শিশুর বিষণ্ণতা: নির্যাতন আর অবহেলার বড় কারণ

0
132
শিশুর বিষণ্ণতা : নির্যাতন আর অবহেলার বড় কারণ

রবীন্দন্রাথ ঠাকুরের গল্পের ফটিককে আবাল্য পরিচিত পরিবেশ আর মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল কলকাতা শহরে। ‘ভদ্রলোক’র শিক্ষার জন্য। সে সেখানে মানিয়ে নিতে পারেনি। কারো সঙ্গে বলতে পারেনি তার ভালো না লাগার কথা। শহরের স্কুল কিংবা মামার বাসা কোনোটিতেই তার মনে বসেনি। অবশেষে সে জ্বরে ভুগে মৃত্যুর কোলে আশয়্র নিয়েছে। কিন্তু ‘মৃত্যুর পূর্বে তার সে কষ্ট আর অমনোযোগিতা অথবা মনমরা ভাব সেকালে বিষণ্ণতা হিসেবে নির্ণয় হয়নি নিশ্চিত। একালেও যে খুব হয় এমনটা বলা যায় না। বাচ্চাদের আবার মন খারাপ হয় নাকি?-একটি বহুল পচ্রলিত ভুল ধারণা। হ্যাঁ, শিশুরাও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারে।

শিশুদের বিষণ্ণতা কেমন? বড়দের মতো না আলাদা কিছু?
এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে ১০ বছর বয়সে প্রায় ১০ শতাংশ এবং ১৪ বছর বয়সে ৪০ শতাংশ শিশুর মধ্যে দুঃখীভাব (miserable) দেখা যায়। তবে এ লক্ষণ অন্যান্য আবেগ ও আচরণজনিত রোগেও দেখা যায়। আর মন খারাপ লাগলেই বিষণ্ণতায় ভুগছে এমন ভাবার কারণ নেই। কারণ শুধু এক বা একাধিক লক্ষণ আর রোগ হওয়া একটু ভিন্ন বিষয়। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের তাদের মা বা দেখভালের লোক থেকে আলাদা করলে তাদের মধ্যে কিছু মন খারাপের লক্ষণ দেখা যায়, তবে তা বিষণ্ণতা রোগ কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিমত আছে। আট বছর বয়স থেকে বাচ্চাদের মধ্যে বিষণ্ণতা রোগের গতানুগতিক প্রকাশ পেতে পারে।
শিশুদের বিষণ্ণতার প্রকাশে ভিন্নতা থাকতে পারে। যেমন :

  • শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুম এবং খাবারের সমস্যা হতে পারে তবে বড়দের তুলনায় কম হয়
  • স্কুলে যেতে না চাওয়া বা অনাগ্রহ দেখানো, খিটখিটে মেজাজ, ঘ্যানঘ্যান করা, পরিবারের সদস্য ও সমবয়সীদের সাথে অতিরিক্ত তর্ক করা, মারামারি করা
  • নানা প্রকার শারীরিক সমস্যা যেমন মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা ও দুবর্ল লাগা ইত্যাদি
  • ব্যতিক্রম হলেও বিছানায় প্রস্রাব করা এবং অন্যান্য অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যেতে পারে
  • এছাড়াও পড়া বুঝতে না পারা, ক্লাশে মন না বসা। পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করা। স্কুলের পাঠ্যসূচির বাইরে অন্য কাজে বিরক্তি প্রকাশ করা অথবা অনীহা দেখানো
  •  বিষণ্ণতায় আক্রান্ত শিশুরা অন্য শিশুদের চেয়ে বেশি অত্যাচারিত হয়।
  • একা থাকার প্রবণতা, গোসল করতে না চাওয়া, খেলতে না যাওয়া
  • কখনো কখনো টিভির প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করতে পারে
  • আত্মবিশ্বাসের অভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকে
  • সে সরাসরি মন খারাপ বা বিষণ্ণতার বিষয়টি বুঝে উঠতে পারে না
  • নিজের জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে বেশি বলা ও একঘেয়ে লাগা
  • প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর বয়সের তুলনায় শিশুদের মধ্যে হতাশা এবং অপরাধবোধ কম দেখা যায়
  • শিশুদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার পরিকল্পনা প্রাপ্ত বয়স্ক এবং কিশোরদের তুলনায় কম। সাধারণত ১২ বছরের নিচে আত্মহত্যার ঝুকি তুলনামূলকভাবে কম
  • শারীরিক সমস্যার কথা বললে ভালোভাবে ইতিহাস নিয়ে ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন

এটি কি ব্যাপক হারে হয়?
ব্রিটিশ ন্যাশনাল সার্ভেতে দেখা গিয়েছে ৫-১০ বছরের মধ্যে ০.২% এবং ১১-১৫ বছর বয়সে ২% শিশু বিষণ্ণতায় ভোগে। বয়ঃসন্ধির পূর্বের ছেলে-মেয়ের অনুপাত সমান থাকলেও বয়ঃসন্ধি ও তারপর মেয়েদের মাঝে বিষণ্ণতার হার বেশি থাকে। শিশুদের বিষণ্ণতার কারণ ও ধরণ সব বিষণ্ণতাই তীব্র রূপে আসবে তা নয়। অল্প, মাঝারি আবার কারো কারো তীব্র মাত্রায় হতে পারে। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত শিশুদের ৫০ শতাংশই অন্যান্য মানসিক সমস্যায় ভুগছে। যেমন :

  • উদ্বেগজনিত রোগ অথবা ডিবিডি ((Disruptive Behavioural Disorder-আচরণজনিত সমস্যা)
  • অন্য আবেগজনিত রোগের সঙ্গে/অংশ হিসেবেও বিষণ্ণতা(Bipolar Mood disporder-depreesive episode) হতে পারে। আবার কারো কারো বারবার হওয়া (Recurrent Major Depressive Disorder)
  • কিছু শিশু ডিসথাইমিক ডিজঅর্ডারে (Dysthymic Disorder) ভোগে আবার অন্যরা খাপ খাইয়ে নেয়া অথবা মানিয়ে নিতে না পারার (Adjustment Disorde) সমস্যায় আক্রান্ত হয়।
  • বন্ধুত্ব তৈরিতে সমস্যা এবং বন্ধুর অভাব অনেক সময় রোগের তীবত্রা বাড়িয়ে দেয়।
  • অনেকের রক্তের মধ্যে কটির্সলের পরিমাণ বেড়ে যায় (প্রাপ্তবয়স্কদের বৃদ্ধি পায় না)।
  • আবার সাধারণ কোনো দুঃখ অথবা নিকটজন হারানোর বেদনায়ও বিষণ্ণতা রোগের মতো লক্ষণ দেখা যায়।

কেন হয়?
আর দশটা মানসিক রোগের মতোই এটি একক কোনো কারণে হয় না। পরিবারে এ ধরনের মানসিক রোগের ইতিহাস থাকলে, বিরূপ পরিবেশে বড় হওয়া, স্কুলে মানিয়ে নিতে না পারা ইত্যাদি কারণে এটা হতে পারে। দীর্ঘদিনের কোনো শারীরিক রোগও এর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসা
চিকিৎসা শুরুর আগে অবশ্যই কিছু বিষয়ে জানা প্রয়োজন-নেতিবাচক কোনো ঘটনা যেমন : কারো দ্বারা কোনো তির্যক মন্তব্য (Bully victim), শারীরিক অথবা যৌন নিগ্র্রহ, পারিবারিক নির্যাতন কিংবা মা-বাবার মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস আছে কিনা। সাধারণত নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো শিশুদের বিষণ্ণতার চিকিৎসায় বিবেচনা করা হয়-

ফ্যমিলি থেরাপি : প্রয়োজনে স্কুলের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান করা (Liaison with school)।

স্বল্পমাত্রার বিষণ্ণতা: মানসিক চাপের কারণ থাকলে তা খুঁজে বের করে সমাধান করা অথবা কমানোর চেষ্টা।

মাঝারি মাত্রার বিষণ্ণতা : মানসিক চাপের কারণ থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করা অথবা কমানোর চেষ্টা।
কোগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি কিংবা ইন্টার পারসোনাল থেরাপি যদি উপরোক্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় তবে ফ্লুক্সেটিন ঔষধ পরিমাণমতো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দেয়া যেতে পারে। তবে শিশুদের তীব্র বিষণ্ণতায় কোগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি কিম্বা ইন্টার পারসোনাল থেরাপি ও ফ্লুক্সেটিন ঔষধ উভয়টিই শুরু করতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা থাকলে, পানীয় ও খাবার খেতে না চাইলে, গুরুতর মানসিক রোগের লক্ষণ (সাইকোটিক) থাকলে হাসপাতালে ভর্তি করানো জরুরি। লক্ষণ চলে যাওয়ার পরও কমপক্ষে ৬ মাস চিকিৎসা চালালে পরবর্তীতে আবার হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

একেবারে কি ভালো হয়ে যায়?
সবার ক্ষেত্র একরকম ঘটে না। কারো সারাজীবনে একবারই হয়। কিন্তু যারা ঝুঁকিপূর্ণ শিশু তাদের বারবার হতে পারে। তীব্র বিষণ্ণতায় ভোগা শিশুদের ২০-৪০% পরবর্তী জীবনে বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিশোর বয়সে বিষণ্ণতায় ভুগলে বয়সকালে আবার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ছয়গুণ বেড়ে যায়। যারা ডিসথাইমিয়ায় আক্রান্ত তারা বেশ কয়েক বছর ভুগতে পারে। এ ধরনের শিশু-কিশোররা যদি সাথে আচরণজনিত সমস্যায় ভোগে তবে তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়। তাই আসুন আমরা শিশুদের জন্য যতটা সম্ভব আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর রাখি। তাদের আচরণের পরিবর্তনগুলোকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করি।

সূত্র: লেখাটি মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।

মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন ক্রয়ের বিশেষ অফার

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here