ডিপ্রেশন: কে ভাই তুমি!!

0
211
ডিপ্রেশন: কে ভাই তুমি!!

আহ সংসার!!
তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসার, হঠাৎ করেই নাই হয়ে যায়!! কী ভীষণ অদ্ভূত ব্যাপার, তাই না?

জ্বী, ঠিক ধরেছেন। টেক্সাসের পুরো পরিবার হত্যা, সাথে আত্মহত্যার ঘটনার কথাই বলছি। যদিও ধারণা করা হচ্ছে ডিপ্রেশন এই হত্যা কান্ডের পেছনের বড় কারণ। কিন্তু যেহেতু ব্যাপারটা আরো ইনভেস্টিগেশন পর্যায়ে আছে,তাই কিছু না বলি এ ঘটনা নিয়ে। তবে মানসিক সমস্যা এই হত্যা-আত্মহত্যা কান্ডের পেছনের একটা বড় কারণ, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত।

চলুন, ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা নিয়ে যেহেতু শুরু হয়েছে, এর কথাই বলি।

আচ্ছা, একটা জিনিস আমি বুঝি না। সোশ্যাল মিডিয়ায়কেও যখন নিজের বিষণ্ণতা নিয়ে কিছু শেয়ার করে, প্রতিটা কমেন্টে বেশিরভাগ মানুষ যেন হামলে পড়ে-‘ডিপ্রেশন কোনো রোগ না’- এটা প্রমাণ করতেঃ

➤কেউ বলে, ডিপ্রেশন বড়লোকের বিরাট কারবার-এটা সুখের অসুখ।
➤কেউ বলে, ধর্মে কর্মে মন দিলেই এই রোগের চিন্তাও মাথায় আসবে না।
➤কেউ বলে, “কিচ্ছু ভাল্লাগে না!! শরীর ভীষণ দূর্বল লাগে, খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি!!….বুঝছি, এগুলা কাজ না করার ধান্দা।
➤কিছু লোক বলে, এটা কোনো রোগ না, আসলে এটা ডাক্তারদের টাকা কামানোর ফন্দি।
➤অনেকে বলে,পরিবারের সাথে সময় কাটান, নিজের সমস্যা শেয়ার করেন,ডিপ্রেশন কেটে যাবে।
➤কেউ কেউ বুঝে।বলে সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনের রোগের ডাক্তার দেখান।

এবং তারপর এবং তারপরেই বেচারার ওপর শুরু হয়ে যায় অগ্নি বর্ষণ। “সে (যে প্রব্লেম শেয়ার করেছে) কি পাগল…তারে কি পাগল প্রমাণ করতে চান, না হলে সে পাগলের ডাক্তারের কাছে ক্যান যাবে….নতুবা, আপনি বেশি বোঝেন, কোন ডাক্তারের দালালি করতে আসছেন!” ইত্যাদি শুনে তখন বেচারার ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি অবস্থা!

এসব দেখে মাঝে মাঝে ভাবি, ডিপ্রেশন, কে ভাই তুমি! তোমাকে কেউ রোগ হিসাবে গোণায় ধরে না। আর তুমি হাসতে হাসতে তাদের ব্যাঙ্গ করেই প্রাণ নিয়ে যাচ্ছে হাজারও মানুষের। তাও কি মতি ফিরবে জনগণের!

আজ ডিপ্রেশন বা সুইসাইডের কোনো পরিসংখ্যান দেবো না। ডিপ্রেশন নিয়ে কিছু উপদেশ দিবো মনের রোগের ডাক্তার হিসেবে।

জ্বী হ্যাঁ, ডিপ্রেশন একটি মানসিক রোগ। আপনি মানুন, বা না মানুন। এবং এই রোগে অবশ্যই চিকিৎসা, এবং সঠিক চিকিৎসারই দরকার।

চিকিৎসার ব্যাপারে এখন জানার ব্যাপারঃ

★ কি কি ধরনের চিকিৎসা আছে?
১। এন্টি ডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ (Antidepressant drug) অর্থাৎ ডিপ্রেশনের জন্য নির্ধারিত ডোজে ওষুধ।
২। সাইকোথেরাপি (বিভিন্ন ধরনের আছে,যেমন-CBT, Interpersonal Therapy etc)
৩। ইসিটি (ECT) ইত্যাদি।

★কিভাবে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া?
ডিপ্রেশনের মাত্রা আছে, যেমন -স্বল্প মাত্রা(Mild), মাঝারি ( Moderate), তীব্র (Severe), এবং সাইকোটিক ফিচার সহ (With Psychotic feature)।

তীব্র মাত্রার ডিপ্রেশনের রোগী আত্মহত্যাপ্রবণ হয় সাধারণত। রোগের তীব্রতা বুঝে চিকিৎসা দেয়া হয়। সাধারণত স্বল্প বা মাঝারি মাত্রার তীব্রতা থাকলে, সাথে বিশেষ কোনো সমস্যা না থাকলে সাইকোথেরাপিতেই (সাধারণ মানুষ এটাকে কাউন্সিলিং নামে জানেন) সেরে যায়। কিন্তু তীব্র, সাইকোটিক এবং আত্মহত্যা প্রবণ রোগীর চিকিৎসা (ওষুধ এবং সাইকোথেরাপি, প্রয়োজনে ECTও নিতে হয়) বেশ সময়সাপেক্ষ, রোগী-ডাক্তার- এটেন্ড্যান্ট সবার জন্যই ধৈর্যের ব্যাপার।

ডিপ্রেশনের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী। ১৫ দিন ওষুধ খাবার পরই কেন রোগ ভালো হচ্ছে না ভেবে ডাক্তার বদলাতে থাকলে, রোগ ভালো হবে না কোনোদিনই।

এখন অনেকে ভাবেন, ‘আচ্ছা,ডিপ্রেশন বুঝলাম কিন্তু মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবো না, যদি মানুষ পাগল বলে!!’ তাই অনেকে লোকাল ডাক্তারের ওষুধের পাশাপাশি কবিরাজি ট্রিটমেন্ট চালিয়ে যায়।

এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, ডিপ্রেশনে পূর্ণ চিকিৎসার প্রয়োজন, যেমন কোনো ওষুধ লাগবে ১৫০-২০০ মিলিগ্রামের, মানে ততটুকুই লাগবে, ২৫-৫০ মিগ্রা দিয়ে কাজ হবে না। সাথে সাইকোথেরাপি লাগবে, সেক্ষেত্রে আপনাকে মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছেই যেতে হবে। কারণ মনের রোগও শরীরের রোগের মতই একটা রোগ, এবং সেটা চিকিৎসায় ভালো হয়। আপনার পিত্ত থলিতে পাথর হলে নিশ্চয়ই মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন না অপারেশনের জন্য সার্জনের কাছেই যাবেন। তাই না?

আর যেকোনো ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। যেটা এন্টিডিপ্রেসেন্ট এর ক্ষেত্রেও আছে। অনেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে মানসিক রোগের ওষুধ খেতে চান না! অথচ যে প্যারাসিটামল ওষুধটি সাধারণ জনগণ মুড়ি মুড়কির মত খেয়ে থাকেন, সেটার সাইড ইফেক্ট সম্পর্কে ওরা কি কিছু জানেন! কথা হচ্ছে,পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সাইড ইফেক্ট থাকবে, এগুলো ধীরে ধীরে কমে আসে সময়ের সাথে, অনেক সময় এসব ইফেক্ট না হওয়ার জন্য সাথে ওষুধ যুক্ত করে দেয়া হয়। ফলে রোগীর সমস্যা হয় না।

চিকিৎসার বিষয়েই আজ বললাম, কারণ অনেকে ডিপ্রেশন বোঝে। কিন্তু চিকিৎসা করাতে হবে, ওষুধ, সাইকোথেরাপি নিতে হবে এটা বোঝে না, বা ভয় পায়। ভাবে, ওষুধ খেলে যদি কোনো ক্ষতি হয়!

সত্যি সেলুকাস! ওষুধ না খেলে, সঠিক চিকিৎসা না নিলে, আপনি যে আপনার প্রিয়জনকে সারাজীবনের জন্যই হারাতে পারেন! এটা ভাবুন।

আপনি কি জানেন, এই গত এক বছরে এই বাংলাদেশে কত ইয়াং ছেলে-মেয়ে আত্মহত্যা করেছে? জানেন কতগুলো ভিডিও ভাইরাল হয়েছে এ বিষয়ে? না জেনে থাকলে, জানুন প্লিজ। যখন নিজে সার্চ করে জানবেন, বেশি সচেতন হবেন আশা করি। হয়তো আপনার সচেতনতায় বেঁচে যাবে একটি তাজা প্রাণ।

আর সবশেষে, ডিপ্রেশনের সাধারণ লক্ষণ জেনে রাখুন। মিলিয়ে নিন, কেউ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়েছেন সন্দেহ হলে। আর চিকিৎসা নিতে বলুন ।

১. ডিপ্রেসড মুড/ মন খারাপ থাকা (সবসময়ই, ভালো কোনো খবর শুনলেও মন ভালো হয় না। এবং অনেকে এ সময় সারাদিন ঘরে বন্দী থাকে, বাইরে বের হয় না, কারো সাথে কথা তেমন বলে না)।
২. নেতিবাচক চিন্তা (Negative thinking)।
৩. আনন্দ অনুভূতি না হওয়া বা আনন্দ না পাওয়া কোনো কিছুতেই (Lack of enjoyment)।
৪. কর্মশক্তি কমে যাওয়া (Decreased energy)।
৫. মনোযোগ কমে যাওয়া, নিজেকে অকেজো-অপ্রয়োজনীয় মনে করা, ছোট খাটো কারণে বা তেমন কোনো কারণ ছাড়াই নিজেকে অপরাধী মনে করা, তার জীবনে কোনো আশা ভরসা নাই এমনটা মনে করা।
৬. সবচেয়ে জরুরী যেটা, আত্মহত্যার চেষ্টা করা, বারবার আত্মহত্যার কথা বলা, এ বিষয়ে বেশি বেশি ফেসবুকে লেখা বা পোস্ট শেয়ার করা ইত্যাদি।

লক্ষণ থাকলেই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনের ডাক্তার, নতুবা মনোবিদ..যে নামেই পরিচিত মনে হয়, তাকে দেখান।

আমরা জাতিগত ভাবেই মৃতকে সম্মান দিতে ভালোবাসি। বেঁচে থাকতে কেন জানি মানুষের কদর করি না। তাই ভালোবাসুন পরিবারকে, প্রিয়জনকে। তার সমস্যা বুঝে সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করুন। কারণ যে চলে যায়, পুরো পৃথিবী ওলট- পালট করলেও কি সে ফেরত আসবে? পৃথিবী তাকে ভুলে যাবে, কিন্তু আপনি ভুলতে পারবেন? কে জানে!

Time does not bring relief; you all have lied
Who told me time would ease me of my pain!
I miss him in the weeping of the rain;
I want him at the shrinking of the tide;
                 (By Edna St. Vincent Millay)

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here