ধৈর্য মানব জীবনের একটি মূল্যবান গুণ, যা জীবনে প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা আনে। ধৈর্য হলো যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি বা সংকটে বিচলিত না হয়ে শান্ত থেকে লক্ষ্য অর্জনের পথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। ধৈর্যশীল মানুষকে মহান সৃষ্টিকর্তাও পছন্দ করেন। বিপদে ধৈর্যধারণের কথা আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থেও অসংখ্যবার উল্লেখ করা হয়েছে। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে ধৈর্য আমাদের মনে শক্তি যোগায়, মনোবল আরও সুসংহত করে এবং আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে সহায়তা করে। সূরা আল বাকারার ১৫৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে “নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” সুতরাং এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, যারা বিপদে ধৈর্যধারণ করে মহান আল্লাহ তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হন এবং তাদের জীবনের বালা-মসিবত দূর করে দেন। বৌদ্ধধর্মে ধৈর্য হলো একটি শক্তিশালী সাধনা যার অর্থ সবকিছু সহ্য করা নয়, বরং এটা নিশ্চিত করা যে, আমরা যেন সক্রিয়ভাবে মনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখি এবং বিরক্তিকর আবেগের শিকার না হই। ধৈর্যের মহত্বের কারণে আমরা অন্যের কাছ থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হলেও হতাশ হই না, রাগও করি না।

ধৈর্যের ইতিবাচক দিক
সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ
যেকোন সমস্যায় তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলে অনেক ক্ষেত্রেই তা ভুল হয়। তাই ধৈর্য কঠিন পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো না করে আমাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঝুঁকি কমায়।
মানসিক চাপ থেকে মুক্তি
বিপদে অস্থিরতা আমাদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। ধৈর্য আমাদের রাগ ও হতাশা নিয়ন্ত্রণ করে মানসিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়নে সহায়তা করে।
পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন
যারা আমাদের সাথে খারাপ বা নেতিবাচক আচরণ করে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, আমরা সাধারণত তাদের প্রতি বিরক্ত হই। ফলে তাদের সাথে আরও সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়। তাই কেউ যদি আমাদের পরামর্শ গ্রহণ না করে অথবা আমাদের সাথে নির্দয় ব্যবহার করে, তাহলে তাদের প্রতি রাগান্বিত না হয়ে ধৈর্যধারণ করা উচিত। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে অন্যের ভুলত্রুটি ক্ষমা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ধৈর্যধারণ অপরিহার্য।
দুঃখ সহ্য করা
কারও কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সমাধানের চেষ্টা না করে বিরক্ত হলে বা রাগান্বিত হলে সমস্যার সমাধান হবে না। ঠান্ডা লাগলে গরম পোশাক পরতে হবে। তা না করে রাগ করলে তো আর উষ্ণতা আসবে না। তেমনি জীবনে দুঃখ আসলে ধৈর্য নিয়ে তার মোকাবিলা করতে হবে। দুঃখ নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা না করে বিষয়টার প্রতি প্রসন্ন হতে পারি যে, এর চেয়ে আরও খারাপ কিছুও তো হতে পারত। অনেক মানুষ আছে তারা শুধু ধৈর্যের কারণে জীবনের সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছেন। আমরা যখন দুঃখ-কষ্ট ভোগ করি, তখন এর মাঝেও কিছু ভালো গুণ থাকে যা আমাদের অনুভব করা উচিত। দুঃখ মানুষের ভিতরের অহংকার অবদমন করে নম্র হতে শেখায়।
লক্ষ্য অর্জন
যেকোনো বড়ো লক্ষ্য অর্জন বা সাফল্যের জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি চেষ্টা ও কর্মে অবিচল থাকার শক্তি। ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আমরা সেই শক্তি পেয়ে থাকি। ধৈর্যহীন মানুষ আশা হারিয়ে ফেলে, ফলে তাদের কর্মস্পৃহা কমে যায় লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়।
সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ
অনেকে বিপদে বা কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য হারিয়ে অপরের সাথে বাকবিতণ্ডা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে তারা মামলা-মকদ্দমাসহ নানা প্রকার সমস্যায় পড়ে যায়। ধর্মের অধ্যয়ন এবং অনুশীলন মানুষকে সংকটে ধৈর্যধারণ ও অবিচল থাকতে শেখায়। ধৈর্যধারণকারী ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অতি পছন্দনীয়। ধৈর্য এমন একটি মানবিক গুণ, যা মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, সহমর্মিতা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, পরিশ্রম করার মনোভাব, খারাপ কর্ম হতে বিরত রাখাসহ অসংখ্য উত্তম গুণাবলির সন্নিবেশ ঘটায়। এসব গুণাবলীর মাধ্যমে মানুষের আত্মা পরিশুদ্ধ হয় ও বিধাতার সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।
আরও পড়ুন…
ধৈর্যের নেতিবাচক দিক
ধৈর্যের অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। যেমন-
অন্যায়ের প্রশ্রয় দেওয়া
সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করলে অনেক সময় তা দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে সব কিছু সহ্য করলে তা আরও বেশি নিজের ক্ষতি ডেকে আনে। এক্ষেত্রে অনেক সময় অন্যায়কারী প্রশ্রয় পেয়ে আরও বেশি ক্ষতি করতে উৎসাহিত হয়।
সুযোগ হাতছাড়া হওয়া
সময়ের কাজ সময়ে না করে অতিরিক্ত ধৈর্যধারণের ফলে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তাই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে যৌক্তিক ধৈর্যধারণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি কাজটি যাতে হাতছাড়া না হয় সেজন্য সঠিক পদক্ষেপ সঠিক সময়েই নিতে হবে।
আত্মতুষ্টিতে ভোগা
খারাপ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ধৈর্য স্থবিরতার লক্ষণ। তাই অতিরিক্ত ধৈর্য থেকে অনেক সময় সমস্যার পরিবর্তন আনার চেষ্টার পরিবর্তে, পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে যা ব্যক্তির জন্য শুভকর হয় না।
অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা
অতিরিক্ত ধৈর্যের ফলে আমরা অনেক সময় জীবনের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ি। সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়, যা পরবর্তিতে আমাদেরকে হতাশায় নিমজ্জিত করতে পারে। অতিরিক্ত অস্থিরতা ও হতাশা আমাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাস না থাকলে কর্মস্পৃহা কমে যায় এবং দিনশেষে আমরা আরও ক্ষতির সম্মুখীন হই।
তাই ধৈর্যধারণ করা অবশ্যই একটি ইতিবাচক গুণ, তবে এটি কখন কোথায় প্রয়োগ করতে হবে তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আমাদের জীবনে সব সময় কিছু না কিছু সমস্যা ও হতাশার মুখোমুখি হব এটাই স্বাভাবিক। সব কিছু সব সময় আমাদের মনের মতো হবে না। কখনও কখনও পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলে বেশি ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাতে কাছের মানুষের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। শান্তিতে বসবাস করতে চাইলে চারপাশের প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক থাকাটা অনেক জরুরি। আমরা বিপদে খেই হারিয়ে ফেলব না বরং ধৈর্য নিয়ে সব কিছুর কাঙ্ক্ষিত সমাধান খোঁজার চেষ্টা করব।
- ডা. মো. আব্দুল মতিন
- সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মানসিক রোগ বিভাগ
- রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।


