শিশুদের ওয়েলবিয়িং বা সুস্বাস্থ্য হলো তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও কগনিটিভি স্বাস্থ্যের সমন্বয়। এই স্বাস্থ্যগত উপাদানগুলো একটি আরেকটির পরিপূরক এবং পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে শিশুর সামাজিক সুস্থতায় অবদান রাখে। আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শিশুর শারীরিক সুস্থতায় মনোযোগ দেই। বাকি উপাদানগুলোকে অবহেলা করি। কিন্তু একটি শিশুর বিকাশে জন্য সবগুলো উপাদানে প্রাধান্য দেয়া অপরিহার্য।
আরও দেখুন…
শারীরিক সুস্থতা
শারীরিক সুস্থতার মধ্যে সুস্বাস্থ্য, পুষ্টির চাহিদা পূরণ, পারিবারিকভাবে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত থাকা অন্তর্ভুক্ত। শিশুর শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে-
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম
- সুষম খাদ্য গ্রহণ
- নিয়মিত ব্যায়াম, খেলাধুলা
- বিভিন্ন আউটডোর প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে

মানসিক সুস্বাস্থ্য
শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাও শিশুর সঠিক বিকাশের জন্য জরুরি। এক্ষেত্রে যা যা করা যেতে পারে তা নিম্নে বর্ণিত হলো-
১. শিশুর সাথে গুণগত সময় কাটানো: শিশুর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য শিশুর সাথে কাটানো গুণগত সময় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এক্ষেত্রে শিশুর সাথে তার প্রিয় কোনো কাজ করা যেতে পারে। যেমন, ছবি আঁকা, নাটক/সিনেমা বা টেলিভিশনে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখা, ইনডোর-আউটডোর খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করা, ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ শিশু যে কাজটা পছন্দ করবে সেটায় গুরুত্ব দেয়া।
২. শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা: আমরা অনেক সময় শিশুদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি না। এটা ঠিক নয়। শিশু কী বলতে চায় সেটা শুনতে হবে। এমনকি সিরিয়াস কোনো সময়েও যদি শিশু কিছু বলতে চায় সেটা শুনতে হবে যদিও তার কথা গুরুত্বপূর্ণ নাও হয়। তাকে বুঝতে দিতে হবে যে, আপনি তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। এছাড়া তার পছন্দ-অপছন্দের কথা জিজ্ঞেস করে আলাপ করা যেতে পারে। স্কুল থেকে ফেরার পর মজার ঘটনা, বন্ধুদের সাথে কাটানো সময় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। এতে শিশু বুঝবে যে, তাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে তার মানসিক সুস্থতায় নিয়ামক প্রভাব পড়বে।
৩. শিশুর প্রশংসা করা: শিশু কোনো ভালো কাজ করলে উপযুক্ত প্রশংসা করবেন। এতে শিশু ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত হবে। কখনো কোনো কাজে ব্যর্থতার জন্য বকা দিবেন না বরং উৎসাহ দিবেন । এবার যতটুকু ভালো হয়েছে সামনে তারচেয়ে বেশি ভালো হবে।
৪. শিশুকে কারো সঙ্গে তুলনা না করা: প্রতিবেশী অন্য কোনো শিশু বা বন্ধুদের সাথে তুলনা করা যাবে না। ‘ও পেরেছে তুমি কেন পারোনি? তোমাকে দিয়ে হবে না, তুমি এই জীবনে ওর মতো এটা করতে পারবে না’ এরকম কথা কখনোই বলা যাবে না। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
৫. বাস্তবসম্মত আশা করা: শিশুর দুর্বলতার দিকে মনোযোগ না দিয়ে বাস্তবতায় নজর দিতে হবে। আপনার শিশুর যেখানে যতটুকু সক্ষমতা আছে ঠিক ততটুকুই তার থেকে আশা করতে হবে। এর বেশি আশা করে তাকে বিব্রত বা অবহেলা করা যাবে না। এক্ষেত্রে তার সক্ষমতা, পছন্দ, শখ জানার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া তাদের নিজেদের পছন্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
সামাজিক সুস্থতা
অন্যের সাথে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার সামর্থ সামাজিক ওয়েলবিয়িং এর অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে নিম্নের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হবে-
১. শিশুর নিজের কাজ নিজেকে করার সুযোগ দেওয়া। এবং সেটা করার পর প্রশংসা করা।
২. নিজের সাথে সাথে পরিবারের কিছু দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে বা বড়োদের সাথে যেকোনো কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি শিশুকেও বড়োদের পক্ষ থেকে তার কাজে বা খেলনা, কাপড়, বইপত্র গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করা।
৩. শিশুকে পারিবারিক এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।
৪. শিশুকে বন্ধুত্ব গড়ায় উৎসাহিত করা। স্কুলে নিয়মিত যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসব, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে উৎসাহ দেয়া এবং বন্ধুদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া।
৫. বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজকর্মে শিশুকে অনুপ্রাণিত করা।
৬. বিভিন্ন স্পোর্টস ক্লাব বা তার আগ্রহের ভিত্তিতে অন্যান্য সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
কগনিটিভ ওয়েলবিয়িং
কগনিটিভ ওয়েলবিয়িং বলতে বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্তভাবে শেখার, যুক্তি দেয়ার, মান রক্ষার সক্ষমতাকে বোঝায়।
শেখানো: শিশুকে শেখাতে হবে কীভাবে অনেকগুলো কাজের ভিতরে গুরুত্বপূর্ণ কাজকে আলাদা প্রাধান্য দিতে হয়। কাজের মাঝে বিরতি নিতে বলা।
আলোচনা: বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিভিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করানো, পারিবারিক নানা সমস্যা ও কাজের ঘরোয়া আলোচনায় উপযুক্ত সময় সাপেক্ষে শিশুর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
ভাবনা শেয়ার: শিশুর ভাবনা শেয়ার করা সুযোগ দেওয়া। তার মতামতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা এবং উৎসাহ দেওয়া।
- ডা. রুবাইয়া খান
- সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ।


