নারীর মনোঃযৌন সমস্যা এবং কিছু ভুল ধারণা

নারীর মনোঃযৌন সমস্যা এবং কিছু ভুল ধারণা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মনে করা হয় শুধু পুরুষদের মধ্যেই যৌন সমস্যা দেখা যায়। কিন্তু ধারণাটি একদমই অমূলক। নারীদের মধ্যে ও যৌন সমস্যা দেখা দেয় প্রবলভাবে। যার জন্য অধিকাংশ সময় মনোবিজ্ঞানীদের শরণাপন্ন হওয়া জরুরী। কেননা, এ সমস্ত সমস্যার পিছনে অনেকাংশে শারীরিক কোনো কারণ থাকে না।

তার মানে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ ফিট হওয়া সত্বেও যৌনসুখ থেকে অনেক নারী বঞ্চিত হতে পারে। যৌন সমস্যার কারণগুলা নিয়ে হয়তোবা আরেকদিন লিখবো। আজকের মূল আলোচনা হবে নারীদের মনোঃযৌন সমস্যাগুলো এবং এ সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা নিয়ে।

সাধারণত ২ কারণে যৌন সমস্যা দেখা দেয়।

১. Primary sexual problems : এটা শারীরিক বা মেডিক্যাল সমস্যার কারনে হয়ে থাকে যেটার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। যেমন STD, STI ইত্যাদি।

২. Secondary sexual Problem : নন মেডিক্যাল বা মানসিক কারনে এ সমস্যা হয়ে যায়। বাংলাদেশে বেশীরভাগ যৌন সমস্যা হল Secondary sexual problems. মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে মনোঃযৌন সমস্যা বা Psychosexual dysfunction (PSD) বলা হয়।

আর এটার অন্যতম একটা কারন হলো যৌনতা সম্পর্কে কুসংস্কার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান থেকে পরিচালিত একটা গবেষণায় (Mozumder,K. and Rahman, M 2004) দেখা যায় যে, বাংলাদেশের ৯২% মানুষের মধ্যে যৌনতা সম্পর্কে নানা রকম কুসংস্কার এ বিশ্বাস রয়েছে।

সাধারণত নারীদের মধ্যে ৬ ধরনের মনোঃযৌন সমস্যা দেখা দেয়। নিচে সেগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ননা দেয়া হলো :

1. Impaired Sexual Interest ( যৌন আকাংখার অভাব):
এখানে নারীদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা আসে এবং যৌন সুখ লাভ করেন কিন্তু তাদের যৌন কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। নিজের মধ্যে যৌন আগ্রহ কমে যাওয়ার কারনে সঙ্গীর সব ধরণের যৌন আবেদন বা আচরণ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং নারী নিজ উদ্যোগী হয়ে কখনও সঙ্গীর সাথে যৌনতায় লিপ্ত হয় না।

কিছু কিছু মহিলা সঙ্গীর সাথে যৌনতায় আগ্রহ না পেলেও Masturbate করে যৌন সুখানুভূতি লাভ করে।
স্বামী স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহ, ঝগড়াঝাঁটি, বিষন্নতা, সঙ্গীর প্রতি সন্দেহবাতিকতা ইত্যাদি কারণে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

2. Impaired Sexual Arousal ( যৌন উত্তেজনার অভাব):
এ সমস্যায় নারীকে পর্যাপ্ত উদ্দীপ্ত বা Foreplay করা সত্বেও তার শরীর যৌনকাজের জন্য সাড়া দেয় না। সাধারণত Foreplay করলে নারীর যোনিপথ ভিজে যায় বা পিচ্ছিল হয়ে যায় কিন্তু এ সমস্যার জন্য যতই foreplay করা হোক, নারীর যোনিপথ সিক্ত বা পিচ্ছিল হয় না। এতে করে intercourse এর সময় যোনিপথে নারী তীব্র ব্যাথা বা জ্বালা অনুভব করেন। যেটার জন্য পরবর্তীতে যৌন কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।
বিষন্নতা, low self-esteem, anxiety, stress এবং দাম্পত্য কলহের কারণে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

3. Orgasmic Dysfunction (চরমপুলকগত সমস্যা) :
চরমপুলক হলো যৌনমিলনের একটা পর্যায়ে তীব্র আনন্দদায়ক অনুভূতি। এ ক্ষেত্রে নারীর মধ্যে যৌন উত্তেজনাসহ যৌনকাজে আগ্রহী হওয়া সত্বেও তাদের orgasm বা চরমপুলক (যৌন সুখের চরম পর্যায়) হয় না। কিছু কিছু নারী কোন পরিস্থিতিতেই চরমপুলক অনুভব করে না আবার কিছু কিছু নারী Masturbate বা হস্তমৈথুন করে চরমপুলক লাভ করে।

উপরোক্ত কারণগুলোর সাথে পুরুষ সঙীর দ্রুত বীর্যপাতের (Premature ejaculation) কারনে নারী চরমপুলক লাভ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী উভয়েরই মনোবিজ্ঞানীর কাছে চিকিৎসার জন্য যাওয়া দরকার।

4. Vaginismus (যৌনি পেশীর সংকোচন) :
এ সমস্যার কারনে intercourse বা যৌন সঙমের সময় নারীর যৌনীর চারপাশের পেশীগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। এতে করে সঙ্গী লিঙ্গ প্রবেশ করাতে পারে না বা জোর করে প্রবেশ করালেও যৌনসঙ্গম খুবই ব্যাথ্যাযুক্ত হয়। এতে করে যৌনকাজের প্রতি দুজনেরই আগ্রহ কমে যায়।

সঙ্গীর মনে নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয় যে, তার স্ত্রী তাকে পছন্দ করে না বা অন্য কোনো সমস্যা আছে। কিন্তু এ সমস্যায় যৌনি পেশীগুলো সংকুচিত হওয়ার পিছনে নারীর কোনো নিয়ন্ত্রণ একেবারেই থাকে না। সম্পূর্ণ অনৈচ্ছিকভাবে পেশীগুলো সংকুচিত হয়ে যায় intercourse এর সময়।

যেসব নারী শৈশবকালে বা বয়ঃস্বন্ধিকালে বিভিন্ন নেতিবাচক যৌন অভিজ্ঞতার কারণে যৌনতাকে নোংরা, লজ্জাকর, পাপ মনোভাব নিয়ে বড় হয়েছে তাদের মধ্যে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। যৌনতা নিয়ে কোনো তীব্র রকমের অপরাধবোধ কাজ করলেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে যেটার জন্য চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীদের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

5. Dyspareunia (ব্যাথাযুক্ত যৌন মিলন) :
যৌনমিলনের কারনে সুখানভুতি না পেয়ে নারী যৌনির ভেতর প্রচন্ড ব্যাথা বা জ্বালাপোড়া অনুভব করে। এতে করে পরবর্তীতে যৌনমিলন থেকে দূরে থাকে। সঙ্গীর সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়। এখানেও ছোট বেলা থেকে যেসব নারী যৌনতা নিয়ে নেতিবাচক ধারনা নিয়ে বড় হয়েছে তাদের এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যৌনতা পাপ, লজ্জা, নোংরা ইত্যাদি মনে করার কারনে যৌনাঙ্গ নিয়ে উদ্বিগ্ন, ছেলেদের সাথে যৌনতা নিয়ে কথা না বলা, যৌনতা বিষয়ে আলেচনা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার কারণে পরবর্তীতে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

6. Sexual Aversion (যৌন অপছন্দ) :
এ সমস্যার কারণে নারী তার সঙ্গীকে বিভিন্ন কারনে যেমন লিঙ্গের ধরন বা আকার, বীর্য ইত্যাদির কারণে অপছন্দ করে। অনেক নারীর বীর্য দেখলে ঘৃণা লাগে তাই তারা সঙ্গীর সাথে যৌনকার্য থেকে বিরত থাকে। জোরপূর্বক বিয়ে দেয়ার কারণে অনেক নারী তাদের সঙ্গীকে অপছন্দ করে যৌনকাজ থেকে দূরে থাকতে পারে।

উপরের সমস্যাগুলোর জন্য চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা Sex therapy দিয়ে থাকেন যাদের এ বিষয়ের ওপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ থাকে। কাজেই কারো মধ্যে যদি সমস্যাগুলো দেখা যায় বা যৌনজীবন অসুখের হয়, তাহলে কোনো রকম ভুল চিকিৎসা না নিয়ে সরাসরি চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীদের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।

নারীদের কিছু যৌন কুসংস্কার :

১. ভুল ধারনা : পুরুষদের লিঙ্গের উপর নারীদের orgasm বা চরমপুলক নির্ভর করে। লিঙ্গ মোটা বা বড়, কমপক্ষে ৮ ইঞ্চি না হলে যৌনতৃপ্তি হয় না।

সঠিক ধারণা : যৌনতৃপ্তির সাথে ছোট বড় লিঙ্গের সম্পর্ক নাই। মেয়েদের যোনিপথ ১০ সেমি বা ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা। যৌনিপথের প্রথম এক তৃতীয়াংশ সবচেয়ে বেশী উত্তেজনাকর স্থান। বাকি অংশে কম উত্তেজনা থাকে। যৌনতৃপ্তি নির্ভর করে প্রথম অংশে কতটা ঘর্ষণ হচ্ছে তার ওপর। যোনির ভিতরের অংশটি স্থিতিস্থাপক হওয়ায় যেকোন আকারের লিঙ্গ প্রবপশ করানো হোকনা কেন সেটা যোনিতে খাপ খাইয়ে নেয়।

২. ভুল ধারণা : যৌন মিলনের সময় স্বামী স্ত্রী একসাথে চরমপুলক লাভ না করলে গর্ভধারণ সম্ভব নয়।

সঠিক ধারণা : গর্ভধারনের জন্য চরমপুলক মুখ্য বিষয় না। যৌনমিলনের সময় যোনির যেকোনো জায়গায় বীর্যপাতের ফলে পরিপক্ব শুক্রাণু যোনির Fallopian tube এ প্রবেশ করে নিষিক্ত হয়ে গর্ভধারণ ঘটায়। অনেক স্বামী স্ত্রী র মধ্যে যৌন জীবন সুখের না হলেও গর্ভধারন ঘটে যায়।

৩. ভুল ধারণা : পুরুষের বীর্য পাতলা হলে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সঠিক ধারণা : এটা ডাহা অবৈজ্ঞানিক একটা ধারণা। শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর পরিপক্বতা ও সুস্থতার ওপর নির্ভর করে।

৪. ভুল ধারণা : মেয়েরা হস্তমৈথুন করলে যৌনশক্তি কমে যায়। মূলত হস্তমৈথুন পুরুষদের কাজ।

সঠিক ধারনা : যৌনসঙ্গী এবং যৌনকাজ না করেই যৌন সুখ পাওয়ার স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক একটা উপায় হলো হস্তমৈথুন বা Masturbation. হস্তমৈথুনের সাথে যৌনশক্তি কমার কোনো সম্পর্ক নাই। তবে সেটা স্বাভাবিক মাত্রায় হওয়া ভালো। অতিরিক্ত সবকিছুরই খারাপ দিক আছে।

আর পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও হস্তমৈথুন করে। আমেরিকাতে একটা গবেষণায় দেখা গেছে ৯২% পুরুষ আর ৬২% নারীর মধ্যে হস্তমৈথুন এর অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশে এ হারটা কেমন হবে সেটা আমরা সবাই বুঝতে পারতেছি।

তো কারো মধ্যে যদি উপরে বর্ণিত সমস্যাগুলো থাকে তাহলে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর সাথে বসতে পারেন। ওষুধ দিয়ে এ সমস্যাগুলো স্থায়ী সমাধান কখনোই হবে না। বরং আরও বাড়বে।

লেখক : মো. আকবর হোসেন
মনোবিজ্ঞানী,
এমএসএফ-হল্যান্ড
সিয়েরা লিওন মিশন

/এসএস/মনেরখবর/

No posts to display

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here