আমাদের হাসান স্যারের জগৎ

0
8
হাসান আজিজুল হক
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

প্রধান অথবা অপ্রধান, উপমহাদেশখ্যাত কি খ্যাত নয় ইত্যাদি বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো একজন সাহিত্যিকের মনন, সৃজন, ভাষাশক্তি ইত্যাদি প্রসঙ্গ। শিল্পী বা সাহিত্যিক যে সমাজে বেড়ে ওঠেন সেই সমাজ ও তাঁর সময় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকেই তিনি ধারণ করেন তাঁর চেতনায়, তাঁর সাহিত্যকর্মে। হাসান আজিজুল হক (১৯৩৯-২০২১) একজন কথাসাহিত্যিক। কথারই শিল্পী তিনি। কথা দিয়ে অর্থাৎ শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে একটি বাক্যে তিনি তাঁর চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন সাহিত্যকর্মে। ছোটগল্পকার হিসেবে তাঁর পরিচিতি সর্বাধিক। জীবনবাদী কথাশিল্পী হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত বাঙালি পাঠকের কাছে। ষাট বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি যে খুব বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন তা নয়। কিন্তু স্বল্প সংখ্যক ছোটগল্পের সংকলন, দু-চারটি উপন্যাস এবং দু-একটি প্রবন্ধের সংকলন তাঁকে বাংলাভাষী পাঠকের কাছে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। কিন্তু কীভাবে? হাসান আজিজুল হকের গল্প বা উপন্যাসের বিষয় জীবনঘনিষ্ঠ, মৃত্তিকা-সংলগ্ন এবং তা পরিপূর্ণ শিল্প-অভিজ্ঞানে সমৃদ্ধ। সুতরাং সংখ্যায় নয় গুণে ও মানে হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যকর্ম বাঙালির জীবনে এক অমূল্য সম্পদ।

হাসান আজিজুল হক জন্মগ্রহণ করেছেন বর্ধমান জেলার যবগ্রামে। ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগের রাজনৈতিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন। তার আগে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন পশ্চিম বাংলায়। সুতরাং দুই বাংলার মাটি-মানুষ-প্রকৃতি ও জীবনের ছবি প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল। ফলে একদিকে যেমন রাঢ়বঙ্গের লাল মাটির সংগ্রামী জীবন ও তার ভাষাকে তিনি আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন তেমনই বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগ্রামও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছে থেকে। এসব কারণে হাসান হাজিজুল হকের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ ছিল বলেই ব্যতিক্রমী এবং বিশ্বমানের সাহিত্যকর্ম সৃজন করা তাঁর পক্ষে সহজ হয়েছিল। সাহিত্য সৃজনে ভাষা ব্যবহারে তিনি যে যত্নশীল ছিলেন তার প্রমাণ তাঁর সাহিত্য-সংকলনের নামকরণ লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। যেমন ছোটগল্পের সংকলনগুলো যথাক্রমে ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’, ‘আত্মজা ও একটি করবি গাছ’, ‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘পাতালে-হাসপাতালে, ‘নামহীন গোত্রহীন’ ইত্যাদি। তাঁর উপন্যাসসমূহ যেমন ‘আগুন পাখি’, ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’, ‘শামুক’ ও ‘বৃত্তায়ন’। এসব নামকরণের ক্ষেত্রেও হাসান আজিজুল হক শিল্পের শীর্ষদেশ স্পর্শ করেছেন। দেশ-কাল-সমাজ ও রাষ্ট্রকে তিনি ভেতর থেকে অধ্যয়ন করতে পেরেছিলেন। এজন্য তাঁর কাছে বাংলাদেশ বলতে তিনি গ্রামকেই বুঝতেন। সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপকে তিনি শহুরে শিক্ষিত জনশ্রেণির অভিশাপ বলেই ভাবতেন। বাংলাদেশের গ্রাম তাঁর কাছে মহাপবিত্র বলে মনে হতো। একটি প্রবন্ধে তিনি বলেছেন:

অবশ্য এটা ঠিক যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ যে শ্রেণীর সামন্ততান্ত্রিক ও মহাজনী শোষণে জর্জরিত ছিলো, সে শ্রেণী গড়ে উঠেছিলো মূলত হিন্দুদের দ্বারাই। খাঁটি মুসলমানদের নিয়ে যদি সামন্ত ও মহাজন শ্রেণী গড়ে উঠত, তাহলেও যে শোষণের বিন্দুমাত্র হেরফের হতো না এই কথাটা বরাবর আড়ালে রাখার জন্যেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এমন প্রয়োজন হয়েছিলো। তবু আমি বলবো বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে সমাজের কৃষিভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে যে নিরীহ হিন্দু-মুসলমান কৃষকশ্রেণী ক্লান্ত বলদের মতো অস্তিত্বের লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলো, সাম্প্রদায়িকতার মতো এমন ঝাঁঝালো মদও সেখানে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে  পারে নি।

এখন আমি হাসান আজিজুল হকের ভাষাচিন্তার পরিপার্শ্ব ও পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে দু’একটি কথা বলবো। হাসানের যে ভাষা রাঢ় বঙ্গের, সেটি তো বাংলা ভাষাই। সেখানেই জন্মেছেন তিনি, পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলার যবগ্রামে। শৈশব, কৈশোর ওখানেই কেটেছে তাঁর। সেটিই তাঁর জন্মভূমি। সেখানকার মানুষ, তার পরিপার্শ্ব ও চারপাশের বহমান জীবন তিনি প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন। এই জনপদের সঙ্গে সুগভীর সম্পর্ক ছিল তাঁর। সেটিই তিনি তাঁর লেখাগুলোতে আঁকতে পেরেছেন। এই জনপদের উপযোগী ভাষাটি তাঁর আয়ত্তে রয়েছে সর্বোত্তম। এতে লিখেই তিনি হাসান আজিজুল হক হয়েছেন। তিনি থাকতেন বাস্তব জগতে, এমনকি বাস্তবের রূঢ় জগতে। ওখানকার জীবনই কেবল নয়, তিনি বাংলাদেশের জীবনকে অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছেন। এই জনপদে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, জীবনপ্রবাহ বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন।

কল্পনার বাক্য তৈরি করলেও লেখককে থাকতে হয় বাস্তব জগতে। বাস্তবকে ছাপিয়ে যিনি পরিপূর্ণ সাহিত্য রচনা করেন, তিনিই কালকে জয় করতে পারেন অনায়াসে। হাসান সে কারণেই হাসান আজিজুল হক হয়েছেন। তিনি তাঁর সমকালীন ও চিরকালীন গল্পগুলোতে কেবল কাহিনিই সৃষ্টি করেননি; কাহিনির জন্য যারা কাহিনি লেখেন, সেখানে কাহিনিই মুখ্য থাকে। গল্পবস্তু বলে কিছু থাকে না। এক্ষেত্রে হাসান আজিজুল হক ব্যতিক্রম। হাসানের গল্প মানে জীবনের সংগ্রাম, বাস্তবতার সংগ্রাম। কাহিনির অপরূপ বাস্তব শিল্প হয়ে আছে তাঁর একেবারে প্রথম দিকের গল্পগ্রন্থগুলোতে। গল্পগুলো শুরুতেই তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। এই লেখার ভুবনের নায়ক ব্যক্তিটির সঙ্গে বাংলা বিভাগে আমার অধ্যাপনার সূত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে, নানা আলোচনায়, শিল্প-সাহিত্য-সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে দেদার কথা হয়েছে। তাতে আমরা সবাই লক্ষ্য করেছি-বরাবরই তিনি জীবনবাদী, যুক্তিনির্ভর ও মননশীল।

বিশেষ মর্যাদাবান ব্যক্তিরা নিজেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি কখনোই তেমন করেননি। হাসান সবার সঙ্গে মিশতে পারতেন। প্রচুর হাসতে পারতেন। অর্নগল কথা বলতে পারতেন। কৌতুকবোধে ভরপুর ছিল তাঁর মন। তাঁর ভেতরে উইট ও হিউমার ছিল প্রচুর। তাঁর সঙ্গে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি, তাঁর কথা শুনেছি। মনে পড়ে কথাগুলো শুনে আমরা প্রচুর হাসতাম বটে, কিন্তু আমাদের চিন্তার দরজাগুলো তরতর করে খুলে যেত তাতে।

হাসান আজিজুল হকের মধ্যে চাওয়া ও পাওয়ার বিষয়টি অত তীব্র ছিল না। এক লেখালেখি ও জ্ঞানের জগতেই তিনি আগ্রহী ছিলেন। মানুষটি ছিলেন সোজাসাপ্টা, কৃত্রিম ছিলেন না কোনোভাবে, কোনোকিছুতেই। প্রাণশক্তিতে ভরপুর ছিল তাঁর অন্তর্জগৎ। তাঁর লেখার বিষয়ে যৌনতার কোনো ছাপ ছিল না। জীবন ও জগৎ ছিল তাঁর সাহিত্যের বিষয়। অনেক লেখক যৌনতাকে সাহিত্যের বিষয় হিসেবে এনেছেন। যেমন জগদীশচন্দ্র গুপ্ত ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু তিনি আধুনিকতার সঙ্গী হতে যৌনতাকে নিয়ে কাজ করেননি। যৌনতাকে হাসান আজিজুল হক গল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচন করেননি। তাঁর গল্প টিকে থাকবে বয়নপদ্ধতি ও গল্পের বিষয়বস্তুর জন্য। বাঙালি লেখকদের মধ্যে সকলেই বাংলা ভাষায় লেখেন। কিন্তু বাক্যনির্মাণ, শব্দচয়ন, ক্রিয়াপদের কারুকার্য, ভাষা ও উপস্থাপনের অনন্যতা হাসান আজিজুল হককে করে তুলেছে সুদক্ষ এক শিল্পীরূপে। গল্পের যে বোধ সেখানেও মহান হাসান স্যার। মানব জীবনের উপস্থাপন যে ভাষায় বললে সবার জন্য আদর্শ হবে, মূল্যবান হয়ে উঠবে, মূল্যবোধ হয়ে থাকবে, সাহিত্যিক ও শিল্পিত দক্ষতা থাকবে সেভাবেই লিখে গিয়েছেন এই লেখক আজীবন।

এমন একটি ভাষা নিয়ে হাসান সারাজীবন থেকেছেন, যেটি বহুকাল আগে তিনি, কিশোর বয়সে ছেড়ে এসেছেন। জীবনে মোটে কয়েকবার সেই বর্ধমানের যবগ্রামে গিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা এই অধ্যাপক। আসলে স্মৃতি তাজা রাখতে হয়, যেখানেই যাই না কেনÑসেই তাজা স্মৃতিতে লিখে চলতে হয়। মানুষের মস্তিষ্ক তার জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ণ। স্মৃতি তার জীবনের ভাণ্ডার। তবে লেখকের জন্য সেটি রশদ জোগাড়ের কারখানা। যেমনটি হাসান আজিজুল হক তাঁর স্মৃতির ভাণ্ডারকে ব্যবহার করে দেখিয়েছেন। এই স্মৃতিভাণ্ডার দিয়েই মাইকেল ইউরোপে বসে লিখে গিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব রচনাগুলো। তারই সার্থক অনুসারী হাসান আজিজুল হক। স্মৃতির তারতম্যের কারণÑমস্তিষ্কের কোষ সকলের সমান ক্ষমতাবান নয়। তেমনই আরেকজন কবি জীবনাননন্দ দাশ। তিনি কলকাতায় বসে বাংলাদেশের বরিশাল নিয়ে অপূর্ব সব কবিতা লিখে গিয়েছেন। লেখকদের স্মৃতি তাজা না হলে আগের জীবনের কথা, সেখান থেকে প্রেরণা নেওয়া সম্ভবপর নয়। হাসান আজিজুল হক অনন্য ছিলেন এই কারণে যে তিনি তার ওই ছোটবেলার জীবনকে সকলের জন্য প্রেরণাময় করে তুলেছেন। তিনি যাপন করেছেন সুস্থ, স্বাভাবিক, মানুষের এক সবল ও কর্মক্ষম জীবন।

সকলেই হাসান আজিজুল হক নন, যেমনভাবে সকলেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম নন। বাঙালির জীবন, তার সংগ্রামী দিন, সংসার, দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম, হাসি-কান্না, তার রাসায়নিক শক্তি, বাইরের জগৎ, বাস্তবতার মিশেল, মানবতাবাদ দিয়ে তাঁর মনোজগৎ তৈরি হয়েছে। এসবে মহোত্তম এই লেখক সমাজকে অধ্যয়ন করেছেন গভীরভাবে। কোন শ্রেণির পাঠককে উপহার দিতে চান তার গল্পের ভুবন, সেটিও গভীরভাবে ভেবে টানা কাজ করে গিয়েছেন তিনি। হাসান সেসব কাজ রেখে গিয়েছেন বাংলা ভাষার মানুষদের মনন ও জীবনবোধ গড়ে দেওয়ার জন্য। শিল্পী হিসেবে তিনি এতই তুখোড় ছিলেন যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নবভুবন রেখে গিয়েছেন। মানব-মানবীর এমন স্বার্থক রূপ আর কোথা পাই?

হাসান আজিজুল হক ১৯৭৩ সাল থেকে আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ছিলেন। দর্শন বিভাগে পড়িয়েছেন টানা ৩১ বছর। তাঁর বিষয়ে কথা বলেছি অনেকের সঙ্গে। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাদের প্রায় সবাই হাসান স্যারের কোনো না কোনো লেখা অন্তত একবার পড়েছেন। এখানে এমনও আছেন শিক্ষক, ছাত্র, ছাত্রী, বিদ্বান যারা তাঁর প্রায় পুরো লেখালেখির জগৎকে অধ্যয়ন করেছেন। কেননা, উপমহাদেশখ্যাত লেখক, রাজশাহীর সুশীল সমাজের প্রাণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সভা, মঞ্চের নায়ক এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি বিভাগে পড়িয়েছেন কর্মজীবনে। অবসর জীবনেও তার সঙ্গে মিশে ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। হাসান আজিজুল হক তাই আমাদের পরিচয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরও। তিনি তো বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পরিচয় করিয়ে দেওয়া মানুষ। তাঁর জীবনের দর্শন ও লেখার দর্শন এক হয়ে গিয়েছিল বলে হাসান স্যার এত বড় মাপের লেখক হয়েছেন জীবদ্দশাতেই।

মিজানুর রহমান খান

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে 

“মনের খবর” ম্যাগাজিন পেতে কল করুন ০১৮ ৬৫ ৪৬ ৬৫ ৯৪
more

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here