পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন উদ্দীপকের বিপরীতে মানুষ যে ধরনের প্রতিক্রিয়া বা সাড়া দেয় তাকেই বলে আচরণ। এই আচরণ কখনো নিয়ম মেনে হতে পারে, আবার কখনো নিয়মের বাইরে। নিয়মের বাইরে যে আচরণ সেটাই আবার হয়ে যেতে পারে অপরাধ। যে আচরণ রাষ্ট্র-সমাজ-প্রতিষ্ঠানের নিয়ম বিরোধী, এমনকি পরিবারের নিয়ম বিরোধী সেগুলোই হতে পারে অপরাধ। কিছু অপরাধ লঘু এবং কিছু অপরাধ গুরুতর।
শুরুতেই ধরা যাক, পরিবারের কথা। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও পরিবারে দেখানো অনেক আচরণই হতে পারে অপরাধ। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে মনে হয় যে পরিবার মানেই তো সব কিছু মেনে নেওয়ার জায়গা। যদি কেউ ভুলক্রমে কিছু করে ফেলে তাহলে অন্যজন তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেই। আবার কিছু জায়গায় মনেই করি না যে, এটা কোনো বিবেচনার বিষয়। যেমন-ছেলে মেয়ের মধ্যে ভিন্নতা করা, পরিবারের শারীরিক-মানসিক বা আর্থিকভাবে দুর্বল সদস্যদের একটু হেয় করে দেখা প্রভৃতি। এগুলোকে লঘু অপরাধ হিসেবে ধরা যায়। কিন্তু কিছু আচরণ যে, গুরুতর অপরাধ হতে পারে সেটাও আমরা বুঝি না অনেক সময়। এর মধ্যে একটা হচ্ছে কথা না শোনা বা অন্য কারণে ছোটোদের গায়ে হাত তোলা। এটাকে একধরনের নির্যাতন আর তাই সেটা আমরা অনেক সময় বুঝি না। এমনকি নারী নির্যাতনের বিষয়ে অনেক সচেতনতা আসলেও বউ পেটানোকে এখনো পারিবারিকভাবে একটা সাধারণ বিষয় হিসেবেই দেখা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। অথচ, এগুলোর জন্য হতে পারে শাস্তি।

সমাজেও অনেক সময় এমন কিছু বিষয়কে সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। প্রশ্রয় দেয়া হয় অথবা ভয়ে চুপ থাকা হয়। এভাবে কিছু সামাজিক আচরণ পরিণত হয় অপরাধে। যেমন-কারো মারধরের শিকার হওয়াকে পারিবারিক বিষয় ভেবে উপেক্ষা করা। এতে করে নির্যাতিত আরো একাকি বা অসহায় অনুভব করে,
অন্যদিকে নির্যাতনকারী আরো সাহস পায়। ফলে অপরাধটা বাড়তেই থাকে। বখাটে ছেলে যখন কোনো স্কুলগামী ছাত্রীকে উত্যক্ত করে, তখন বখাটের পিছনে সহায়তাকারী কোনো শক্তির ভয়ে যখন সমাজ এগিয়ে আসে না, তখনই মানসিক এমনকি শারীরিক ক্ষতির শিকার হয় অসংখ্য কিশোরী-নারী। থেমে যায় অনেকের স্বাভাবিক জীবন বা এগিয়ে যাওয়া। হয়ত আত্মহত্যা করে মুক্তি খোঁজে কেউ কেউ, অন্যরা জীবন্মত হয়ে কাটিয়ে দেয় পুরো জীবন। এগুলোও অপরাধ- যার দায় সমাজের অন্যায্য আচরণের। শুধু সমাজকে দোষারোপ করলেও আসলে বিষয়টা শেষ হয় না। এর পিছনে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণও সমানভাবে দায়ী। সবচেয়ে বড়ো প্রতিষ্ঠান কিন্তু রাষ্ট্র। তাই রাষ্ট্রের মধ্যে যদি বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা আচরণ স্থায়ী হয় তখন সমাজ বা পরিবার বা ব্যক্তি সাহস পায় না প্রতিবাদ করার, এগিয়ে আসার। রাষ্ট্র যখন অর্থ-বিত্তকে বা ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেয়, তখন সবার আচরণই হয়ে যায় যেকোনো উপায়ে অর্থবিত্তের মালিক হওয়া, ক্ষমতার দম্ভ দেখানো। এভাবে রাষ্ট্রে বৃদ্ধি পায় অপরাধ প্রবণতা তথা অপরাধ। কমে যায় প্রতিবাদ-প্রতিরোধের জায়গা। আবার, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের নামে সংঘাত বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে এমন আচরণও কিন্তু তখন বৃদ্ধি পায়। মানুষ বিভ্রান্ত হয় কোনটা আসলে প্রতিবাদের ভাষা আর কোনটা আইন হাতে তুলে নেয়া বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।
আর তাই, আমাদের মনে রাখতে হবে অপরাধ মানেই আইনের ধারা নয়। অপরাধ সেটাই যেটা অন্যদের শারীরিক-মানসিক বা অন্য কোনো ধরনের ক্ষতি করে। মানসিক ক্ষতি হওয়াটা এক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অন্য ক্ষতিগুলো হয়ত চোখে পড়ে, আলোচনায় আসে। কিন্তু মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে নীরবে একটা মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যার ফলাফল কিন্তু পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র কারো জন্যই মঙ্গলকর নয়।
- ডা. পঞ্চানন আচার্য্য
- সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ।


