পারিবারিক সহিংসতায় বাড়ে মানসিক রোগের ঝুঁকি

0
21

ডা. মাহাবুবা রহমান
রেসিডেন্ট চিকিৎসক, চাইল্ড এন্ড এডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি, বিএসএমএমইউ।

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স তথা স্বামী/স্ত্রী কর্তৃক শারীরিক নির্যাতন বিশ্বব্যাপী অতি পরিচিত একটি চিত্র। যদিও হালের কয়েকজন তারকা দম্পতির কারণে বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে তবে এর উৎপত্তি কিন্তু শত বছরের পুরোনো। খ্রিস্টপূর্ব ১৭৯২ থেকে ১৭৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ব্যাবিলনের রাজা হাম্মুরাবি কর্তৃক প্রণীত আইনে নারী ও শিশুদেরকে পুরুষের সম্পত্তি বলে বিবেচনা করা হতো। এই আইনানুসারে কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীকে উপযুক্ত কারণ দর্শানো ব্যতীত ছেড়ে যেতে যায়, তবে স্বামীর অনুমতি ছিল সেই স্ত্রীর হাত পা বেঁধে তাকে পানিতে ডুবিয়ে মারার। পরবর্তিতে এই আইনের ধারাবাহিকতা দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব রোমান সাম্রাজ্যেও। তৎকালীন আইনানুসারে রোমান পুরুষদের অনুমতি ছিল তাদের স্ত্রীদেরকে দাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয়ার, নির্যাতন করার এমনকি মেরে ফেলার। অর্থাৎ রাজা হাম্মুরাবি কিংবা রোমান সাম্রাজ্যের এই আইন ছিল তৎকালীন সমাজে নারী ও শিশুদের ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ডমেস্টিক ভায়োলেন্সকে স্বীকৃতি দেয়ার একটি বৈধ উপায়। এমনকি আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের সমাজের কিছু মানুষ নারীর প্রতি সহিংসতাকে মৌখিক বৈধতা দিয়ে থাকেন ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের মাধ্যমে। তবে কি ডমেস্টিক ভায়োলেন্স মানে শুধুই পুরুষ কর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতন? একথা সত্যি যে অনেকসময় পুরুষরাও ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হন তবে নারীদের তুলনায় সেই সংখ্যা খুবই কম। গবেষণায় উঠে এসেছে প্রতি তিনজন মহিলার একজন তার স্বামী কর্তৃক ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হন যার মধ্যে সেই নির্যাতনের কারণে মৃত্যুহার ৩৯% (যেটা কিনা পুরুষের ক্ষেত্রে ৬%) এবং এই হার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সর্বাধিক। পুরুষদের ক্ষেত্রে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের হার কম হওয়ার একটি কারণ হতে পারে বিশ্বব্যাপী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব এবং অন্যদিকে সমাজ কর্তৃক উপহাসের ভয়ে নির্যাতনের কথা সবার সামনে না আনা। আবার কিছু বিশেষজ্ঞ ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের অর্থ কেবলমাত্র ‘শারীরিক নির্যাতন’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে অনিচ্ছুক। তাদের মতে পার্টনার কর্তৃক শারীরিক, মানসিক, আর্থিক এবং যৌন নির্যাতনের যেকোনোটাই হতে পারে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স।

এই ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের পেছনে কারণ কী কিংবা অন্যভাবে ভাবলে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি জরিপে দেখা গেছে অল্প বয়স, পঙ্গুত্ব, দারিদ্র্যের শিকার নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হন। সেই সাথে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ছোটোবেলায় যারা প্রতিনিয়ত ডমেস্টিক ভায়োলেন্স দেখে বড়ো হয়েছেন কিংবা নিজেরাও কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারাও পরবর্তিতে তাদের নিজেদের সংসারে স্বামী কর্তৃক নির্যাতিত হন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে এধরনের নারীরা ছোটোবেলা থেকে নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হতে তাদের ব্যক্তিত্ব হয় অত্যন্ত দুর্বল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পরনির্ভরশীল হয়ে থাকেন এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন। এছাড়া সামাজিক কিছু বিষয় যেমন যেই সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য অনেক বেশি, শিক্ষার হার কম, দুর্বল অর্থনীতি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব থাকে, সেই সমাজে নারীরা তার পার্টনার দ্বারা বেশি নির্যাতিত হন।

অন্যদিকে নির্যাতনকারী পুরুষদের মধ্যে একটা বড়ো অংশই হয় মাদকাসক্ত। আবার আরেক দল আছেন যারা ভীষণভাবে পরনির্ভরশীল এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে। ফলে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থতার শিকার হন এবং পরবর্তিতে তারা তাদের ব্যক্তিগত হতাশা, ক্ষোভ থেকে আগ্রাসী হন স্ত্রীর প্রতি। অন্যদিকে, নির্যাতিতা নারীদের মতো নির্যাতনকারী পুরুষদের মধ্যেও একটা বড়ো অংশ আছে যারা ছোটোবেলায় নিজের পরিবারে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স দেখে বড়ো হয়েছেন অথবা নিজেরাও কোনো না কোনো ভায়োলেন্সের শিকার।

এবারে আসা যাক ডমেস্টিক ভায়োলেন্স থেকে মানসিক রোগের উৎপত্তি প্রসঙ্গে। ডমেস্টিক ভায়োলেন্স, সেটা হোক শারীরিক বা মানসিক, এর একটা বড়ো প্রভাব পড়ে নির্যাতিতার মানসিক স্বাস্থ্যে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার নারীদের মাঝে Post Traumatic Stress Disorder(PTSD) হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সাত গুণ, যেখানে বিষণ্ণতার সম্ভাবনা থাকে তিন গুণ এবং অ্যাংজাইটি বা মানসিক উদ্বেগ তৈরির সম্ভাবনা থাকে চার গুণ। এছাড়া অন্যান্য গুরুতর মানসিক রোগ যেমন সাইকোসিস, মাদকাসক্তি এবং ইটিং ডিজঅর্ডারের মতো অসুখ এমনকি তীব্র বিষণ্ণতা ও হতাশা থেকে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যেতে পারে।

শুধু নির্যাতিতা নারীই নয়, পরিবারের শিশুদের মনেও ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যায়। প্রথমদিককার ভয়, আতঙ্ক থেকে পরবর্তিতে PTSD, অ্যাংক্সাইটি বা মানসিক উদ্বেগ, ফোবিয়া, বিষণ্ণতার মতো গুরুতর রোগ দেখা যেতে পারে এবং সময়ের সাথে সাথে পারিবারিক অশান্তি ও হতাশাজনিত কারণে কিশোর বয়সে এসে এদের মাঝে মাদকাসক্তি, আত্মত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, এন্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার ইত্যাদি নানাবিধ মানসিক রোগ তৈরি হতে পারে এমনকি বিভিন্ন ছোটো বড়ো কিশোর অপরাধের সাথেও এরা জড়িয়ে পড়তে পারে। এবং এই শিশুরাই পরবর্তিতে পরিণত বয়সে নিজেরাই হয় ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের নির্যাতনকারী কিংবা নির্যাতনের শিকার। অনেকেই ভাবেন যেসব পুরুষ তার স্ত্রীকে নির্যাতন করেন, তারাও বোধহয় কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বেশিরভাগক্ষেত্রেই নির্যাতনকারীদের মাঝে মাদকাসক্তি ব্যতীত অন্য কোনো মানসিক রোগ পাওয়া যায়নি এমনকি জীবদ্দশায় তাদের তেমন কোনো অপরাধের রেকর্ডও নেই বাংলাদেশে ২০১০ সালে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স প্রতিরোধ এবং প্রতিরক্ষামূলক আইন প্রণীত হয় এবং ২০১২ সাল থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। তারপরও ২০১৫ সালের একটা জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার এবং ২০২০ সালের একটি জরিপ অনুসারে সেই বছরের প্রথম নয়মাসে ২৩৫ জন নারী ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। অর্থাৎ আইন থাকার পরও আমরা হয়ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে পারছি না। এর কারণ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মাঝে সমন্বয়ের অভাব। ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া কারো একার কাজ নয়। ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষ-চিকিৎসক, আইনজীবী, মিডিয়াকর্মী সবাইকে একজোট হয়ে এগিয়ে আসতে হবে তবেই আমরা আমাদের বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মকে একটি সুস্থ, সুন্দর মানসিক স্বাস্থ্য উপহার দিতে পারব।

Previous articleডিলুশনাল ডিজঅর্ডার কি স্বাভাবিক জীবনযাপনের অন্তরায়?
Next articleপ্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষা : প্রয়োজনীয়তা ও স্তর কাঠামো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here