শিশুর বিকাশ পর্ব ৮- এগারো থেকে চৌদ্দ বছর

১১ থেকে ১৬ বছর বয়সটা যে কোনো শিশুর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ বয়সে একটা শিশুর বিভিন্ন হরমোনের কারণে শারীরিক ও মানসিক ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এই বয়সে একজন শিশু তাঁর ছেলেবেলা থেকে সাবালকের দিকে যায় এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন দৈহিক, মানসিক ও হরমোন পরিবর্তনের মাধ্যমে বয়স্ক হয়। তাই এই সময়টাকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার এবং বাচ্চাকে অধিক সময় দেয়া দরকার তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য। মেয়েদের জন্য বয়ঃসন্ধিকাল ১০ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত এবং ছেলেদের ১১ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত। তবে বয়ঃসন্ধিকাল কারো কারো আগে পরে হতে পারে।
১১ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের যা পার উচিত
√  দৈনন্দিন রুটিন কাজ স্বনির্ভরতার সাথে করতে পারে।
√  পারিবারিক ও সামাজিক রীতি-নীতি বুঝে চলতে পারে।
√  নিজের সম্পর্কে সচেতন থাকে। বিশেষ করে তারা তাদের চেহারা, শারীরিক ইমেজ, কাপড়-চোপড়ের উপর নজর রাখা।
√  ভালো মন্দ বুঝতে শিখে।
√  বেশি সময় ধরে যে কোনো কাজ করতে পারে।
√  বারবার আবেগের পরিবর্তন, পরিবর্ধন হতে থাকে এবং এমনকি রেগেও যেতে পারে।
√  সব কিছুতেই মানসিক চাপ অনুভব করে সেটা ছোটখাটো ব্যাপার হলেও।
√  যে কোনো চিন্তাই খানিকটা জটিল ও কুটিল করে ভাবতে পারে।
√  নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ এবং খাদ্য তালিকাতে সমস্যা বোধ করতে পারে।
√  সঠিক ও বেঠিক বোধ বেশি কাজ করতে পারে।
১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য যা করণীয়
√  বাচ্চার সাথে বয়সের সাথে তার দৈহিক গঠনের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করুন।
√  বাচ্চার কথা শুনুন এবং বাচ্চার সঙ্গে প্রায়ই কথাবার্তা বলুন। বিশেষ করে নৈতিকতা, পারিবারিক নিয়ম, সামাজিক নিয়ম, মাদক ইত্যাদি।
√  তাকে তার মতো স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আচরণ করতে দিন। যদি মনে করেন শিশুটি ভুল করছে তবে তাকে আন্তরিক ভাবে বোঝান। কখনোই কড়া শাসন করবেন না।
√  বাচ্চাকে তার যত্ন নিতে উদ্বুদ্ধ করুন। যেমন- প্রতিদিন গোসল, দিনে দুইবার দাঁত মাজা, মাথা আঁচড়ানো, পরিষ্কার থাকা, পরিপাটি থাকা ইত্যাদি।
√  এ বয়সী শিশুদের প্রতিদিন ১৬০০ থেকে ২০০০ ক্যালোরি খাদ্য দরকার, তাই শিশুর বিকাশের জন্য সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের সমন্বয়ে সুষম খাদ্য খাওয়ান।
√  শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য বাদাম (আখরোট, চিনা বাদাম, কাঠ বাদাম), মধু, ডিম, ডাল, দুধ, সামুদ্রিক মাছ, মাছের তেল, ফল (কলা, আপেল, জাম, আমলকি ইত্যাদি) ইত্যাদি খাদ্য অতি প্রয়োজনীয়।
√  শিশুর বিকাশের জন্য প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে সুষম খাদ্য খাওয়াতে হবে।
√  প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় বৈচিত্র থাকতে হবে যাতে শিশু একই ধরনের খাদ্যে বিরক্ত না হয়।
√  পরিবারের সবার সাথে একসাথে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন।
√  প্রতিদিনই খাদ্য তালিকাতে দুধ, ডিম, বাদাম, ফলমূল ও শাকসবজি রাখতে হবে।
√  সময়মতো শিশুকে যথেষ্ট ঘুমাতে দিন। এ বয়সী শিশুর প্রতিদিন ৮-৯ ঘন্টা ঘুম প্রয়োজন।
√  নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস করান।
√  প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘন্টা শারীরিক ব্যায়াম বা খেলাধুলা করতে উৎসাহ দিন।
monon-600
√  প্রতিদিন বসে বসে খেলা, টিভি দেখা, কম্পিউটার, ভিডিও গেমস ইত্যাদি পরিমিত ভাবে করতে উৎসাহ দিন এবং এজন্য ১-২ ঘন্টার বেশি সময় ব্যয় করতে দেয়া উচিত নয়। তাই নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন।
√  বাচ্চাকে যথেষ্ট সময় দিন। তার বন্ধু-বান্ধব, স্কুল, খেলার সাথী সবকিছু নিয়ে কথা বলুন এবং জানুন।
√  যেকোনো সমস্যায় মাথা গরম না করে, মারামারি না করে, ঝগড়া না করে কিভাবে সমাধান করা যায় তা বাচ্চাকে শেখাতে হবে।
√  মিলেমিশে, শান্তিতে থাকা বাচ্চাকে শেখাতে হবে।
√  বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে বাড়ন্ত মেয়ের সাথে মায়ের আলোচনা করা দরকার এবং তার দৈহিক বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে কথা বলা ও বুঝানো দরকার। প্রয়োজনে তাকে মানসিক শক্তি দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
√  ছেলের সাথে বাবার উচিত বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা। ছেলেকে তার বিভিন্ন দিক নিয়ে এবং পরিবর্তন নিয়ে বুঝাতে ও সাহায্য করতে হবে।
√  মেয়ে অথবা ছেলেদের শারীরিক বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে কারো ঠাট্টা করা উচিত নয়।
যে সব সংকেত লক্ষ্য রাখতে হবে
√  বয়স অনুযায়ী নিজের যত্ন নিতে না পারা, অস্বাভাবিক আচরণ করা, মনোযোগের অভাব, হঠকারী আচরণ করা, হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া, অতিরিক্ত চুপচাপ বা অতিরিক্ত চঞ্চল হওয়া, সমবয়সী কারো সাথে মেলামেশা না করা, চোখে চোখ না রাখা, খিঁচুনি হওয়া, বাবা মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার, ঘরের জিনিষপত্র চুরি করা, বাইরে থেকে অন্যের জিনিষ চুরি করে নিয়ে আসা, নিজের শরীরে নিজে ক্ষতি করা (হাত কাটা, চুল ছেঁড়া, হাত কামড়ানো, মাথা পেটানো, আত্মহত্যার চেষ্টা), স্কুল পালানো, স্কুলে যেতে না চাওয়া, খুব বেশি মন খারাপ করে থাকা, কানে গায়েবি আওয়াজ শোনা, যে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ করলে বুঝতে হবে শিশুটি মানসিক সমস্যায় ভুগছে।
√  যদি কোনো শিশুর মানসিক বা আবেগজনিত সমস্যা থাকে, নির্যাতিত হয়ে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে তা যাতে আরো জটিল আকার ধারণ করতে না পারে সেজন্য পরামর্শ প্রদান করতে হবে এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের মতামত নিন।
√  বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তনের জন্য গুটিয়ে থাকলে, কারো সাথে না মিশতে পারলে সাথে সাথে বাচ্চার সমস্যা নিয়ে তার সাথে বন্ধুর মতো আলোচনা করুন এবং সাহায্য করার চেষ্টা করুন। নিজে একা না পারলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
√  শিশু একা একা সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে তাকে সাহায্য করুন। অবহেলা না করে শিশুকে সুপরামর্শ দিন।
শিশুর বিকাশ নিয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা- 
শিশুর বিকাশ : পর্ব-১
শিশুর বিকাশ: পর্ব- ২
শিশুর বিকাশ- পর্ব ৩ (৮ থেকে ১৮ মাস)
শিশুর বিকাশ- পর্ব ৪ (দেড় থেকে তিন বছর)
শিশুর বিকাশ -পর্ব ৫(তিন থেকে পাঁচ বছর)
শিশুর বিকাশ-৬ (পাঁচ থেকে আট বছর)
শিশুর বিকাশ পর্ব ৭- আট থেকে এগারো বছর


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

Previous articleস্কুল রিফিউজাল বা শিশুদের স্কুলে যাওয়ার ভীতি
Next articleআমার মেয়ে অল্পতেই রেগে যায়, সারাক্ষণ ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে
প্রফেসর ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোরশেদ
চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট। অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here