খেলায় আক্রমণাত্মক আচরণ কতটা সঙ্গত

0
25
খেলায় আক্রমণাত্মক আচরণ কতটা সঙ্গত

খেলার মাঠ বা খেলার মাঠের বাইরে আগ্রাসী বা আক্রমণাত্মক আচরণের উদাহরণ সবখানেই আমরা দেখি। আক্রমণাত্মক আচরণের সংজ্ঞা নিয়ে আছে নানা মানুষের নানা মত।

তবে সহজভাবে বললে আক্রমণাত্মক আচরণ হচ্ছে প্রতিপক্ষকে শারীরিক বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে এমন কোনো আচরণ করা (আঘাত বা অঙ্গভঙ্গি) বা এমন কিছু বলা, যা যাকে উদ্দেশ্য করে আচরণটি করা হয় তিনি অপছন্দ করবেন বা এড়িয়ে যেতে চাইবেন।

খেলার মাঠে আক্রমণাত্মক আচরণ (Aggression) বলতে বেশিরভাগ সময়ই আসলে দৃঢ় আচরণকেই (Assertive) বোঝানো হয়। খেলাধুলায় এই আক্রমণাত্মক আচরণের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু-ধরনেরই প্রভাব আছে।

অনেকেই খেলায় আক্রমণাত্মক মনোভাবকে অপছন্দ করেন কিন্তু কোনো কোনো মনোবিদ মনে করেন আক্রমণাত্মক মনোভাব দক্ষতা বদ্ধিতে সহায়ক। খেলায় আক্রমণাত্মক আচরণের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হলে, আমাদের আগে জানা দরকার একজন খেলোয়াড় কখন আক্রমণাত্মক আচরণ করেন বা কেন করেন।

শুধু খেলোয়াড় নন, যেকোনো ব্যক্তির আক্রমণাত্মক আচরণের কারণ হিসেবে মনোবিজ্ঞানীগণ কয়েকটি তত্ত্বের অবতারণা করেন। এর মধ্যে খেলাধলার সঙ্গে সম্পর্কিত সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্ব হচ্ছে frustration  aggression heory এই তত্ত্বানসারে, কোনো কাজে সাফল্যের ক্ষেত্রে বাধা বা বিপর্যয় দেখা দিলে ব্যক্তি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ক্রিকেট মাঠে কোনো একজন ব্যাটসম্যানকে আউট করতে ব্যর্থ হয়ে বোলার অনেক সময় তার গায়ে বল (বডি লাইন) করেন তাকে আহত করে অবসরে পাঠানোর উদ্দেশ্যে। বডি লাইন সিরিজ নামে ক্রিকেটের ইতিহাসে কুখ্যাত সিরিজের কথা আমরা জানি।

আরেকটি তত্ত্ব হচ্ছে প্রবৃত্তি তত্ত্ব বা (instinct theory) । এই তত্ত্ব মতে, মানুষের মধ্যে দুই ধরনের প্রবৃত্তি ক্রিয়াশীল। জীবনী বা সৃষ্টিশীল প্রবৃত্তি (eros) ও মরণ বা বিনাশী প্রবৃত্তি (thenatos) ।

এই তত্ত্বের প্রবক্তা সিগমন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষের আক্রমণাত্মক আচরণ আসলে উল্লিখিত দ্বিতীয় প্রবৃত্তির (thenatos) প্রকাশ। তিনি বলেন, মানুষ তাদের এই প্রবৃত্তিগুলো অন্য কোনো সামাজিকভাবে গ্রহণীয় কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করে। মাঠে গিয়ে যে শারীরিক খেলাধুলা বা contact sports এটা আসলে মানুষের বিনাশী প্রবৃত্তিরই প্রকাশ।

কোনো কোনো তাত্ত্বিক (social learning theory of Bandura)) আবার বলতে চান আক্রমণাত্মক আচরণ জন্মগত বা প্রবৃত্তিগত নয়, এটা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট। একজন মানুষের পরিবার, বেড়ে ওঠার পরিবেশ, তার যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা এ সবকিছুর মিথস্ক্রিয়ায় তার ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে, ব্যক্তিত্বের ধরনের ওপর নির্ভর করে সে কোন পরিস্থিতিতে কী রকম আচরণ করবে বা প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

খেলার মাঠে সাফল্যের জন্য প্রণোদনা, পরাজয়ের বিপরীতে প্রাপ্যতার ধরনের ওপরও নির্ভর করে আচরণ কতটা আগ্রাসী হবে। এছাড়াও আগ্রাসী আচরণকে অন্যরা (সতীর্থ খেলোয়াড়, অধিনায়ক, কোচ ইত্যাদি) কতটা উৎসাহিত বা নিরুৎসাহিত করছেন এ বিষয়টিও একজন খেলোয়াড়ের আচরণকে প্রভাবিত করে।

অনেকসময় খেলার তাৎক্ষণিক পরিস্থিতিও আক্রমণাত্মক আচরণের উদ্রেক করতে পারে। যেমন: কত সময় ধরে খেলা হচ্ছে, খেলার কত সময় বাকি আছে, প্রতিপক্ষের স্কোর, দর্শকদের আচরণ-উৎসাহ ইত্যাদি।

আরো কিছু ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: নীতি-নৈতিকতার ধারণা, মানবিকতাবোধ ও আত্মশ্লাঘা বা অহংবোধের মাত্রা। প্রতিপক্ষকে আঘাত করা কতখানি যৌক্তিকÑন্যায়ানগ এ ধারণায় ব্যক্তিবিশেষে পার্থক্য থাকবেই। ফলে কোনো আচরণ আপাতদৃষ্টিতে আগ্রাসী বোধ হলেও সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় হয়ত এটাকে স্বাভাবিক মনে করে দু:খবোধ নাও করতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে আমরা ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনালে জিদান-মাতারাজ্জির ঘটনাকে দেখতে পারি। যেখানে মাতারাজ্জি অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ করে জিদানকে উত্তেজিত করেন, প্রতিক্রিয়া হিসেবে জিদান নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাতারাজ্জিকে শারীরিকভাবে আঘাত করে বসেন। পরিণতিতে জিদানকে শাস্তি পেতে হয়।

এই ঘটনায় মাতারজ্জি নিজের আচরণে অনুতপ্ত হননি, এটাকে তিনি কৌশল হিসেবেই দেখছেন। সাধারণত দেখা যায় সফল ও জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়গণ তুলনামূলক নবীন খেলোয়াড়দের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণ বেশি করে থাকেন।

এখন আসা যাক মূল প্রশ্নে, খেলার মাঠে আক্রমণাত্মক আচরণ বা আগ্রাসন কী বা কতটা প্রয়োজনীয়?

খেলার মাঠে আক্রমণাত্মক আচরণ ও দৃঢ় আচরণের মধ্যে বিভাজন রেখা খুবই সুক্ষ্ম। ফলে কোন আচরণ আক্রমণাত্মক এবং কোনটি দৃঢ় আচরণ এটা নির্ণয় করা দর্শক ও খেলা পরিচালনাকারীর জন্য যেমন কঠিন, তেমনি খেলোয়াড়দের জন্যও মাঠে মহুর্তের মধ্যে নিজের আচরণের নিয়ন্ত্রণ দুঃসাধ্য।

যেকোনো খেলাতেই খেলোয়াড় বা দর্শক সবারই নিজের বা নিজের দলের বিজয় আকাঙ্খা করে থাকেন। খেলায় যদি ফলাফল শূন্য হয়, তবে সে খেলা কারও মধ্যেই আগ্রহ জন্মাতে পারে না। খেলায় যদি বিজয়ই হয় লক্ষ্য তবে সে খেলায় আগ্রাসন অনিবার্য।

খেলার মাঠে আক্রমণাত্মক আচরণগুলো দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটাকে বলা যায় শত্রুতাপূর্ণ বা Hostile aggression আর অন্য ধরনের আচরণকে বলা যায় কৌশলগত বা Instrumental aggression।

প্রথম ধরনের আক্রমণাত্মক আচরণের উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষকে আঘাত করা বা আহত করা। এই আচরণের পেছনে কাজ করে ব্যক্তি বা খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ক্রোধ, ক্ষোভ কিংবা প্রতিহিংসা।

কৌশলগত (Instrumental) আচরণের উদ্দেশ্য হয় প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে লক্ষ্য অর্জন করা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন ফুটবলার বল দখলের জন্য যখন প্রতিপক্ষকে ট্যাকল করেন অথবা একজন দ্রুতগতির বোলার যখন ব্যাটসম্যানকে অপ্রস্তুত করার জন্য বাউন্সার দেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, অভিজ্ঞ ও দক্ষ খেলোয়াড়গণ সাফল্যের জন্য বেশি বেশি কৌশলগত আক্রমণাত্মক আচরণ করেন এবং শত্রুতাপর্ণ আক্রমণাত্মক আচরণ কম ব্যবহার করেন। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়গণ আগ্রাসী আচরণের সময়েও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হন। ফলে আগ্রাসন ও দৃঢ়তার মধ্যেকার সূক্ষ্ম রেখাটি তারা লঙ্ঘন করেন না।

আগ্রাসন বা আক্রমণাত্মক আচরণের কৌশলগত ব্যবহারই (Instrumental) আমাদের কাম্য। এ ধরনের আচরণে খেলাধুলার মূল চেতনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তেমনি খেলাও হয়ে ওঠে সকলের জন্য উপভোগ্য।

কিন্তু আগ্রাসনের লক্ষ্য যদি হয় প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে আঘাত করা বা লাঞ্ছিত করা, তা অবশ্যই নিন্দনীয়। খেলার দর্শন যদি যেকোনো মূল্যে বিজয় অর্জন হয় তবে মাঠে আগ্রাসী আচরণ অনিবার্য পরিণতি।

খেলার মাঠে আক্রমণাত্মক আচরণ রোধে খেলোয়াড়দের বিভিন্ন ধরনের চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার কৌশল-প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। এছাড়া অপ্রত্যাশিত, অযাচিত, অতিরিক্ত চাপ (যা বেশিরভাগ সময়ই আজকাল মিডিয়ার কল্যাণে প্রাপ্ত) প্রশমনের জন্য চেষ্টা করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, খেলা আসলে খেলাই এবং খেলার মাঠ যুদ্ধক্ষেত্র নয়। খেলার মূল উদ্দেশ্য মানুষে মানুষে সম্প্রীতির সেতু বন্ধন নির্মাণ, জাতিতে জাতিতে পরিচিতি ও সম্পর্ক স্থাপন করা, ঘৃণার প্রচার নয়।

খেলার উদ্দেশ্য দেহ গঠন, নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন, নিয়মানুবর্তিতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা স্থাপন। সর্বোপরি শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থে বলীয়ান হয়ে জাতি গঠন ও উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা।

 

ডা. নাসির উদ্দিন আহমেদ

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, ঢাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here