ফ্রয়েডের ‘অচেতন মনে’ কি আছে?

0
124

ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯) যখন মনের গোপনপুরীর রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছিলেন, তখন আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) কী বসে ছিলেন? রবীন্দ্রনাথ গীতবিতানে লিখেছেন-

আমি কান পেতে রই আমার আপন হৃদয়-গহন-দ্বারে
কোন গোপন-বাসীর কান্নাহাসির গোপন কথা শুনিবারে ।
ভ্রমর সেথায় হয় বিবাগি নিভৃত নীল পদ্ম লাগি যে,
কোন রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে ।।

কে সে আমার কেই বা জানে – কিছু বা তার দেখি আভা,
কিছু বা পাই অনুমানে, কিছু তাহার বুঝি না বা ।
মাঝে মাঝে তার বারতা আমার ভাষায় পায় কী কথা রে,
ও সে আমায় জানি পাঠায় বানী আমার গানে লুকিয়ে তারে ।।

তখনও ফ্রয়েডের বইগুলি অনুদিত হয়নি। ফ্রয়েড মনকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন- সচেতন (কনসাস), অধিচেতন (প্রিকনসাস) এবং অচেতন (আনকনসাস)।

Froyed

ফ্রয়েডের নিকট সচেতন মনের কার্য অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ও গতানুগতিক। সচেতন মন পরিচালিত হয় ব্যাক্তিগত বুদ্ধি, ইন্দ্রিয় ও পরিপার্শ্বের দ্বারা। জগতের সাথে লেনদেন করতে এই সচেতন মনই সর্বদা সচেষ্ট ও জাগরুক থাকে। একে চিনতে মানুষের খুব বেশি দেরী হয়না।

আমরা কখনো কখনো এমন সব অবিশ্বাস্য কাজ করে ফেলি; এমন আচরণ করি যে অন্যেরা তো দূরে থাক নিজেই নিজের কাজকে বা আচরণকে বিশ্বাস করতে পারিনা। ঠিক যেন নিজের চোখকে অবিশ্বাস করার মতো নিজের কাজকে, আচরণকে অবিশ্বাস করা। আমি এরকম কাজ করতে পারলাম কিভাবে বা অন্যের বেলায় বলি; না, সে এরকম কাজ কিছুতেই করতে পারেনা, সে এরকম মানুষই নয়। এই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে ফ্রয়েডকে। তাই তিনি তার জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন মনের গোপন কোন কুঠুরির রহস্য উদঘাটনে যেখানে মিলবে মানুষের অদ্ভুত, রহস্যময়, অস্বাভাবিক আচরণের আসল রহস্য।

আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক মনকে সমুদ্রের সাথে তুলনা করে। নদী থেকে সমুদ্রে প্রতিদিন যা কিছু এসে জমা হয় তা সমুদ্রের গোপন তলদেশে দৃঢ় নিশ্চল আকারে উত্তরোত্তর রাশীকৃত হয়। তেমনই আমাদের সচেতন মন প্রতিদিন যা কিছু আনছে, ফেলছে, সেই সমস্ত ক্রমে ক্রমে একটি বৃহৎ গোপন আধারে অচেতন মনে সঞ্চিত হয়। সম্পূর্ণ গভীরে গিয়ে কেউ তার স্তরপর্যায় আবিষ্কার করতে পারিনা। উপর থেকে যতটা দেখা যায় অথবা হঠাৎ ভূমিকম্প বেগে যে নিগূঢ় অংশ উপরে উৎক্ষিপ্ত হয়, সেটুকুই আমরা দেখতে পাই।

একজনে ছবি আঁকে একমনে- ও ওমন,
আরেকজনে বসে বসে রং মাখে- ও ওমন,
আবার সেই ছবিখান নষ্ট করে কোনজনা, কোনজনা?
তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা, মন জাননা,
তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা ওমন জাননা

কোন মানুষ আপন মনে অনুভব করতে চায় যে, সে প্রবৃত্তির দাস, সে পাপপ্রবণ, সে অপরাধপ্রবণ? কাজেই যার মনে এতটুকুও সভ্যতার আলো পৌঁছেছে, সে তাহার প্রবৃত্তিগুলোকে, পাপচিন্তা ও কলুষিত ইচ্ছাগুলিকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে- ভুলতে চেষ্টা করে। এবং এই চেষ্টাটা চলে কখনো সজ্ঞানে ও কখনো অজ্ঞানে।

বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নশাস্ত্র প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে, জগতে কোন বস্তুই নশ্বর নয়, ধ্বংসশীল নয়। যে বস্তুকে ধ্বংস করা হয়, তার রুপান্তর হয় মাত্র, কিন্তু সে পৃথিবী থেকে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়না। ফ্রয়েড প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে, আমাদের ইচ্ছা ও চিন্তা মুহূর্তের জন্য হলেও- তার বিনাশ নাই; সেগুলো ক্ষীণ হলেও সেগুলোর ক্ষয় নাই। সেগুলো রুপান্তর হয়ে- স্থানান্তরিত হয়ে বেঁচে থাকে।

যা কিছু আমরা ভুলে যাই, তা সত্যিই ভুলিনা; ঠেলে পাঠিয়ে দেই সেগুলোকে ঐ অচেতন মনের বন্দীশালায়। এভাবে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে যে সকল অশুভ চিন্তা ও ইচ্ছা মানুষের হৃদয়ে বারংবার বিক্ষোভ তুলেছে, সেগুলির একটিও বিনষ্ট হয় নাই। যুগযুগান্ত ধরে প্রজন্মান্তরে সেগুলি অচেতন মনের মহাফেজখানায় থরে থরে সাজানো রয়েছে। সেগুলো বের হবার জন্য প্রতিমুহূর্তে আক্রোশে দাপিয়ে মরছে, বলছে-

ওরে ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর।

বস্তুর মত মানুষের ভাব ও ভাবনাও অবিনশ্বর। কবির ভাষায়-
যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে
যে নদী মরুপথে হারাল ধারা,
জানি, হে জানি, তা-ও হয়নি হারা।

ডা. কৃষ্ণ রায়
এম ডি (সাইকিয়াট্রি) ফেইজ- এ, রেসিডেন্ট
মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত অন্য লেখার লিংক-

ফ্রয়েড নিয়ে অল্প স্বল্প

মানসিক রোগ নিয়ে ভুল ধারণা ভাঙছে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here