মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home সংবাদ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও বাজেট বৃদ্ধির তাগিদ দিলেন বিশেষজ্ঞরা

মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও বাজেট বৃদ্ধির তাগিদ দিলেন বিশেষজ্ঞরা

আসন্ন জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবায়ও বাজেট বৃদ্ধির ওপর তাগিদ দিয়েছেন দেশের মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞরা। তাদের তাগিদের সঙ্গে একাত্ন হয়ে এক্ষেত্রে নিজের সাধ্যমতো ভূমিকা রাখার আশ্বাস দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি।
গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠ  ও ওরিয়ন গ্রুপের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এভাবেই উপস্থিত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা  সবাই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ভিত্তি আরও মজবুত ও দেশব্যাপি আরও সম্প্রসারণের কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি  হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক, বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন জকরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব।
‘মানসিক স্বাস্থ্য ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় দক্ষজনবল তৈরি, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, চিকিৎসা শিক্ষার পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্যের আরও বেশি সংযোজন ও সমৃদ্ধকরণ, নিয়োগ ও পদায়নে প্রশিক্ষিতদের বিবেচনায় নেওয়া, বাজেটের বাস্তবভিত্তিক ব্যবহার, বিনামূল্যে আরও বেশি ওষুধ বিতরণের সুযোগ তৈরিসহ জাতীয় নীতিনির্ধারনী ক্ষেত্রে অধিকতরও গুরুত্ব দেওয়ার ওপরে আলোচকরা বেশি জোর দেন।
প্রধান অতিথি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট সত্যিই অপ্রতুল। মোট বাজেটের মাত্র চার শতাংশের কিছু বেশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পেয়ে থাকে মানসিক রোগের জন্য বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। এই বাজেট বাড়াতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য দশজন চিকিৎসক থাকা উচিত। কিন্তু আছে মাত্র তিনজন। চিকিৎসকের সংখ্যাও বাড়াতে হবে।’
মন্ত্রী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের বিষয়টি অনেকদিন ধরে অবহেলিত ছিল। ইদানীং নজরদারি বেড়েছে। আবার এ সেক্টরে প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন সুদক্ষ নির্দেশনার মাধ্যমে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছেন। কেননা মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ছাড়া দেশের উন্নয়নও সম্ভব নয়। আবার এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রেও এ সমস্যা নিরসন করা অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শারীরিক – মানসিক – এই দুইয়ের সমন্বয়ই সুস্থতা। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় মানসিক স্বাস্থ্যে বিষয়টি উপেক্ষিত ছিলো। এর অন্যতম বড় কারণ হলো শারীরিক রোগের আধিক্য। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। দেশের অধিকাংশ জেনারেল হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নেই। তবে এখন মানসিক স্বাস্থ্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
মুল প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। মোট জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই ভুগছেন মানসিক ব্যধিতে। এছাড়া ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত এবং ৭৫ শতাংশ শিশু চিকিত্সা সেবার বাইরে থাকে। এছাড়া দেশে মানসিক স্বাস্থ্যে মাথাপিছু ব্যয় ২.৪ টাকা। আর স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বাজেট মাত্র ০.৫ শতাংশ। দেশে আত্মহত্যার হার প্রতিলাখে ৫.৯ শতাংশ। এদিকে মোট জনসংখ্যার বিপরীতে মাত্র ২৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ৬০ জন ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী রয়েছেন। এছাড়া শিশু মনোবিজ্ঞানী একেবারে নেই বললেই চলে। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষিত চিকিত্সক রয়েছেন ১০ হাজার জন এবং নার্স ১২ হাজার জন। এমন চিকিত্সা-সক্ষমতা দিয়েই এ বিরাট সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
নিউরো-ডেভলাপমেন্টাল ডিজেবিলিটি প্রটেকশন ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘মানসিক রোগের চিকিত্সকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। কিনাউ মানসিক স্বাস্থ্যের পেশাজীবী হওয়া কতটা জরুরী ও সম্মানের তা প্রচার করতে হবে। আর এই সচেতনতা বৃদ্ধির কাজটি গণমাধ্যম করতে পারে।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য আইন পাশ হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে রোগির মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ কর্মী তৈরি না হলে সুফল আসবেনা।’
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আমরা কিছু প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি, সেখানে আমরা হুজুরদেরকেও প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। এখানে আমরা খুব ভালো ফলাফল পেয়েছি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিদ অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম বলেন, ‘একটি সন্তান নেশায় আশক্ত হওয়ার পরে কিন্তু শুধু একটি সন্তানই অসুস্থ হচ্ছে না, গোটা পরিবার ও সমাজ অসুস্থ হচ্ছে। কাজেই আমাদের গোড়ায় হাত দিতে হবে। যেখানে আসলে প্যারেন্টিং কেমন হচ্ছে এবং এর জন্য কোনো কর্মসূচি আছে কি-না তা দেখতে হবে। বাবা-মা হওয়া ও সন্তানের জন্ম দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে।’
মনই যাবতীয় শক্তির উৎস উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন,  ‘দেহের চেয়ে মনের শক্তি অধিকতর দরকার। শারিরিকভাবে পঙ্গু হয়েও মানসিক শক্তির কারণে বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার নজির অহরহ রয়েছে। সংবাদপত্রে কাজ করার সুবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া নানা অনাচারের খবর আসে আমাদের কাছে। এসব অনাচারের অন্যতম কারণ মানসিক বিকৃতি।’
স্বাগত বক্তব্যে কালের কণ্ঠ নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বেকারত্ব ও হতাশাসহ নানা কারণে মানসিক সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। মানসিকভাবে শক্তি যোগানোর চেয়ে আমাদের সন্তানদের উপর চাপই বেশি প্রয়োগ করি আমরা। মানবিক গুণ সম্পন্ন মানুষ হওয়ার পরামর্শ দেই না আমরা।’
আরেক স্বাগত বক্তা ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘ব্যক্তি এবং সমাজের মানসিক উন্নয়নের জন্য শরিক হতে পারায় অমি কৃতজ্ঞ। আপনাদের মূল্যবান তথ্য, উপাত্ত বিশ্লেষণ ও গুরুত্বপূর্ণ অভিমত সামনের দিনগুলোতে এই বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করবে।’
বলেন, ‘প্রাইভেট সেক্টরে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরামর্শ নেই, প্রতিদিন আমরা যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়ে থাকি সেগুলোকে প্রতিদিন নিখুঁতভাবে সমাধান করতে হয়। যারা এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের মানসিক উত্কর্ষতা অনেক প্রয়োজন।’
এ গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক আলম, বিএসএমএমইউ’র মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাহিদ মেহজাবিন মোরশেদ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার, অ্যাপোলো হাসপাতালের সিনিয়র কনসাল্ট্যান্ট ডা. নিগার সুলতানা, সিটি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. আসাদুজ্জামান, ইনসেপটা ফার্মার বিপণন বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মিজানুর রহমান,  প্রমুখ।
সূত্র: কালের কন্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

ধর্ষণ নিয়ে মনের টিভি’তে বিশেষ আয়োজন

ধর্ষণ সহ নারী নির্যাতনের ঘটনা যেন প্রতিনিয়ন বেড়েই চলেছে আমাদের দেশে। কোনোভাবেই যেন তা রোধ করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি জন দাবীর মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ...

যুক্তরাজ্যে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন ৮৬ ভাগ নারী

যুক্তরাজ্য ৪ দিন ব্যাপী নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর একটি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের তুলনায় শতকরা ৪৯ ভাগ নারীদের...

সন্তানের আচার আচরণ কি আপনাকে চিন্তায় ফেলছে?

অনেক সময়ই অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানের জন্য সময় বের করে তাদের দুর্ব্যবহারের জন্য তাদেরকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেন – তারা রাগ দেখাতে শুরু করে, কখনও...

আচরণগত আসক্তি ও এর চিকিৎসা

ফেসবুক, সেলফি, ইন্টারনেট, শপিং, খেলায় বাজি ধরা আমাদের সামাজিক জীবনে আজ খুবই পরিচিত অনুষঙ্গ। কিছু মানুষ ব্যস্ত মোবাইলে, কেউ বা কেনাকাটায় আবার কেউ বা...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন