করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক সুরক্ষা

0
113
করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক সুরক্ষা

যে সময়টাতে লিখছি লেখাটা তখন বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টিকারী এই ভাইরাসের আক্রমণের সাথে লড়তে ‘সম্মুখ যোদ্ধা’ বলা হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে আসলে এই যুদ্ধটা কী রকম এবং তাদের মানসিক অবস্থায় কী প্রভাব পড়ে?

২০০৩ সালে সার্স সংক্রমণের সময়ে সিঙ্গাপুর, তাইওয়ানের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ১১-১৮% স্বাস্থ্যকর্মী বিভিন্নরকম চাপজনিত লক্ষণের শিকার হন বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, অনিদ্রা, মানসিক কারণে শারীরিক লক্ষণ এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের।

২০২০ এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে চীনের উহানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ৩৪টি ‘ফিভার ক্লিনিক’ থাকা হাসপাতালের ১২৫৭ জন স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, অনিদ্রা এবং মর্মপীড়ায় ভুগছেন। বিশেষ করে নারী স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স, যারা সরাসরি কোভিড-১৯ নির্ণয় এবং চিকিৎসার সঙ্গে  ‍যুক্ত, উহানে কর্মরত এবং যারা প্রথম সারির চিকিৎসা এবং সেবাদানকারী তাদের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।

সার্সের এবং বর্তমান মহামারিকালীন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এমনকি স্বেচ্ছায় এবং দায়িত্ববোধ থেকে যারা মহামারির সময় কাজ করছেন তারাও এরকম লক্ষণের শিকার হচ্ছেন। এই লক্ষণগুলোর উপস্থিতির কারণগুলো ‍খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গিয়েছে-

  • নিজের, সহকর্মীদের, পরিবারের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার ভয়
  • অতিরিক্ত কাজের চাপ
  • বিশেষ সুরক্ষা পোশাক এবং নিয়মকানুনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকা
  •  রোগীর অবস্থা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা
  • রোগীদের মৃত্যু, অঙ্গ বৈকল্যের অভিজ্ঞতা প্রতিনিয়ত দেখা
  • অপরিকল্পিত কাজের ধারা
  • কর্তৃপক্ষ থেকে পরিকল্পনা-কার্যাদেশ গোছানোভাবে না আসা
  •  ঘন ঘন কর্মপরিকল্পনার পরিবর্তন
  • নিজের অসবিধার কথা নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে খুলে বলতে না পারা
  •  তত্ত্বাবধায়কের সহমর্মী আচরণ এবং দায়িত্বশীলতা না থাকা
  • দলের মধ্যবর্তী সদস্য থাকা
  • সংক্রমণ প্রতিরোধে আলাদা থাকার সময় একাকিত্বের ভয়

যাদের একজন রোগীকে যত্ন করতে হয়েছে তাদের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়ার হার বেশি ছিল। আরো দেখা গিয়েছে, কিছু বিষয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক অবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। যেমন:

  • যথাযথ কর্মপরিকল্পনা
  • কর্তৃপক্ষ থেকে স্পষ্ট এবং গোছানোভাবে কাজের আদেশ, প্রতিরোধের ব্যবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা
  • ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলো খুলে বলতে পারা এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ব্যবস্থা থাকা
  •  তত্ত্বাবধায়ক, সহকর্মীদের এবং পরিবারের সহায়তা থাকা
  • নির্ভরযোগ্য কারো সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকা
  • ধর্মীয় বিশ্বাস।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের পূর্বের মানসিক অবস্থা। যদি আগে থেকে কোনো মানসিক সমস্যা থেকে থাকে এবং সেটার চিকিৎসা বা সমাধান না হয়ে তাহলে এরকম পরিস্থিতিতে তার অবস্থা আরো গুরুতর হয়ে দাড়ায়। আর্থসামাজিক বাস্তবতার কিছু চিত্রও এই কয়দিনে আমাদের সামনে উঠে এসেছে। আমাদের দেশের মতো স্বল্পোন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আগেই অনেকগুলো অসুবিধা, অব্যবস্থাপনার মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ করতে হতো। বর্তমান মহামারিতে সেই অব্যবস্থাপনা আরো প্রকট হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা শুধু যে শারীরিকভাবে সার্স কোভিড ২ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন তা নয়, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ছেন। পরিবারবিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন অনেকে, চাকরি নিয়ে সংকট,  ‍সুরক্ষা ব্যবস্থার সংকট, সর্বোপরি সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক নির্দেশনার অভাব রয়েছে।

একজন স্বাস্থ্যকর্মী এখন পরিবার-পরিজন, সন্তান লালনপালন, বাসস্থান, যাতায়াত, নিজের এবং পরিবারের চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা-এই সবকিছ নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন। বাংলাদেশে চিকিৎসকদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আর্থিক প্রণোদনা নয়, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণ তাঁদের কাছে গুরুত্বপর্ণ চাহিদা। কিন্তু বাস্তবতায় এই চাহিদার নিশ্চিতকরণ হচ্ছে না। এর ফলে উদ্বিগ্নতা এবং অনিশ্চয়তায় কাজের প্রতি অনীহা, বিরক্তি, শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। উপরন্তু পরিস্থিতি এমন যে সকল অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ীও হচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা যেখানে তাদের ভূমিকা আসলে ‚ নগণ্য।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একজন স্বাস্থ্যকর্মী নিজে যা করতে পারেন:

  • নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক মাধ্যমের নির্দেশনা দিনে একবার ঝালিয়ে নেয়া ((WHO, CDC, DGHS, IEDCR)
  • নিজের মানসিক অবস্থার কথা, সক্ষমতা-অপারগতার কথা কর্মক্ষেত্র বা পরিবারের নির্ভরযোগ্য কাউকে অথবা সচেতন ঊর্ধ্বতনকে খুলে বলা। এই সময়ে উদ্বিগ্নতা, বিষণ্ণতা আসতে পারে; সেটা স্বাভাবিকভাবে নিয়ে প্রকাশ করাটাই  ‍বুদ্ধিমানের কাজ।
  • কার্যক্রমের ফাঁকে বিশ্রাম নেয়া। একটানা আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টা কাজ করার পর পাঁচ-দশ মিনিট চোখ বন্ধ রাখা, গভীর শ্বাস নেয়া-এরকমভাবে মনটাকে বিশ্রাম দেয়া।
  • কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশনকালীন একটা ডায়েরি রাখা-অভিজ্ঞতাগুলো যতটা সম্ভব নিরপেক্ষভাবে লিখে রাখতে পারলে পরবর্তীতে সেটাও নিজের প্রতিফলনের জন্য চমৎকার মাধ্যম হতে পারে।
  •  নিজের ধর্মীয় নিয়মকানুন পালন, স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো যতটা সম্ভব বজায় রাখা। যেমন আগে থেকে বই পড়ার অভ্যাস থাকলে সেইটা করা সময়- ‍সুযোগ অনুযায়ী।
  • সুযোগ পেলে ব্যায়াম করা। ব্যায়ামের সুযোগ না থাকলে অন্তত শ্বাসের মাধ্যমে রিলাক্সেশন, মাইন্ডফুলনেস এসব চর্চা করা।
  • কোনোভাবেই নেতিবাচক অভ্যাসগুলো যেমন: ধূমপান, মদ্যপান অথবা অন্য আসক্তি, নেতিবাচক খবরগুলো সারাদিন দেখা এবং সেগুলোর চর্চা করে যাওয়া, অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ-এসবের আশ্রয় না নেয়া।
  • আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইনকালীন একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা।
  • সহকর্মী, পরিবারের সদস্য, বন্ধবান্ধব, আত্মীয়দের প্রতি এবং রোগীদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা।

পূর্বের উল্লেখিত গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সার্সের মহামারিকালীন কম দক্ষ এবং বেশি দক্ষ কর্মীদের একসঙ্গে কাজ করতে দিয়ে তাদের মধ্যকার মানসিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো ছিল কারণ নিজেদের মধ্যে ভালো যোগাযোগের সুযোগ থাকায় একাকিত্ব, নেতিবাচক মনোভাব তাদেরকে গ্রাস করতে পারেনি। সুতরাং কে কতটুকু দক্ষ সেটার চেয়ে মানবিক গুণাগুণগুলো বড়ো হয়ে উঠেছে একে অপরকে সহযোগিতা করতে গিয়ে।

সবশেষে একটা কথাই বলব ‘সবাই এক পথেরই যাত্রী, যেখানে পথ বিপদসঙ্কুল এবং গন্তব্য অজানা’-এই বোধটা মনের ভেতর থাকলে অন্যদের মানসিক অবস্থাটাও বোঝা যায় এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব হয়।অনিশ্চিত এই অবস্থায় নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টাগুলো বিনা দ্বিধায় পালন করা প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আগের সকল নেতিবাচক ধারণা দূর করে স্বাস্থ্যকর্মীরা সচেতন হতে পারবেন এবং ভালো থাকতে পারবেন সেই আশাবাদ রইল।

সূত্র: লেখাটি মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিনে পূর্ব প্রকাশিত।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here