মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home মানসিক স্বাস্থ্য শিশু কিশোর কৈশোরে নতুনের আনাগোনা

কৈশোরে নতুনের আনাগোনা

বয়স যখন ১১-১৪
আমি তখন উগ্র।

এই কথাটির অর্থ বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। আমি এই বয়সে কেমন ছিলাম? আমার আচরণ কেমন ছিল? আমি কি সব কিছু মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম? অনেক অনেক প্রশ্ন জাগবে মনে। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর আপনি কতটা স্বাভাবিকভাবে দিতে পারবেন? আমরা এ ব্যাপারে জানার আগে আগে একটু জেনে নেই কৈশোর কী?

কৈশোর একটি সময় বা বয়স যে সময়ে শারীরিক এবং মানসিক বেশকিছু পরিবর্তন দেখা যায় (ছেলে-মেয়ে) উভয়ের ক্ষেত্রে। এই সমইয়কে আবার বয়ঃসন্ধিকাল বলা হয়। সহজ করে বললে, দুটি বয়সের মিলনই বয়ঃসন্ধি। এই বয়সটি মুলত ছেলেদের ক্ষেত্রে ১২ থেকে শুরু হয়ে ১৫ বা ১৬ তে শেষ হয় আর মেয়েদের ক্ষেত্রে ১১ থেকে শুরু হয়ে ১৪ বা ১৫ তে শেষ হয়।

বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে–মেয়ে উভয়ের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়। আর এতো তাড়াতাড়ি তাদের শারীরিক পরিবর্তন হয় যার জন্য তারা মানসিকভাবে অপ্রস্তুত থাকে। নতুন একটি শরীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন, নতুন শরীর বলতে আরেকটি শরীর নয় তার নিজের শরীরই তার কাছেই অপরিচিত। তার নিজের সাথে পরিচিত হতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। আর হঠাৎ কোন নতুন পরিবেশে সে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। যার জন্য সে একা থাকতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে আবার অনেক সময় দেখা যায় তার সমবয়সী বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে।

জন্মের পর থেকে সে নিজেকে যেভাবে দেখছে এই সময় ঠিক তার বিপরীতভাবে দেখছে। আর নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করে ফলে অন্যদের সাথে তার দূরত্ব অনেক বেশি হয়ে পড়ে। তার আচরণ সম্পর্কে অচেতন থাকে। এই সময়ে তার কোন ধরনের আচরণ করা উচিৎ, বড়দের মতো করবে নাকি ছোটোদের মতো করবে বুঝতে পারেনা। আমরাই অনেক সময় সন্তানকে বলি তুমি এখন বড় হয়েছে ছোটোদের মতো আচরণ কেন করছ, আবার অনেক ক্ষেত্রে বলি তুমি এখন অনেক ছোটো। যার জন্য তার মধ্যে দ্বিধার সৃষ্টি হয় সে কখন কোন আচরণ করলে ঠিক হবে তা বুঝতে পারেনা।

এই সময়ে সে বাবা-মায়ের কথা ও বন্ধুদের কথা উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করতে পারে না। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, বন্ধুদের সাথে তার মানসিকতার মিল খুঁজে পায় তাই তার মধ্যে বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশী দেখা যায়। বাবা-মা অনেক সময় তাদেরকে ভুল বুঝে বসেন যার জন্য সন্তান ও বাবা-মায়ের মধ্যে তৈরি হয় বেশ দূরত্ব। আর বাবা মায়ের সাথে এই দূরত্ব হওয়ার কারণেই দেখা যায়, সন্তান বন্ধুদের উপর অনেক বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা সব সময় ভালোর দিকে যায় না আবার যে সব সময়ই মন্দ হয় তাও কিন্তু নয়।
এই সময়ে তার মধ্যে নিজেকে নিয়ে বা পরিবার নিয়ে কিছু ভুল ধারণা দেখা যায়, কিছুটা ভয়, কিছুটা হীনমন্যতা দেখা যায়। সে এর মূল কারণ কি তা সম্পর্কে পুরোই অচেতন থাকে। পরিবার থেকে সে যেটুকু সহযোগিতা আশা করে তা অনেক ক্ষেত্রেই অপূর্ণ থেকে যায়। এছাড়া তাদের মধ্যে ভয় অনেক বেশী কাজ করে, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস অনেকাংশে কমে যায় যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।

আমদের ঘরে যদি এই বয়সের কোনো সন্তান থাকে তাহলে তার সাথে আমাদের করণীয় আচরনগুলো একটু জানার চেষ্টা করি।

• সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করা: সন্তানের কাছে পিতা-মাতার চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টির পাশাপাশি সন্তানদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। তাদেরকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তবে এর অর্থ এ নয় যে, যা চাইছে তাই তাকে দিয়ে পরিপূর্ণ রাখা। এর অর্থ হচ্ছে সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সেতু বন্ধনটি অটুট রাখা। এতে সে নিজেই অনুভব করবে, ‘আমি আমার বাবা মাকে পেয়ে অনেক সুখী’।
• পরিমিত স্নেহ-শাস্তি: সন্তানকে শাসন করতে গিয়ে এমন কিছু না করা যেন সন্তান তা নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। কেননা, এই বয়সের ছেলেমেয়েরা নিজেদেরকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে তার অন্যের কোন কথা বুঝার জন্য যথেষ্ট সময় নেই। এই সময় এমনিতেই তারা যে কোন তুচ্ছ ঘটনার জন্যও নিজেকে দায়ী করে থাকে। সেখানে যদি নেতিবাচক এমন কোনো আচরণ পায় যা তার জন্য সহজভাবে গ্রহণ করা খুব কঠিন। আবার তার প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে শাস্তি ও দিতে পারেন কিন্তু তা হবে পরিমিত। ছোটো একটি ভুলের জন্য তাকে যেমন অতিরিক্ত শাসন করা যাবে না ঠিক তেমনি তাকে তাকে বাড়াবাড়ি রকমের আদর ও করা যাবে না।

• পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার মানসিকতা তৈরি করা: সময়ের সাথে সাথে আপনার সন্তানকে তার বয়স অনুযায়ী কী কী পরিবর্তন হতে পারে তা সম্পর্কে তাকে সচেতন করুন, যেন নিজেকে খুব সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। তাকে যেন খুব বিড়ম্বনায় পরতে না হয় সেদিকে লক্ষ দিতে হবে।

পিতা-মাতা সচেতন হলে সন্তানদের নিয়ে বড় সমস্যাগুলো খুব সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন তাকে বুঝার চেষ্টা করুন, এক সময় সে নিজে থেকেই আপনার সাথে সব কিছু আলচনা করবে যা আপনি তার কাছ থেকে চান।
খাদিজা শুভ
সাইকোলজিস্ট, ট্রেনিং ইন সাইকোথেরাপি
মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

দ্বন্দ্বপূর্ণ আচরণ এবং আমাদের চিন্তার জগত

“বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকুরীতে ঢোকার পরপরই সিমির (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়ে যায়। ২বছরের একটি সন্তান আছে তাঁর। অন্তঃস্বত্বা হবার পরই চাকুরীটা ছেড়ে দেয়। ইদানিং সে...

মহামারীতে সম্পর্কে টানাপড়েন এড়াতে করণীয়

কোভিড-১৯এর এই দুঃসময়ে গুলোকে বেশ জটিল মনে হতে পারে। তবে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে পারলে মনের অমিল এবং সম্পর্কের এই জটিলতা গুলোকে বেশ সহজে...

সেক্সুয়াল মিথ ও যৌন স্বাস্থ্য: ২য় পর্ব

পর্নোগ্রাফীতে যে সহজতা থাকে, যে উত্তেজনার মাত্রা থাকে বাস্তব জীবনে তা থাকে না। কারণ অভিনয়ে বাড়াবাড়ি রকমের কিছু না থাকলে মানুষের মনে তা ধরে...

মহামারী কালে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে পারিবারিক বন্ধনের ভূমিকা

আমাদের কাছের মানুষ গুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক যত গভীর, বিপদ মোকাবেলায় আমাদের মানসিক শক্তি থাকবে ততোটাই বেশী। যে কোন বিপদ মোকাবেলায় পরিবার ও কাছের মানুষদের...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন