অনেক কারণ আছে। এই যে মাঝে মাঝে যাত্রী নিয়া ক্যাচালে পড়ি। যাত্রীরা ভাড়া নিয়া ক্যাচাল করে। খারাপ ব্যবহার করে। অনেকে গালি দেয়। প্রতিবাদ করতে পারি না। আমি তো রিকশা চালাই। তখন অনেক মন খারাপ হয়। এরপর সংসার, আত্মীস্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে কত সমস্যাই তো হয়। তখনও মন খারাপ হয়। কোনোদিন ভালো ভাড়া কাটতে না পারলেও মন খারাপ হয়।

মন খারাপ হওয়া, দীর্ঘসময় মন খারাপ থাকা বা মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হওয়া। এই মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে আপনার?

মানসিক স্বাস্থ্য কী, অতকিছু কি আর বুঝি। সাধারণ মানুষ। মন খারাপ হয় এইটা বুঝি

আচ্ছা, ধরুন অনেক মানুষ আছে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে। নিজের পরিচয় জানে না, কিছু বলতে পারে না। আমরা তাদের পাগল বলি। এই যে অবস্থা এটা হলো মানসিক স্বাস্থের সমস্যা। এই অবস্থা থেকে ভালো থাকা মানসিক সুস্থতা…

কেউ ইচ্ছে করে পাগল হয়, কেউ কাউকে বানায়। কেউ পাগলের বেশ ধরে

ইচ্ছে করে পাগল হওয়া যায়?

ইচ্ছা কইরা পাগল হওয়া যায় না। ভান ধরা যায়। অনেকে আছে নাহ… পাগলের ভান কইরা থাহে (পাগলের বেশে ধরে থাকে)। কত মানুষই আছে এইরকম করে।

গ্রামাঞ্চলে এরকম মানসিক ভারসাম্যহীনদের চিকিৎসা করে ফকির-কবিরাজরা। বিষয়ে আপনার ধারণা কী?

কবিরাজ কি পাগল ঠিক করতে পারব? অনেকে তো কবিরাজের নিজের লোকও হইতে পারে। দুয়েকজন থাকতে পারে-আল্লাহ মানুষকে অনেক শুণ দেয় না? তাগো উসিলায় ভালো হইতে পারে।

মানসিকভাবে যারা অসুস্থ হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা হয় এটা জানেন?

চিকিৎসা করলে তো ভালো হইবেই। হাসপাতালে তো সব রোগেরই চিকিৎসা করে ডাক্তাররা। কেউ পাগল হয়ে গেলে আত্মীয়-স্বজন তারে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসা করা যায়।

হাসপাতালে মানসিক অসুস্থদের চিকিৎসা হয় এটা জানেন কীভাবে?

গ্যারেজে থাকি। হারাদিন কত মানুষ কত রকমের কথা কয়। এইরকম শুনছি পাগল হইলেও চিকিৎসা হয়। আবার অনেক সময় তো দেখা যায় পাগল হয়ে বাড়ি থেকে হারায়া গেছে এমন কাউকে আত্মীয়-স্বজনরা খুঁজে পাইলে যারা একটু শিক্ষিত তারা ডাক্তারের কাছেও নেয়।

আপনি কখনো মানসিক চাপে পড়েছেন?

চাপ তো থাকেই সব সময়। ছোটো থেকে বাবা নাই। জীবনে অনেক চাপের মধ্যে বড়ো হইছি। সংসার জীবনে চাপ। কামাই-রোজগারের চাপ চাপের কোনো শেষ নাই।

ইদানীং অনেক মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশেষ করে আপনার আমার মতো তরুণ- তরুণীরা। কোনো একটা দুর্ঘটনা ঘটলেই এটা করে না। সবকিছু সহ্য করেও মানুষ বাঁচতে চায়। কিন্তু একসময় হতাশ হয়ে যায়। জীবনের প্রতি মায়া, ভরসা হারিয়ে ফেলে আত্মহত্যা করে। আপনার কখনো এরকম মনে হয়েছে?

আমরা গরীব মানুষ। কত দুঃখ কষ্ট আছে। কষ্ট নিয়া বড়ো হইছি। নানান সময় নানান চাপ থাকে মনে আমার অনেক সময় মনে হইছে মইরা যাই। মরলেই কেবল শান্তি পাবো। পরে আবার মনরে সান্ত্বনা দিছি মইরা গেলে কী পামু? লাভ কী আমার। বাঁইচা থাকলে আমার লাভ আছে।

কেমন লাভ?

কষ্ট কইরা বাঁইচা থাকলে একদিন তো এমনিই মরমু। ওই সময় আল্লাহর কাছে মাফ পাইতে পারি। কিন্তু নিজে নিজে মরলে তো এইডা পামু না। নিজে নিজে মরা (আত্মত্মহত্যা) তো পাপ। আল্লাহ শাস্তি দিবেন মরার পরে।

জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় চাপ অনুভব করেন?

আমরা তো সব সময় চাপের মধ্যে থাকি। হতাশার মধ্যে থাকি। চব্বিশ ঘণ্টা মানসিক চাপের মধ্যে থাকি। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে প্রতিদিন। চলতে কষ্ট হয়। মাস গেলে হিসাব মিলাইতে পারি না। মানসিকভাবে অনেক চাপে পড়ি। অনেক কষ্টে চাপাচাপি করে চলতে হয়।

এত চাপ নিয়ে বেঁচে থাকেন কীভাবে?

কষ্ট হয়। কিন্তু সংসার আছে। বউ পোলাপান আছে। মা আছে। আত্মীয়-স্বজন আছে। আল্লাহর আজাবের ভয় আছে। এজন্য কষ্ট হইলেও বাঁইচা থাকার চেষ্টা করি। যেদিন আল্লাহ মরণ দিব সেদিন তো কেউ ঠেকাতে পারবে না। সেদিন এমনিই মরমু।

আপনার তো মাশাআল্লাহ আয় ভালো। অনেকে এর থেকেও কম আয় করেন। তো, আপনার তাহলে অর্থনৈতিক চাপ কেন?

স্যার, বাজারের যা অবস্থা। প্রত্যেকদিন জিনিসের দাম বাড়ে। ঢাকার শহর থাকতে একগ্লাস পানিও কিইন্না খাওয়া লাগে। বাড়িতে মা, বউ-বাচ্চা আছে। সবারই তো অসুখ-বিসুখ হয়। কত ধররে খরচ আছে জীবনে বাঁচতে হলে। যেই আয় তাতে খুব কষ্ট হয়।

Previous articleইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম: পেটের সমস্যাও মানসিক রোগ
Next articleদীর্ঘমেয়াদি রোগীদের জন্য কর্মস্থলে কেমন পরিবেশ দরকার?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here