শিশুর বিকাশে ঘুম স্বাস্থ্যবিধি

0
1043
শিশুর বিকাশে ঘুম স্বাস্থ্যবিধি
“ঘুমপাড়ানী মাসি পিসি, মোদের বাড়ি এসো।
খাট নাই পালং নাই, চোখ পেতে বোসো।
বাটা ভরা পান দেব, গাল ভরে খেও।
খোকার চোখে ঘুম নাই, ঘুম দিয়ে যেও।”

আমাদের শৈশবের ঘুমের সময় এই ছড়া শোনা হয়নি এমন মানুষ কমই আছি। অতিরিক্ত ঘুমের জন্য কতই না বকুনি শুনেছি। কিন্তু এখন শিশুদের ঘুম নিয়ে বাবা-মায়েরা কম-বেশি বিভিন্ন সমস্যায় ভুগে থাকেন। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের বাবা-মায়েরা অভিযোগ করেন যে শিশুরা রাতে দেরিতে ঘুমায় আর দিনে পড়তে বসলে এমনকি স্কুলে গিয়েও ঘুমিয়ে পরে। দিনের বেলা ন্যাপ নেয়ার বদলে ট্যাব বা মোবাইলে ব্যস্ত সময় কাটায়। এখানে জেনে রাখি এই সমস্যাটা আমাদের একার নয়। আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (AAP)-এর মতে ঘুমের সমস্যাগুলো ২৫% থেকে ৫০% শিশু এবং ৪০% কিশোর-কিশোরীদের প্রভাবিত করে।
শিশুর ঘুম স্বাস্থ্যবিধি হল একটি রুটিন যা ঘুমানোর ৩০ মিনিট থেকে দুই ঘন্টা আগে শুরু হতে পারে। প্রতি রাতে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা এবং শিশুকে ঘুমানোর আগে শান্ত হওয়ার জন্য সময় দেয়া।

শিশুদের জন্য ঘুম কেন গুরুত্বপূর্ণ
শিশুদের জীবনে খাবার, পানীয় বা নিরাপত্তার চেয়ে ঘুম কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঘুম হল এমন শক্তির উৎস যা মনকে সতেজ এবং শান্ত রাখে। প্রতি রাতে এবং প্রতিটি ন্যাপে ঘুম মস্তিষ্কের ব্যাটারি পুনরায় চার্জ করে শারীরিক এবং মানসিক প্রশান্তি তৈরি করে। ঘুম শিশুর মনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আনন্দে থাকার পাশাপাশি, গবেষণা দেখায় যে ঘুমের প্রভাবে মনোযোগ, জ্ঞানীয় বিকাশ, মেজাজ, সহনশীলতা, শব্দভান্ডার বৃদ্ধি, শেখা এবং স্মৃতি একীকরণ, পেশীর দক্ষতা ইত্যাদিকে প্রভাবিত করে। শিশুর বুদ্ধি এবং মস্তিষ্ক বৃদ্ধির উপরও বিশেষ প্রভাব ফেলে বিশেষত শৈশবকালে।

শিশুদের কতটুকু ঘুম দরকার
নবজাতকরা বেশিরভাগ সময় ঘুমায় এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৩ ঘন্টা একটানা ঘুমাতে পারে। এই ব্যাপ্তিকালগুলো হল ২৪ঘন্টায় রাত-দিন মিলিয়ে মোট ঘুমের সময় যা বয়সের উপর নির্ভরশীল।
১। নবজাতক (০-৩ মাস)- ১৪-১৭ ঘন্টা
২। শিশু (৪-১০ মাস)- ১২-১৫ ঘন্টা
৩। টডলার (১-২ বছর)- ১১-১৪ ঘন্টা
৪। প্রিস্কুল (৩-৫ বছর)- ১০-১৩ ঘন্টা
৫। স্কুল-বয়স (৬-১৩ বছর)- ৯-১১ ঘন্টা
৬। বয়ঃসন্ধিকাল (১৪-১৭বছর)- ৮-১০ ঘন্টা

ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন অফ আমেরিকা (NSF)-র বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে কিছু শিশুদের জন্য এই সময়কাল এক ঘন্টার কম বেশি হতে পারে।

শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কী ঘটে
পিতামাতা জানেন যে,স্বল্প ঘুমের জন্য শিশু খিটখিটে, বদমেজাজি, ক্ষুধা মন্দা, খেলায় অনীহা, কান্নাকাটি ও অতি-চঞ্চল হতে পারে। অনেক সময় তা ADHD-ও মনে হতে পারে।

শৈশবকালে নিদ্রাহীনতা স্কুল পারফরম্যান্স সহ মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাকেও হ্রাস করতে পারে। আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (AAP) অনুসারে, পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৫% শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। অল্প ঘুমের কারণে সর্দি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ জালাপোড়া ইত্যাদি হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি উদ্বেগ এবং হতাশা তৈরি হয়। দেখা গেছে যে শৈশবকালে দুর্বল ঘুম স্থূলত্ব,ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ আকারে ভবিষ্যতের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি বহন করতে পারে।

কৈশোরে, অপর্যাপ্ত ঘুম একাডেমিক পারফরম্যান্স এবং মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানব পরিষেবা বিভাগ এবং আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকস (AAP) বয়ঃসন্ধিকালে ঘুমের দীর্ঘস্থায়ী হ্রাসকে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করে। এটি ড্রাগ, এলকোহল এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর পাশাপাশি গাড়ি ক্র্যাশ এবং স্পোর্টস-ইনজুরির মতো আরও তাত্ক্ষণিক সমস্যার জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

শিশুদের ঘুমের সমস্যা
আমাদের কাছে যে বিষয়গুলো অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হতে পারে সেগুলো প্রায়শই শিশুদের জন্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন ভাইবোন, দাঁত ব্যথা, কান ব্যথা, পরিবেশ বা বিছানা পরিবর্তন, নতুন পরিচর্যাকারি, সময়সূচী পরিবর্তন, কোনও অসুস্থতা, অ্যালার্জি, হজমে সমস্যা, সর্দি-কাশির মতো ছোটখাট অভিযোগের মতো ঘটনা সমস্তই শিশুদের ঘুমের ক্ষতি করতে পারে।

১। রাত আতঙ্ক এবং দুঃস্বপ্ন
দুঃস্বপ্নগুলো শিশুদের জন্য ভীতিজনক হতে পারে। শিশুরা বাস্তব আর স্বপ্ন আলাদা করে বুঝতে পারেনা। তারা প্রায়শই দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠে, যা সাধারণত র্যা পিড আই মুভমেন্ট (REM) ঘুমের সময় ঘটে। ছায়া দেখা, ফিসফিস করে কথা শুনতে পাওয়া, খাটের নিচে বা ফ্যানের পাখায় কেউ বসে আছে ভাবা এমনকি রাতে টয়লেট যেতে ভয় ইত্যাদি রাতের আতঙ্ক থেকে ঘুমের আতঙ্কে পরিনত হতে পারে। কোনও রাতে স্বপ্ন দেখে চিৎকার করে কিম্বা কান্না করে উঠতে পারে তবে তারা সাধারণত ঘুম থেকে জেগে ওঠে না এবং সকালে ঘটনাটি মনে রাখতে পারেনা। এমন সময় তাদের না জাগিয়ে আলতো স্পর্শ করুন এবং আবার ঘুমিয়ে পরতে সাহায্য করুন। তবে যদি শিশু মাঝে মাঝেই রাতে এমন অনুভব করে তবে কুসংস্কারাচ্ছন্ন না হয়ে দ্রুত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

২। স্লিপ টকিং এবং স্লিপওয়াকিং
ঘুমে হাঁটা, হালকা ঘুমের ঘোরে ভারি কণ্ঠস্বরে কথা বলা ঘুমের অসুস্থতার সাথে সংযুক্ত। ঘুমের মধ্যে শিশুরা চারপাশ সম্পর্কে অসচেতন থাকে এবং পরে সাধারণত তাদের এ সম্পর্কে কোনও কিছু মনে থাকেনা। গবেষণা থেকে জানা যায় যে ১৩ বছর বয়সের আগে প্রতি তিনটি শিশুর ১ জন এই সমস্যায় ভুগে। বেশিরভাগ এপিসোড প্রাক-কিশোর (০-৫বঃ) বছরগুলোতে ঘটে। এটি দিনের বেলা ঘুমের পাশাপাশি শিশুর কাজের উপর নির্ভর করে। শিশু যদি স্লিপ ওয়াক করে তবে তাদের শোবার ঘরের সুরক্ষা অ্যালার্ম ইনস্টল করা ভাল। কাউকে নিয়মিত স্লিপ ওয়াক চলার সময় হওয়ার প্রায় আধা ঘন্টা আগে জাগানো কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রয়োজনে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

৩। স্নোরিং এবং স্লিপ অ্যাপনিয়া
বড়দের মতোই শিশুদের মাঝে মাঝে মাঝে স্নোরিং বা নাক ডাকা স্বাভাবিক। শিশুদের মধ্যে ফোলা টনসিল, অ্যালার্জি, স্থূলত্ব, সেকেন্ডহ্যান্ড ধোঁয়া বা অন্যান্য কারণে এটি হতে পারে। তবে, যদি অত্যধিক শব্দ করে, বা শ্বাস-প্রশ্বাসে একটু বেশি বিরতি নিয়ে থাকে তবে তাদের ঘুমে সমস্যা রয়েছে। স্লিপ অ্যাপনিয়াযুক্ত শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয় যা তাদের রাতে প্রায়শই একাধিকবার জাগ্রত করতে পারে। কিন্তু তারা এ ব্যাপারটি নিজেরা উপলব্ধি করতে পারেনা। ঘন ঘন স্নোরিং এবং স্লিপ অ্যাপনিয়া উভয়ই শিশুদের স্বাস্থ্যের উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রয়োজনে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

৪। লেগস সিনড্রোম
শিশুদের মধ্যে অস্থির পায়ে সিন্ড্রোম বুঝতে পারা কঠিন। ঘুমের মধ্যে পা সরানোর এক অদম্য, অস্থির তাগিদ তৈরি হয়। মনে হতে পারে যে শিশুটি কেবল ক্রমবর্ধমান ব্যথায় ভুগছে। এমনকি দেখা যায় সকালে শিশু নিজেকে বিছানার পুরো উল্টো দিকে আবিষ্কার করে অর্থাৎ পায়ের দিকে তার মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছে। এর জন্য ঘুমের সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মানা জরুরী। তবে বিছানা প্রসারিত করা কিম্বা মেঝেতে ম্যাট্রেস/তোশক দিয়ে আরামদায়ক বিছানা করে দিলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। শিশু কোন অস্বস্তিকর সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে কিনা তা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

শিশুদের জন্য ঘুমের স্বাস্থ্যকর পরামর্শ
দিনে কিংবা রাতে ঘুম স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে শিশুদের বিশ্রামের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারেঃ

১। নবজাতক শিশু নিজে নিজে না ঘুমালে তাদের স্পর্শ করে পিঠে হালকা চাপর দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে হবে। যদি তারা কাঁদতে থাকে তবে তারা ক্ষুধার্ত হতে পারে। ডায়াপার, কাথা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে কেবল অল্প আলো/ডিম লাইট ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে এবং নিঃশব্দে করতে হবে।

২। নতুন মায়েরা ঝামেলা কমানোর জন্য অনেক সময় ঘুমের শিশুকে শুইয়ে ফিডার খাওয়ান। এতে তরল খাবার শিশুর শ্বাসনালীতে আটকে বিপদ হতে পারে। নতুন মায়েদের নিজেদেরও সঠিক ঘুম প্রয়োজন তাই শিশু ঘুমিয়ে গেলে আলাদা কটে রাখাই ভাল নতুবা পাশ ফিরতে গিয়ে দুর্ঘটনা র্ঘটনা হতে পারে।

৩। শোবার ঘরটি শান্ত রাখা বা বাইরের শব্দ যেনো কম আসে খেয়াল রাখতে হবে। প্রিয় গান, ছড়া শুনতে শুনতে ঘুমাবে এমন অভ্যাস না করানোই ভাল। আপনি নিজে মৃদু স্বরে আবৃতি (ছড়া, গান, দোয়া) শোনাতে পারেন এতে আপনার সাথে শিশুর মানসিক যোগাযোগ বাড়বে। তবে রিলাক্সেশন মিউজিক মৃদু ভলিউমে ছেড়ে ঘুমাতে পারেন।

৪। টডলারদের ঘুম ও বিশ্রামের নির্দিষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ সময়সীমা ব্যবস্থা করা যেতে পারে যেমন, রাতের ঘুম ছাড়াও দিনে দুটি ন্যাপ। শারীরিক ক্রিরা-কলাপ, খেলাধুলা, ব্যায়াম এমনকি ঘরের কাজে জড়িত রাখা যাতে পেশী সঞ্চালন হয়। এতে ভাল ঘুম হয়।

৫। ঘুমানোর কিছু প্রস্তুতি থাকতে পারে যেমন, রাতে ঘুমের আগে দাঁত ব্রাশ করা, টয়লেট করা, শরীর ধুয়ে,মুছে দেয়া, সম্ভব হলে ঘুমের জন্য আলাদা আরামদায়ক পোশাক রাখা।

৬। টিভি, ল্যপ্টপ বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর মতো ব্যাঘাতগুলো শোবার ঘরে না থাকাই ভাল।

৭। একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েট পরিকল্পনা যেমন শোবার আগে ক্যাফিন,ভারী খাবার এবং চিনিযুক্ত খাবারগুলো এমনকি অতিরিক্ত পানি পান এড়ানো।

৮। শোবার ঘরে কিছুটা শীতল এবং আরামদায়ক তাপমাত্রা রাখা, ঘরে তুলনামূলক কম আসবাবপত্র রাখা, দেয়ালে হালকা রঙ ব্যবহার করা ভাল। ঘর অন্ধকার করতে পর্দা ব্যবহার করা, কিন্তু যদি শিশু অন্ধকারে ভীত হয় তবে একটি ডিম লাইট ব্যবহার করা যায়।

৯। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ঘুমের আগে প্রার্থনা করা এতে যেসব শিশু রাতে ভয় পায় তাদের মধ্যে মানসিক শক্তি বাড়ে।

১০। বয়ঃসন্ধিকালে আলাদা ঘর দেয়া হলে তাদের একা ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে সেক্ষেত্রে আমাদের শোবার ঘরের ঠিক পাশেই তার ঘর দেয়া যায়। এবং রুটিন করে সপ্তাহে দুই/একদিন শিশুর সাথে ঘুমানো যায়। আবার এ সময় নিজের আলাদা ঘর, বিছানা না পেলেও ঘুমের সমস্যা হতে পারে। মনে রাখবেন এ সময় তারা প্রাইভেসি নিয়ে খুব সচেতন থাকে।

অনিদ্রা সমস্যার লক্ষণ দেখা দেয়ার আগেই পিতামাতার উচিৎ নিজের এবং শিশুর সঠিক ঘুম স্বাস্থ্য অভ্যাস স্থাপন করা এবং সঠিক ঘুমের অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা যেমন, শিশুদের সাথে ঘুম সম্পর্কে কথা বলা, ঘুমের ডায়রিতে সমস্যাবলী লিখে রেখে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here