ধর্ষকের মন

1
183
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

সুদূর এক গ্রহ থেকে পৃথিবীতে এসেছে এক এলিয়েন, নাম হাবুজাবু। আন্তঃগ্রহ যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে পৃথিবীসহ সব গ্রহেরই খবরাখবর তারা পায়। সম্প্রতি ধর্ষণ নিয়ে আলাপ-আলোচনার ঢেউ তাদের গ্রহেও আছড়ে পড়েছে। আর তাই এ বিষয়ে সরেজমিনে দেখতে পাঠানো হয়েছে হাবুজাবুকে। তারা তো ভেবেই পায় না সভ্য জগতের বাসিন্দা দাবি করা এই গ্রহের মানুষ নামক প্রাণীগুলো কীভাবে একজন আরেকজনকে ধর্ষণ করতে পারে? কী মানসিকতা থেকে তারা এই কাজ করতে পারে?

হাবুজাবু ভাবলো যাবার আগে একটু ঘেঁটে দেখা যাক তথ্যভান্ডার। ঘাঁটতে গিয়ে সব যেন ঘোঁট পাকিয়ে গেল। এই বিষয়টি ইতিপূর্বে এত আলোচিত হয়েছে এত গবেষণা হয়েছে যে, সব একসাথে চিন্তা করে গোছানো যথেষ্ট শ্রমসাধ্য। তার ওপর নানা মুনির নানা মত। আবার প্রতিটা মতের আগে পেছনে আছে তর্ক-বিতর্ক, বাদ-প্রতিবাদ। যাই হোক, শুরুতে সে জানতে চেষ্টা করল ধর্ষণ কাকে বলে? ধর্ষণের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা এখনো কোথাও আছে বলে তার মনে হলো না। একদিকে দৃষ্টিপাত করতে গেলে অন্যদিকে খামতি হয়। বিশেষ করে আইনের দৃষ্টিতে কোনটা যে ধর্ষণ আর কোনটা যে যৌন নিগ্রহ সেটা বুঝে ওঠাও অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। আবার একেক দেশে একেক রকম নিয়ম কানুন।

কোনো দেশে স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক মেলামেশা ধর্ষণ, অন্য দেশে এটা কিছুই না। অনেক দেশেই পুরুষ কর্তৃক পুরুষ ধর্ষণের জন্য কোনো আইনি ব্যাপার স্যাপার নেই। এই সব কথার মারপ্যাঁচে জড়িয়ে হাবজাবুর হাঁসফাঁস অবস্থা। সে তখন ভাবল, এত প্যাঁচের কি দরকার! সহজভাবে এটাই ধরে নিই, যেকোনো অবস্থায় বা যে-কোনো পর্যায়ে একজন মানুষ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য আরেকজন কর্তৃক যে-কোনো ধরনের যৌন আক্রমণের শিকার হলেই সেটাকে ধর্ষণ বলা যাবে। সেটা পুরুষে-নারীতে, পুরুষে-পুরুষে, নারীতে-নারীতে, নারীতে-পুরুষে, এমনকি তৃতীয় লিঙ্গেও হতে পারে।

সে দেখল, মানব সভ্যতার আদিকাল থেকেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এসেছে। তবে, সেগুলোকে অনেক সময় ধর্ষণ বলেই মনে করা হতো না। অনেকের মতে, শুরুতে মানব সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। কিন্তু, সময়ের গতিতে ধীরে ধীরে যখন মানব সভ্যতা পুরুষতান্ত্রিক হয়ে গেল, তখন থেকে মেয়েরা পুরুষের আর দশটা সম্পত্তির মতো একটা সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়েছে। তখন থেকেই জন্ম নিয়েছে নারীকে যেমন ইচ্ছে তেমন ভাবে ভোগ করার প্রবণতা। আর এই প্রবণতা সবার চোখে স্বাভাবিক একটা নিয়ম হিসেবেই ছিল। শত্রুকে চূড়ান্ত অপমান করার একটি অনুষঙ্গ ছিল প্রতিপক্ষের অধীনে থাকা নারীদের ধর্ষণ। নারীদের সেই অর্থে খুব একটা মর্যাদা না থাকলেও তাকে সম্পদের মতো অধিকারে রাখা একটা আত্মমর্যাদার ব্যাপার ছিল।

আর সেই সম্পদ দখল করে তছনছ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যেন পূর্ণতা পেত শত্রুর পরাজয়। রাজার পরাজয় মানেই রাজ-রানী আর রাজকুমারীদের দাসীর জীবনে আটকে যাওয়া। সাধারণ নারীদের তো আর কথাই নেই। অবশ্য হাবুজাবু এই সব সাধারণ মানুষদের নিয়ে কোনো লেখা বা ইতিহাস খুঁজে পেল না। যা আছে সব রাজা-রাজড়াদের কাহিনির পাশে অকিঞ্চিৎকর। আর কিছু আছে মিথোলজিতে, যেখানে দেব-দেবতারাও অনেক সময় নারীর রূপে কামান্ধ হয়ে ধর্ষণ করেন। তাঁদের কেউ অভিশপ্ত হন এই অপরাধে, অথবা নারীকে আকাশের তারা বানিয়ে দিয়ে মুক্তি পান গ্লানি থেকে। সে-সময় এসবে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। আর এই নিয়ম যুগের পর যুগ, সভ্যতা থেকে সভ্যতায় বয়ে গেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে।

সমস্যা হলো যখন সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে ঘটল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, আর সেইসঙ্গে মানসিকতারও পরিবর্তন। এখানেই খটকা লাগে হাবুজাবুর। এখন তো মানুষেরা বলে যে তারা আধুিনক সভ্যতার বাসিন্দা। তাহলে, কীভাবে ধর্ষণ টিকে থাকে এখনো মানুেষর মনে! একটু ভাবতেই মনে মনে উত্তর পেয়ে যায়-যেভাবে খুনখারাবি, ঠক-জোচ্চুরিসহ আরো সব অপরাধ টিকে আছে এই পৃথিবীতে সেভাবেই টিকে আছে ধর্ষণ। ধর্ষণও তো একটা অপরাধ, তাই ধর্ষকের মনও আসলে একটা অপরাধীরই মন।

আচ্ছা মানষুগুলো কি চেষ্টা করেনি এদের মনস্তত্ত্ব জানতে-ভাবে হাবজুাবু। তখন এ বিষয়ে বেশ কিছু গবেষণার খোঁজ পেল সে। এদের মধ্যে Groth Typology একটা ব্যাপার ধর্ষণ সম্পর্কিত আলোচনায় প্রথমেই আসে। এটা নিকোলাস গ্রথ নামে এক গবেষকের নামে। তিনি এ্যান বারগেস, লিন্ডা হোলমস্ট্রম এর সাথে মিলে ১৯৩ জন ধর্ষক এবং ৯২ জন ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

এই Groth Typology -র মতে ধর্ষণ মূলত ধর্ষকের মনে লুকিয়ে থাকা রাগ, হতাশা, অসন্তোষ আর তীব্র লালসার বহিঃপ্রকাশ। এর ওপর ভিত্তি করে তাঁরা জোরপূর্বক ধর্ষণের তিনটি কারণ নির্দেশ করেন-ক্ষমতা, ক্ষোভ ও যৌনতা এবং ধর্ষকদেরকে তিনটি ধরনে ভাগ করেন। পরবর্তিতে তাঁরা সবকিছুকে দুটো সাধারণ অক্ষে ভাগ করেন। প্রথমটি হলো, ক্ষমতার জন্য ধর্ষণ (Power Rape) যেখানে বিভিন্ন উপায়ে শক্তি বা ভয়ভীতি দেখানোর মাধ্যমে ধর্ষণ করা হয়। এর পেছনে ক্রিয়াশীল ধর্ষকের মানসিকতার ওপর ভিত্তি করে এটিকে আবার দুটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। যথা : নিজের ক্ষমতার ওপর প্রত্যয় উৎপাদন করে এরকম (Power Reassurance)  এবং নিজের ক্ষমতা জাহির করা যায় এরকম (Power Assertive)। সহজ ভাষায় হাবজাবু যেটা বঝুল-ধর্ষণ করে ধর্ষকের মনে এই নিশ্চয়তা জন্মায় যে তার বেশ ক্ষমতা আছে, সেটা হতে পারে পরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা অথবা যৌনক্ষমতা। আবার কোনো কোনো ধর্ষক পুরুষ তার পুরুষত্ব জাহির করার তৃপ্তি পায় ধর্ষণের মাধ্যমে।

দ্বিতীয় অক্ষটি হলো, ক্ষোভের জন্য ধর্ষণ (Anger Rape) যেখানে ধর্ষণের জন্য নির্যাতন করা হয় এবং আক্রান্তকে বিভিন্ন অপমানজনক কাজ করতে বাধ্য করানো হয়। এটিকে আবার  ‍দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে ধর্ষকের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে-১. ক্ষোভের বদলা নেয়া (Anger Retaliation) এবং ২. ক্ষোভ উদ্দীপ্তকরণ ( (Anger Excitation)। হাবজাবু এটার অর্থ করল-কোনো কারণে ক্ষুব্ধ কোনো মানুষ আর কিছু করতে না পেরে অসহায় কারো ওপর ধর্ষণের মাধ্যমে তার বদলা নেয়ার একটা সুখ পায়। অন্যদিকে কিছু ধর্ষকামী মানুষ আছে যারা ধর্ষণের মাধ্যমে নিজের ধর্ষকামী মনকে উদ্দীপ্ত করে সুখ লাভ করে। পুরো বিষয়টা পড়ার পর, হাবুজাবুর মনে হলো ধর্ষণের পেছনে তাহলে কি মলূত একধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করে ধর্ষকের মনে?

কারণ, প্রকৃত বীর নাকি অসহায়কে আক্রমণ করে না। যারা নিজের বীরত্ব নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে সেসব কাপুরুষই নাকি নারী-শিশুবৃদ্ধ-দুর্বলকে হত্যার মাধ্যমে বীরত্ব জাহির করতে চায়। অন্তত এই পৃিথবীর মানব সভ্যতার ইতিহাস পড়ে হাবুজাবু এটাই বুঝেছে।

আরো পড়তে গিয়ে হাবুজাবু দেখল, এই Groth Typology-র বিষয়ে অনেকের দ্বিমত রয়েছে। তবে, অনেকে আবার এটাকে ভিত্তি করে নতুন মত দেয়ার বা যোগ করার চেষ্টা করেছে। যেমন : হেজেলউড এই Typology-র আরো বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন ধর্ষকের শারীরিক, বাচিক এবং যৌন-আচরণকেও এর অন্তর্ভুক্ত করে এবং আরো দুটি ধারা যোগ করে, যেমন : সুেযাগসন্ধানী (Opportunistic) ও দল বেঁধে (Gang) ধর্ষণ। কেউ কেউ তো আবার আরো একধাপ এগিয়ে। যেমন: পেথেরিক এবং টার্ভি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, এই Typology শুধু যৌন অপরাধ বা ধর্ষণের জন্যই নয়, খুন-ডাকাতিসহ যাবতীয় অপরাধ মাত্রেরই ব্যাখ্যা দেয়।

আবার, একটা জায়গায় হাবুজাবু দেখল ধর্ষকের মনকে বিবর্তনের দিক থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। যদিও তাঁরা নিজেরাই বলেছেন যে, অনেকে এই ধরনের চেষ্টাকে অপছন্দ করে, কারণ ধর্ষণ যদি বিবর্তনের ধারা বেয়েই আসে, তবে ধর্ষককে এর জন্য দায়ী করার আর কোনো ভিত্তি থাকে না। এর জবাবে তাঁরা বলেছেন, বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্বের  (Evolutionary Psychology) দিক থেকে যেসব সিদ্ধান্ত দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে গবেষণায় সেসবের পক্ষে-বিপক্ষে নানাবিধ ফলাফল পাওয়া গেছে।

যেমন : স্বাভাবিক নিয়মে যৌনসঙ্গী না পাওয়ার দরুন বা বঞ্চিত হবার কারণে মানুষ ধর্ষণ করে-এমন মতের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁরা ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছেন যে, ধর্ষণের পেছনে থাকে শর্তসাপেক্ষ মিলন-কৌশল (Conditional Mating Strategy),যেটা সব পুরুষের মনেই থাকে। এই কৌশল তৈরি হয় গুণগতভাবে আলাদা আলাদা বিভিন্ন পূর্বপুরুষ থেকে প্রাপ্ত অনষুঙ্গ এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন ব্যাপার-স্যাপারের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে।

ধর্ষকদের ক্ষেত্রে ধর্ষণ করার পেছনে যে মানসিকতা তার উপর ওপর ভিত্তি করে এই কৌশল পাঁচ ধরনের হয়। প্রথমত, সুবিধাবঞ্চিত পুরুষ যার কাছে ধর্ষণ একটা অবলম্বন। দ্বিতীয়ত, বিশেষায়িত ধর্ষক যারা শুধমুাত্র আগ্রাসী যৌনকর্মের মাধ্যমেই যৌন উত্তেজনা পায়। তৃতীয়ত, সুযোগসন্ধানী ধর্ষক যারা সবদিক বিবেচনা করে যদি দেখে ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই তখনই ধর্ষণ করে। চতুর্থত, মিলনের তীব্র চাহিদা সম্পন্ন পুরুষ যারা কর্তৃত্বপরায়ণ এবং মনোবিকারগ্রস্ত। সবশেষে পঞ্চম ধরন হলো নিজ যৌনসঙ্গীর ধর্ষক।

হাবজুাবু ভাবল তত্ত্বের কচকচানি তো অনেক হলো এবার যাই সরেজমিনে দেখে আসি মানষুগুলো কে কী করছে, কী ভাবছে। সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যক্রমে, সে এসে পৌছঁল বাংলাদেশের মাটিতে। অবশ্য তাকে কেউ দেখতে পায় না, তাই কোথাও তার ভয় নেই। নিশ্চিন্তে বেশ কয়েক মাস ঘুরে বেড়ালো এখানে-সেখানে। একদিন সে দাঁড়ায় এক পাটক্ষেতের পাশে। শোনে চাপা গলায় কথা বলছে এই গ্রামের চেয়ারম্যানের বখাটে ছেলে আর তার দুই সাঙ্গপাঙ্গ। আলাপ করছে এক কিশোরীকে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার উচিত শাস্তি দেবে স্কুল থেকে ফেরার পথে তুলে নিয়ে গিয়ে।

এক বন্ধু মজা নিতে রাজি কিন্তু ভয় পাচ্ছে মামলার, পুলিশের। তাকে উপহাস করে চেয়ারম্যানের ছেলে। বলে তার বাবার অনেক ক্ষমতা, সব ঠিকই ম্যানেজ করে ফেলবে। আর ধর্ষণের অনেক খবরইতো পত্রিকায় আসে, কয়জনের শাস্তি হতে দেখেছে তারা এ পর্যন্ত! হাবুজাবু বুঝতে পারে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের সাথে এখানে যোগ হয়েছে আইনের প্রয়োগহীনতা। বিবেকহীন এই ছেলেগুলোকে যেন আটকানোর কিছুই নেই। শেষ পর্যন্ত কী হবে তা জানার আগ্রহ আর নেই হাবুজাবুর।

সে চলে এল একটা শহরতলীর বাসস্ট্যান্ডে। দেখল একটা খালি বাসে আড্ডা দিচ্ছে ঐ বাসের হেল্পার আর তার দলবল। পত্রিকায় কয়েকদিন ধরেই আসছে, চলন্ত বাসে গণধর্ষণের খবর। সেসব পড়েই তাদের উত্তেজিত আলোচনা। কীভাবে সুযোগ পেলে তারাও মজা করতে পারত, একজনের সুযোগ হলে অন্যদেরকে যেন জানায়, প্রয়োজনে তারাও সহায়তা করবে-এই সব আলাপ চলছে। হাবুজাবু ভাবে, তবে কী পত্রিকার খবর পড়ে তাদের মনের পরিবর্তন ঘটছে?

এরা আগে যা ভাবেনি, তাই ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। কিছু একটা ব্যবস্থা করা তো দরকার যাতে করে সঠিক বক্তব্যটাই শুধু পৌঁছে, রসালো আলাপের খোরাক না হয়ে। ওদের আলাপের সাথে সাথেই চলতে থাকে মাদক সেবন। একসময় এক হেল্পারের পিনিক ওঠে। তার মাথায় ঘুরতে থাকে, তাকে আজ কারো সাথে কিছু একটা করতেই হবে। মাদকের ঘোরে তার মনে একটাই চিন্তা-প্রয়োজনে ধর্ষণ।

হাবুজাবু এবার গেল একটা শহরে। যেখানে পাশাপাশি আছে একটা বালকদের এবং আরেকটা মেয়েদের বিদ্যালয়। সেখানে গিয়েই সে টের পায় ছেলে-মেয়েদের পরস্পরের প্রতি চাপা কৌতুহল। ও জানে, এখানে এসব বিষয় খারাপ কাজ হিসেবেই দেখা হয়। তা সত্ত্বেও বন্ধ থাকে না কখনো, গোপনে চলতেই থাকে। সে ছেলেদের একটা জটলার মধ্যে ঢুকে পড়ে। গিয়ে দেখে এক ছেলেকে নিয়ে তার সহপাঠীরা রঙ্গতামাশা করছে। সে বেচারার প্রেমপত্রে ছিল পাশের স্কুলের এক মেয়ের সাথে কীভাবে রোমান্টিক একটা সময় কাটাবে তার কাব্যিক বিবরণ।
আর এটাই হাসাহাসির কারণ। গায়েগতরে বেশ শক্তিশালী তার এক সহপাঠী এই ছেলেকে তাই বলছে মেয়েলি। সে বলে, ‘আরে বেটা, প্রেমট্রেম এইসব হাবিজাবির শেষটা কী? বিয়ে আর বিছানা। এখন কি আর সেই দিন আছে, একটারে নিয়া সারাজীবন ফ্যাচর ফ্যাচর করবা! শুনো মেয়ে হলো বাঁদরের মতো। লাই দিলে মাথায় উঠবে। শক্ত হাতে এগুলারে চালাইতে হয়, এগুলোর কোনো বুদ্ধি-শুদ্ধি আছে যে নিজে চলব! আর তাই, এত ভাবের আলাপ ওদের জন্য না, ওদের জন্য একটাই নীতি-ধর তক্তা মার পেরেক।’

আঁতকে উঠে হাবজুাব। এত ছোট মানুষ এই সব কথা কীভাবে বলে? ছেলেটির সাথে সাথে সে তার বাড়িতে যায়। গিয়ে দেখে, তার বাবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাই তিনিই সর্বেসর্বা। মা সারাদিন গৃহস্থালি কাজ সারেন, পরিবারের সবার খেয়াল রাখেন। এরপরও তীব্র ভয়ে থাকেন কখন স্বামী রাগ করেন। কারণ, উনার কথার বাইরে বা ইচ্ছের বাইরে চলার পরিণাম ভয়াবহ। একদিন এক লোক তার স্ত্রীসহ বেড়াতে আসে ছেলেটির বাড়িতে। লোকটি যত খুশি, স্ত্রী-টি ততই মলিন, মনমরা। ছেলেটির বাবাকে লোকটি বলে, ‘আপনার টিপস তো খুবই কাজের। একদম ঠান্ডা সব।’

হাবুজাবু ঘটনাটি বুঝতে সময়ের বিপরীতে চলে যায়। দেখে, লোকটি বলছে, বাসর রাতে লোকটি বিড়াল মারতে পারেনি। এরপরেও পারছে না, কারণ স্ত্রী নাকি ভয় পাচ্ছে ব্যাপারটাতে। উত্তরে ছেলেটির বাবা ঠিক সেই কথাগুলোই বলে, যেগুলো ছেলেটি তার বন্ধুকে বলেছিল। আর ছেলেটি এইসব কথা আড়াল থেকে শুনেছে। হাবুজাবু আন্দাজ করে, পরিবারের পুরুষেরা যদি নারীদের সম্মান না করে, তাহলে শিশুর মধ্যে নারীকে সম্মান দেওয়ার বোধ গড়ে ওঠে না, তাকে মানুষ ভাবাও সম্ভব হয় না। হয়তো তাই, নিজের স্ত্রীকেও জেনে  বা না জেনে প্রতিদিন ধর্ষণ করে যেতে পারেন এই মন মানসিকতার মানুষ।

সে ফিরে যায়, সেই ছেলেটির কাছে যে প্রেমপত্র নিয়ে হাসাহাসির পাত্র হয়েছিল। হাবুজাবুর মনে হয় এই কদিনে ছেলেটির মন যেন পালটে গেছে অনেক। ঐদিনের ঘটনার পর থেকে সবার কাছে শুনে শুনে তারও মনে হচ্ছে, সে আসলে ভুল ভেবেছে এতদিন। এর মধ্যে আরো কিছু বন্ধুর সাথে মিলে গোপনে দেখতে শুরু করেছে পর্নোগ্রাফি। যার সবগুলোতেই পুরুষরাই নায়ক, তারা নির্মমভাবে কিংবা ইচ্ছেমতো ভোগ করে নারী-শরীর। নারীরা সব ভোগ্যবস্তু।

নারীরা নিজেরাও সারাদিন উত্তেজিত হয়েই থাকে, একটু টোকা দিলেই শুরু করে দেয় যৌনকর্ম, যতই কষ্ট দেয়া হোক না কেন নারীরা সেসবে বেশি খুশি হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব দেখে দেখে ছেলেটির মনে হয় নারীরা আসলে এমনই হয়। ওদের আলাদা কোনো আবেগ-অনভুূতি নেই। আর যতই মুখে না বলুক, ওরা আসলে মনে মনে এটাই চায়। অতএব, জোর করে করলেই একসময় সব মেনে নিয়ে হাসবে।

সিনেমাতেও তো এইভাবেই প্রেম হয়। এতদিন সে বোকা ছিল। আর তাই, চালাক হওয়ার প্রয়াসে একদিন খালি বাসায় ডেকে এনে তার কিশোরী প্রেমিকার সম্ভ্রম কেড়ে নেয়। কিশোরীর না পাত্তা পায় না ছেলেটির কাছে। কিশোরীটি যাবার আগে তাকে জিজ্ঞেস করে-কেন সে এমন করল? ছেলেটির উত্তর, ‘ন্যাকা সেজো না। তুমি তো জেনেশুনেই এসেছ যে বাসা খালি, কেউ নেই। আর খালি বাসায় দজুন প্রেমিক-প্রেমিকা কী করে তুমি বুঝি জানো না?’

হাবজাবু বঝুতে পারে, ডেট রেপ কীভাবে হয়। মেয়েটি অশ্রুসিক্ত চোখে বাসার দিকে বেরোয়। তার সাথে হাবুজাবুও যেতে থাকে। মেয়েটি ভাবে, কীভাবে সে বাসায় মুখ দেখাবে এখন? সত্যিই তো, সে-ই তো দায়ী। ও যদি ভালো মেয়ে হতো, তাহলে তো ঐ খালি বাসায় যেত না। সিদ্ধান্ত পালটে সে তার ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবীর বাসায় যায়। সেখানে আরো দইুজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবীকেও পায়। তাদের সব খুলে বলতেই তারা হেসে ওঠে।
তাদের মতে, এসব কি আর এখন কোনো ব্যাপার নাকি। বরং এখানে মেয়েটি জিতে গেছে, ছেলেটি হেরে গেছে। কারণ, একটা মেয়ের পেছনে একপাল ছেলে ঘোরাটাই তো স্মার্ট মেয়ের সার্থকতা। ছেলেরা যেমন ফ্লার্ট করে, মেয়েরাও তা করতে পারে। শুধু পুরুষরা ভোগ করবে কেন, আমরাও পারি। এই বলে গান ছাড়ে চিকনি চামেলি, আর সবাই গানের নায়িকার মতো নাচতে থাকে।

হাবুজাবুর সাথে আসা মেয়েটিকে দ্বিধাগ্রস্তভাবে বসে থাকতে দেখে এক বান্ধবী গান বন্ধ করে একটা পর্ন মুভি ছেড়ে দেয়, যেখানে একটা নারী একটা পুরুষকে সমানে নির্যাতন করে চলেছে। ঠিক যেন মুদ্রার ও-পিঠ। হাবুজাবু বুঝতে পারে, এটাও আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটা বিপরীত প্রতিচ্ছবি, যেখানে কাজ করছে সেই ক্ষমতা, ক্ষোভ আর লালসা-ই।

এরপর সে একদিন গেল অনেক উচুঁ একটা দালানে নিজগ্রহের সাথে ভালোভাবে যোগাযোগ করার জন্য। সেখানের একটা অফিসে ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা শুনতে পেয়ে ঢুঁ মারল ভেতরে। দেখল, একদল শিক্ষিত চৌকস পুরুষকর্মী দপুুেরর ভাত খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, ধর্ষণের জন্য দায়ী আসলে মেয়েরা নিজেই। ওরা যেই কাপড়-চোপড় পরে, যেভাবে চলাফেরা করে তাতেই পুরুষ উত্তেজিত হয়। আর একসময় সহ্য করতে না পেরে পুরুষ ধর্ষণ করে ফেলে।

হাবুজাবুর মনে পড়ল ভারতের মধুমিতা পান্ডের গবেষণার কথা। সেখানে এক পুরোহিতের সহকারী পাঁচ বছরের এক মেয়েশিশুকে ধর্ষণ করার কারণ হিসেবে বলেছিল, সেই শিশুটি নাকি উত্তেজক কাপড় পরত, উত্তেজক আচরণ করত। শুধু তাই নয়, মেয়েটি এবং তার মা উভয়ের চরিত্রই খারাপ। আর তাই সে মেয়েটিকে শিক্ষা দেয়ার জন্য এই কাজটি করেছে, তার কোনো দোষ ছিল না।

হাবুজাবুর প্রশ্ন-পাঁচ বছরের মেয়ে উত্তেজনার কি বোঝে? আরেকজন বলল, ‘কি দরকার মেয়েদের ঘরের বাইরে এসে চাকরি করার। বাইরে চাকরি করতে যাবা, গাড়িতে উঠার জন্য পুরুষ মানুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি করবা আর মাঝে মধ্যে একটু-আধটু কিছু হবে না এটা ভাবো কী করে! পুরুষ তো, তার সংযমেরও তো একটা সীমা আছে।’ অবাক করা বিষয় হলো, কিছুিদন আগে গ্রামের এক শিক্ষা-দীক্ষাহীন লোকদের আড্ডাতেও এই একই কথাগুলো শুনেছিল সে।

সমাধান টানল হাবুজাবু-এই ক্ষেত্রে বর্তমানে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরীব, শহরগ্রামের কোনো পার্থক্য নেই। ভাগ্যিস হাবুজাবু আগে কিছু জেনেটেনে এসেছিল। নইলে ভাবত-ঠিকই তো। কিন্তু এখন সে জানে এই সবকিছু পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনার, নারীকেও তার মতো একজন মানুষ হিসেবে না ভাবতে পারার ফসল। গ্রথের মত অনুসারে এদের মনটাকে ব্যাখ্যা করা যায়-ক্ষমতা, ক্ষোভ আর যৌনলালসা দিয়ে। নারীর চেয়ে সে বেশি ক্ষমতাবান। সেই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে নারীর অগ্রযাত্রা। আর তা থেকে তৈরি হয় ক্ষোভ, আর সুযোগে বেড়ে উঠে যৌনলালসা।

যদি সঠিকভাবে চিন্তা করত তবে সে গাড়ির স্বল্পতা বা সামগ্রিক অব্যবস্থাপনাকে দোষ দিত, তা পরিবর্তনের চেষ্টা করত। কিন্তু, সে ক্ষমতা তার নেই। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ যেমন কখনোই গাড়িতে বসে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয় না, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে; তেমনি স্বাভাবিক মানুষ হলে তার যৌনলালসাকেও সে নিয়ন্ত্রণ করত, অন্যকে দায়ী করত না।

আরেকজন বলল, ‘আগের দিনে অল্পবয়সে বিয়ে দিয়ে দিত, তাই তখন এত ধর্ষণ ছিল না। এখন যৌন-উত্তেজনা আসা তো স্বাভাবিক, সেটা কীভাবে মিটাবে একটা ছেলে। তাই, সঙ্গীর অভাবে সে এই কাজ করে ফেলে।’ হাবুজাবুর মনে পড়ল, গবেষণায় এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বঝুতে পারল হাবুজাবু-এরা ধর্ষক নয়। তবে ধর্ষণের স্বপক্ষে সামাজিক-ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী এদের মন।

না, আর ঘোরাঘুরি নয়, এবার নিজের গ্রহের পথ ধরে হাবজাবুব। সে বুঝে গেছে, একেক ধর্ষকের মন এর অবস্থা ক্ষেত্রভেদে একেক রকম। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিকসহ পারিপার্শ্বিক অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে এই অবস্থা। তবে একেবারে গোঁড়াতে ওপরের বিষয়গুলোই মূল ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দিনশেষে সবকিছুই আসলে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার।

নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে, শাস্তি-ক্ষতির ভয় ভুলে তাই কিছু কিছু মানুষ ধর্ষক হয়। শুভবুদ্ধির মানুষ তাদেরকে ধিক্কার দেয়। কিন্তু অনেক অনেক মানুষ ঘুরে বেড়ায় ধর্ষকের মন নিয়ে। তাদের অনেকেই আবার সমাজে স্বীকতৃও হয়।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

“মনের খবর” ম্যাগাজিন পেতে কল করুন ০১৮ ৬৫ ৪৬ ৬৫ ৯৪

1 COMMENT

  1. আসলে ধর্ষণ নিয়ে প্রায় সব বিষয়ই উঠে এসেছে এখানে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বার্থ নিয়ে গোলমাল হলে আপোষের বিষয়টি ও ধর্ষণ হয়ে যায়। তারপরও চমৎকার হয়েছে আপনার লেখাটা। ধন্যবাদ আপনাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here