শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ কেবল আইন বা নৈতিকতার বিচ্যুতি নয়, এটি মানবমনের অন্ধকারতম স্তরের এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। অপরাধমনস্তত্ত্বের আলোচনায় এই ধরনের অপরাধকে সাধারণ যৌন অপরাধের পর্যায়ে ফেলা হয় না; বরং এটিকে যৌন বিকৃতি, ক্ষমতার বিকার, সহিংস প্রবণতা, স্যাডিজম, সহানুভূতির অনুপস্থিতি এবং বিকৃত ব্যক্তিত্ব কাঠামোর জটিল সমন্বয় হিসেবে দেখা হয়। শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা ও পরবর্তীতে হত্যা প্রায়ই এমন এক মানসিক প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে অপরাধী ভুক্তভোগীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং নিজের বিকৃত আকাঙ্ক্ষা পূরণের “বস্তু” হিসেবে কল্পনা করে।
অনেক যৌন হত্যাকারীর মধ্যে শৈশবকালীন অবহেলা, নির্যাতন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং বিকৃত যৌন কল্পনার দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ দেখা যায়। অপরাধ সংঘটনের আগে তারা ধীরে ধীরে ফ্যান্টাসির জগতে এমন এক মানসিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি যৌন উত্তেজনার অংশ হয়ে ওঠে। এই অপরাধীরা প্রায়ই বাস্তব সম্পর্ক গঠনে ব্যর্থ হয় এবং নিজের হতাশা ও দমনকৃত আগ্রাসন দুর্বল ও প্রতিরোধহীন শিশুর ওপর প্রয়োগ করে। Criminal Psychology-তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিশুধর্ষকদের একটি বড় অংশ “power reassurance” অথবা “anger retaliation” ধরনের মানসিক গঠনের অধিকারী। প্রথম ক্ষেত্রে অপরাধী নিজের ব্যর্থতা ও অযোগ্যতার ক্ষতিপূরণ হিসেবে শিশুর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তার মধ্যে জমে থাকা ঘৃণা, অপমানবোধ ও রাগ যৌন সহিংসতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিছু অপরাধী আবার যৌন বিকৃতি বা পেডোফিলিক প্রবণতার কারণে শিশুদের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যদিও সব শিশুধর্ষক পেডোফাইল নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধী সুযোগসন্ধানী, কিন্তু তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের অসামাজিক ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্য।
মনোবিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই ধরনের অপরাধীর ইগো ও সুপারইগোর বিকাশ দুর্বল থাকে। ফলে নৈতিক নিয়ন্ত্রণ, অপরাধবোধ বা সহানুভূতির অনুভূতি পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠে না। অপরাধ সংঘটনের মুহূর্তে তারা শিশুর ভয়, কান্না বা যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করতে সক্ষম হয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর অসহায়ত্বই তাদের বিকৃত তৃপ্তির উৎস হয়ে ওঠে। এ কারণেই যৌন সহিংসতার পর অনেক অপরাধী শিশুটিকে হত্যা করে, যাতে প্রমাণ মুছে যায় এবং নিজের নিয়ন্ত্রণবোধ সম্পূর্ণ হয়।
আধুনিক অপরাধমনস্তত্ত্বে সাইকোপ্যাথি বা psychopathy একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। সাইকোপ্যাথিক ব্যক্তিদের মধ্যে সহানুভূতির ঘাটতি, মিথ্যাচার, আবেগহীনতা, অনুশোচনার অভাব এবং উত্তেজনাপূর্ণ আচরণের প্রবণতা প্রবল থাকে। যৌন হত্যাকাণ্ড ও স্যাডিস্টিক অপরাধের সঙ্গে সাইকোপ্যাথির শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া যায়। একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে যে যৌন হত্যাকারীদের মধ্যে psychopathy score সাধারণ হত্যাকারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
শিশু যৌন নির্যাতনকারীদের ব্যক্তিত্ব নিয়ে পরিচালিত গবেষণাগুলোতেও গুরুতর ব্যক্তিত্ববিকৃতি, আবেগীয় শূন্যতা এবং antisocial trait-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। BMC Psychology-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, শিশু যৌন অপরাধীদের মধ্যে DSM-5 personality pathology এবং psychopathic traits উল্লেখযোগ্য হারে বিদ্যমান।
আবার অন্য একটি গবেষণায় পেডোফিলিক ও নন-পেডোফিলিক শিশুধর্ষকদের মধ্যে psychopathy-এর মাত্রা তুলনা করে দেখা যায় যে, উচ্চ psychopathy ভবিষ্যৎ পুনরাবৃত্ত অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস।
যেসব ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যা সংঘটিত হয়, সেখানে “sexual sadism” একটি বড় উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। স্যাডিস্টিক অপরাধীরা অন্যের যন্ত্রণা থেকে আনন্দ পায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ, কারণ শিশুর দুর্বলতা ও প্রতিরোধহীনতা অপরাধীর নিয়ন্ত্রণবোধকে বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুকে লক্ষ্য করে যৌন হত্যাকারীরা প্রায়ই পরিকল্পিতভাবে শিকার নির্বাচন করে এবং অপরাধের সময় ক্ষমতা, দখল ও আধিপত্যের মানসিকতা কাজ করে।
শৈশবের ট্রমা ও নির্যাতনের ইতিহাসও অনেক অপরাধীর মধ্যে পাওয়া যায়। যারা নিজেরাই শৈশবে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের একাংশ পরবর্তীতে সহিংস আচরণের দিকে ঝুঁকতে পারে। অবশ্য সব নির্যাতিত শিশু অপরাধী হয়ে ওঠে না; তবে গবেষণা বলছে, childhood abuse এবং violent psychopathy-এর মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফির প্রতি বিকৃত আসক্তি, সহিংস যৌন কল্পনা এবং দুর্বল impulse control এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
অপরাধমনস্তত্ত্ববিদরা মনে করেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকে শুধু “অশ্লীলতা” বা “নৈতিক অধঃপতন” হিসেবে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় না। এটি একাধারে মানসিক বিকৃতি, সামাজিক ব্যর্থতা, শৈশবের ট্রমা, বিকৃত যৌনতা এবং সহিংস ব্যক্তিত্বের সমন্বিত ফল। তাই প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও কেবল শাস্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শৈশব থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ট্রমা শনাক্তকরণ, যৌন বিকৃতি ও personality disorder-এর চিকিৎসা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন।
একই সঙ্গে সমাজে শিশু সুরক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। অধিকাংশ শিশুই পরিচিত মানুষের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। ফলে পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজকে শিশুদের নিরাপত্তা, শরীর সচেতনতা এবং “unsafe touch” সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। অপরাধীর প্রতি ভয় বা সামাজিক লজ্জা যেন অভিযোগকে দমন না করে, সে পরিবেশও তৈরি করা প্রয়োজন।
শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মানবতার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ আঘাত। এই অপরাধের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ আমাদের কেবল অপরাধীকে বোঝার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ শিশুদের রক্ষা করার জন্যেও জরুরি। কারণ অপরাধের শিকড় বুঝতে পারলেই প্রতিরোধের পথ আরও কার্যকরভাবে নির্মাণ করা সম্ভব।
- ডা. দেবদুলাল রায়
- মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

