তার বিচার করতেই হবে। সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে! একজন মানুষ হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে এবং একজন পিতা হিসেবে আমি এটা চাই। তার আগে একজন মানসিক স্বাস্থ্য কর্মী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি রাষ্ট্রের কাছে আরেকটি বিশেষ আর্জি জানাতে চাই- ‘ধর্ষণ বা অপরাধের পিছনের মানসিক অবস্থা যাচাই বাছাই ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে আনার সুযোগ চাই’। রিমান্ডে নেয়ার মতো করে, সময় নিয়ে তার আচরণ ও চিন্তা ভাবনা পরীক্ষা করার সুযোগ করে দিতে হবে। আমি নিশ্চিত যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে পারলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বের হয়ে আসবে, যা আমাদের সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
কোন মানসিকতায়, কোন চিন্তায় এবং কোন ভাবনা নিয়ে এই অপরাধী মানুষটি বেড়ে উঠেছে, বড় হয়েছে এটি জানা জরুরি। তন্মধ্যে মানুষদের মনোসামাজিক বিশ্লেষণ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামাজিক, পারিবারিক এবং আদর্শগত শিক্ষা কোথায় আছে, কি গলদ রেখে আমরা সামনে এগোচ্ছি, সামনের দিনগুলো কেমন যেতে পারে সেসবের হয়তো কিছুটা আঁচ করা যাবে। একটি ঘটনা দিয়ে হয়তো সমাজের সকল স্তরের, সকল অংশের চিন্তা ভাবনা বা মানসিকতার প্রতিফলন বোঝা যাবে না। কিন্তু অবশ্যই একটি সাধারণ ধারণা তৈরি হবে। তাই আমি চাই এই মানুষগুলোর বিশেষ করে এই মানুষটিকে নিবিড় মানসিক অবস্থা যাচাই বাছাই বা পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হোক। কিছুদিন আগে আমি সিরিয়াল কিলার সম্রাটকে নিয়ে ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, প্রশ্ন করেছিলাম সম্রাট কী খুনি নাকি মানসিক রোগী? সাভারের আলোচিত সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান খান সম্রাট, যিনি ৭টি হত্যা মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলার আসামি ছিলেন। আইনের চোখে উনি অবশ্যই একজন গুরুতর অপরাধী! সে দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলো। প্রধানত খুনের দায়ে অপরাধী।
আমার আগ্রহ ছিলো, ঠান্ডা মাথায় একটা একটা খুন করে লাশ গুম করা, পুড়ে ফেলা – একজন মানুষের দ্বারা কীভাবে সম্ভব! আপনি, বা কেউ কি ভাবতে পারেন?
ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক যে কারণেই হোক, একজন মানুষ একটার পর একটা খুন করে যাবে, এটা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, কোনো মানব সমাজের জন্য কল্পনারও অতীত। শুধু নাটক সিনেমাতেই সেটা সম্ভব হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য, তথা অপরাধীর মানসিকতা নিয়ে চিন্তা করলে, কয়েকটি বিষয় সামনে আসতে পারে। যেমন; ব্যক্তিত্ত্বের সমস্যা- এন্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, ডিলুশনাল ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া (ডিলুশন বা হ্যালুসিনেশন), মাদকাসক্তি, ব্রেইনের কিছু অংশের সমস্যা এমন কিছু সমস্যার কারণে হতে পারে। অন্যথায়, স্রেফ পরিকল্পনা করে একটার পর একটা খুন, অসম্ভব! পেশাগত খুনিরাও একটা অন্তর্নিহিত কারণে অপরাধ করে। কিন্তু মটিভ ছাড়া খুন, অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষাতে বর্ণনা করা যাবে কিনা জানিনা!
এবার আসি রামিসার কাহিনীতে! এটিতো আরও ভয়াবহ, আরও কঠিন, আরও বীভৎস, আরও জটিল! কেনো জটিল বলছি! একজন মানুষ যার ঘরে স্ত্রী আছে, অর্থাৎ যৌন ইচ্ছা পূরণের সুস্থ ও গ্রহনযোগ্য ব্যবস্থা আছে। শুনতে কিছুটা খারাপ লাগলেও যুক্তির দিক থেকে এটাতো সত্যি! তারপর যে বিষয়গুলো থাকে, যেমন; কারও যদি কোনো মেয়ের উপর রাগ থাকে, কেউ যদি অবৈধ একটা সম্পর্ক গড়ে তোলার পর হজম করা বা ম্যানেজ করা নিয়ে সমস্যায় পড়ে, দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকে, যদিও এসব কোনোটাই স্বভাবিক যুক্তি হতে পারে না, তারপরও অপরাধ ব্যাখ্যা করতে এমন ভাবে হয়তো যুক্তি খোঁজা যায়। কিন্তু একটা শিশু মেয়ের সাথে এমন করা সাধারণ কোনো যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা যায় কি? আর হঠাৎ করে মেয়েটাকে দেখামাত্র এমন ইচ্ছা জেগে উঠেছে, সেটাও কিন্তু সত্যি নয়। তাহলে কি কারণ হতে পারে? জানা প্রয়োজন নয় কী?
খেয়াল করবেন, শিশুদের যৌন-নির্যাতন বা ধর্ষণের বেশিরভাগই পরিচিতদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। যার অর্থ দাঁড়ায় একটা পরিকল্পনা তার পিছনে কাজ করে। শিশুদের যৌন নির্যাতনের পরিকল্পনা! ভাবা যায়? তারপর আবার হত্যা করা, এবং কখনো কখনো শরীর টুকরো করে ফেলা! অপরাধ বিজ্ঞানের বিশ্লেষণে অবশ্যই অপরাধী, কিন্তু মানসিকতার সাধারণ ব্যাখ্যায় কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? যে কারো জন্যই, এই উত্তর সাজানো কঠিন।
প্রশ্ন আসে, এমন অপরাধ যারা করে তাদেরকে কি মানসিক স্বাস্থ্য, তথা মানসিক দিক থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা, বা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক যথাযথ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা উচিত কি-না? অবশ্যই আনা উচিত।
কেনো, মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা দরকার?
উত্তর হলো, কেনো এমন আজব এবং অগ্রহণযোগ্য কাজ করছে এটার কারণ বের করা।
কারণ জেনে লাভ কী?
আমাদের চলমান সমাজে যেন প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরি করতে পারা যায়, সেটা নিশ্চিত করা। দ্রুততম সময়ের ভিতর এমন মানুষজনকে আলাদা করে, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া। কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। এমন মানুষজন যেন কখনোই এমন বিকৃত এবং জঘন্যতম অপরাধ ঘটাতে না পারে সেটি নিশ্চিত করা। তাতে, নিরীহ ও নিরাপরাধ মানুষ বেঁচে যাবে। কোনো বাবা- মা’ই তার সন্তানের এমন অবস্থা হোক সেটা মেনে নিতে পারেনা। আবার কোনো পিতামাতাই তাদের সন্তান এমন জঘন্য অপরাধী হোক সেটাও কল্পনা করতে পারে না।
আর যা করা যেতে পারে?
এসব বিষয়ে সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কারও আচরণ বা চিন্তায়, এমন কিছু দেখলে, সাথে সাথে দেরি না করে, যাতে- পুলিশ প্রশাসন বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায় তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রয়োজনে পুলিশ হাসপাতালে, সকল সাপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় লোকবল সহ একটি ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। অথবা, বিদ্যমান ফেসিলিটি যেসব জায়গায় আছে তাদের সাহায্য নিয়ে, কাজটি করা দরকার। এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, রামিসার ঘটনার মতো বিষয়ে, এমন কারও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে যথেষ্ট সময় নিয়ে কাজটি করতে হবে। একবার দুবার আউটডোরে দেখে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হবে। তাই ভর্তি রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং যথেষ্ট সময় দিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমাদের মনে রাখা দরকার, কোনো মানুষ পৃথিবীতে অপরাধী হয়ে জন্মায় না। কারণ বুঝতে পারলে, প্রতিকারের দিকে সামান্য হলেও এগিয়ে থাকা যায়।
সবার জন্য শুভকামনা – সুস্থ থাকুন মনে-প্রাণে।
অপরাধী শাস্তি নিশ্চিত হোক, আমরাও চাই।
- অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব
- মনোরোগ, যৌন সমস্যা ও মাদকাসক্তি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
- চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,
- বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

