বয়ঃসন্ধি এমন একটা শব্দ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লজ্জা, কৌতূহল, ভয়, উত্তেজনা আর অনেক প্রশ্ন। আমাদের সমাজে বয়ঃসন্ধি নিয়ে কথা বলতে গেলেই যেন গলা নামিয়ে আনতে হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, এই সময়টাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ বয়ঃসন্ধি মানে শুধু শরীরের পরিবর্তন নয়; এটা নিজের ভেতরের মানুষটাকে প্রথমবার ঠিক করে চিনে নেওয়ার শুরু।
হঠাৎ বদলে যেতে থাকা শরীর:
শিশু থেকে কিশোর বা কিশোরী হয়ে ওঠার পথে শরীর যে বদলাতে শুরু করে, সেটা কারও অজানা নয়। ছেলেদের কণ্ঠস্বর ভারী হয়, দাড়ি-গোঁফ গজায়, পেশি শক্ত হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব শুরু হয়, স্তনের বিকাশ ঘটে, শরীরের গঠন বদলাতে থাকে। এই পরিবর্তনগুলো খুব স্বাভাবিক, হরমোনের প্রভাবে ঘটে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকে না। অনেকেই ভয় পায়-“আমার সঙ্গে এমন হচ্ছে কেন?”, “আমি কি অসুস্থ?” কেউ আবার লজ্জায় কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না। অথচ যদি শুরু থেকেই বলা হয়, এগুলো স্বাভাবিক, তাহলে এই ভয় বা অস্বস্তির বড়ো অংশটাই আর থাকত না। শরীরের পরিবর্তনের চেয়েও বেশি হয় মনের পরিবর্তন। আবেগ হঠাৎ খুব তীব্র হয়ে ওঠে। অল্প কথায় রাগ, আবার সামান্য ঘটনায় চোখে জল। কখনও খুব আত্মবিশ্বাসী লাগছে, আবার কখনও মনে হচ্ছে-“আমি কিছুই পারি না”।
এই সময়েই নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন শুরু হয়। আমি কে? আমি কেমন মানুষ? আমাকে মানুষ কীভাবে দেখছে? এগুলো খুব গভীর প্রশ্ন। আর বয়ঃসন্ধিই প্রথম সময়, যখন মানুষ নিজের সম্পর্কে সচেতনভাবে ভাবতে শেখে। তাই এই সময়ে বিভ্রান্তি হওয়া, নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো-সবই স্বাভাবিক।
বয়ঃসন্ধিতে বন্ধুত্বের ধরন বদলে যায়। ছোটোবেলার খেলাধুলাভিত্তিক সম্পর্কের জায়গায় আসে আবেগভিত্তিক সম্পর্ক। কারও সঙ্গে কথা না হলে মন খারাপ লাগে, আবার কারও উপস্থিতিতেই অকারণে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। এটাই প্রথমবার বিপরীত বা একই লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করার সময়। এই অনুভূতিগুলো অনেকের কাছে ভয়ংকর মনে হয়, কারণ কেউ এগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলে না। অথচ আকর্ষণ অনুভব করা, ভালো লাগা, কৌতূহল-সবই মানুষের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের অংশ। সমস্যা তখনই হয়, যখন এসব অনুভূতিকে “ভয়” বা “লজ্জার” বলে চাপা দেওয়া হয়। এতে কিশোর-কিশোরীরা নিজের আবেগকে বোঝার বদলে নিজেকেই দোষ দিতে শেখে।
পরিবার ও সমাজের সঙ্গে দূরত্ব:
বয়ঃসন্ধির আরেকটা চেনা চিত্র হলো, হঠাৎ বাবা-মাকে “বুঝতে না পারা” মানুষ মনে হওয়া। আগে যাদের সঙ্গে সব কথা বলা যেত, এখন তাদের কাছেই কথা বলতে ইচ্ছে করে না। নিজের একটা আলাদা জগৎ তৈরি হয়, নিজের ঘর, নিজের ডায়েরি, নিজের গান, নিজের ভাবনা। এটা অবাধ্যতা নয়। এটা স্বাধীন পরিচয় গড়ে তোলার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক সময় এটাকে “খারাপ হয়ে যাওয়া” বা “লাইনচ্যুত হওয়া” হিসেবে দেখা হয়। ফলাফল-বকুনি, শাসন, তুলনা। এতে কিশোর-কিশোরীরা আরও গুটিয়ে যায়।
নিজেকে চিনে নেওয়ার শুরুটা এখানেই:
বয়ঃসন্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই সময়েই মানুষ প্রথম বুঝতে শেখে, সে শুধু কারও সন্তান বা শিক্ষার্থী নয়, সে নিজেও একজন আলাদা মানুষ। এই সময়েই কেউ বুঝতে পারে, সে কীসে আগ্রহী। কেউ গান ভালোবাসে, কেউ বইয়ে ডুবে থাকে, কেউ খেলাধুলায়, কেউ আবার নিঃশব্দে ভাবতে ভালোবাসে। এই আগ্রহগুলোই ভবিষ্যতের ব্যক্তিত্বের বীজ। কিন্তু যদি এই সময়ে কেবল ফলাফল, নম্বর, তুলনা আর শাসনের চাপে সব চাপা পড়ে যায়, তাহলে নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার সুযোগটাই নষ্ট হয়ে যায়। বয়ঃসন্ধিতে ভুল হবেই। ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল বন্ধু, ভুল আবেগ-সবই শেখার অংশ। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে ভুল করার সুযোগ খুব কম দেওয়া হয়। একবার ভুল মানেই “খারাপ ছেলে” বা “খারাপ মেয়ে” তকমা লেগে যায়। আসলে এই সময়টাই শেখার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সময় হওয়া উচিত। কারণ এখানেই মানুষ বুঝতে শেখে কোনটা তার জন্য ভালো, কোনটা নয়। ভয় দেখিয়ে বা লজ্জা দিয়ে নয়, বরং কথা বলে, বোঝানোর মাধ্যমেই এই শেখাটা সম্ভব।
বড়োদের ভূমিকা:
বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একজন নিরাপদ বড়ো মানুষ। এমন কেউ, যার কাছে প্রশ্ন করা যাবে, ভুল স্বীকার করা যাবে, বিচার হওয়ার ভয় ছাড়া। বাবা-মা, শিক্ষক, অভিভাবকদের যদি একটাই কাজ থাকে, সেটি হলো-শোনা। সব উত্তর জানা জরুরি নয়। সব সমস্যার সমাধান দিতে হবে, এমনও নয়। অনেক সময় শুধু পাশে বসে বলা-“আমি আছি” এইটুকুই যথেষ্ট।
শেষ কথা:
বয়ঃসন্ধি কোনো রোগ নয়, কোনো বিপদও নয়। এটা জীবনের এক স্বাভাবিক, কিন্তু গভীর অধ্যায়। এখানে শরীর বদলায়, মন বদলায়, আর ধীরে ধীরে তৈরি হয় নিজের একটা আলাদা পরিচয়। যদি আমরা বয়ঃসন্ধিকে শুধু “পরিবর্তনের ঝামেলা” হিসেবে দেখি, তাহলে এই সময়টা ভয়ের হয়ে ওঠে। আর যদি এটাকে “নিজেকে চিনে নেওয়ার শুরু” হিসেবে দেখি, তাহলে এই সময়টাই হয়ে ওঠে শক্তির উৎস। কারণ এখানেই প্রথম মানুষ বুঝতে শেখে-সে কে, সে কী হতে চায়, আর সে কীভাবে নিজের মতো করে বাঁচতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা থাকতে পারে। অতিরিক্ত রাগ, জেদ, চঞ্চলতা, অবাধ্যতা, বিষণ্ণতা, অমনোযোগী হওয়া। এগুলো দেখা দিলে অবশ্যই একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
- ডা. ফাতেমা জোহরা
- সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মানসিক রোগ বিভাগ ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।

