মানসিক রোগীদের শেকলে বেধে রাখা: এখন ইতিহাস

0
257
মানসিক রোগীদের শেকলে বেধে রাখা: এখন ইতিহাস

মানসিক রোগের চিকিৎসা দেয়ার ধরনটা কেমন হবে, বছরের পর বছর বন্দী রেখে নাকি বাসায় রেখে কিংবা রোগীদের যেখানে ভর্তি রাখা হবে সেখানকার ডিজাইন, সংখ্যা, সময় সীমা কেমন হবে ইত্যাদি সম্বন্ধে সময়ের সাথে সাথে বিবর্তন হয়েছে অনেক। বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন আইন, সমাজে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গী, মন ও মস্তিস্ক নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নতুন নতুন ঔষধের আবিস্কার, এর হাত ধরে চিকিৎসার মানও বেড়েছে।

আজ শুনতে অবাক লাগলেও মানসিক রোগীদের কোন পাপের ফলাফল বা অপরাধী ডাইনী বা কালো জাদুকর শয়তান হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিকিৎসা শুরু হয়েছিলো সেই দশম শতাব্দীতে আরব চিকিৎসক ইবনে সিনার হাতে, আজকের ইরাকের বাগদাদে। ইবনে সিনা সেই সময়ে কনভার্সন ডিসঅর্ডার বা হিষ্টেরিয়াকে মানসিক রোগ হিসেবে গণ্য করেছিলেন এবং হুবহু আজকের মতোই দ্বন্দ্ব চিহ্নিত ও সমাধান করে সফলভাবে চিকিৎসা করেছিলেন।

ইবনে সিনার লেখা চিকিৎসা শাস্ত্রের বাইবেল বলে খ্যাত “আল-তিব্ব” স্পেন দিয়ে ইউরোপে ঢুকলেও মানসিক রোগের চিকিৎসার ব্যপারে ইউরোপের অন্ধকার কিন্তু দু-একশ বছরের মধ্যে কাটেনি। আইন-কানুনের ব্যাপারে ব্রিটিশ আইনগুলোকে রেফারেন্স হিসেবে ধরলে ব্যাপারটা বেশ পরিস্কার বোঝা যায়। যেমন ধরা যাক, ১৭৪৪ সালের ভবঘুরে বা ভ্যাগ্রান্সি (Vagrancy) আইন। ঐতিহাসিকভাবে এ আইনটিতে সর্বপ্রথম মানসিক রোগীদের স্বীকৃতি দেয়া হয়, যদিও সরাসরি মানসিক রোগী হিসেবে নয়, ভবঘুরে হিসেবে।

এখন মানসিক রোগীদের ভবঘুরে বললে তাদের চিকিৎসাটা যে রকম হওয়ার কথা, চিকিৎসার ব্যবস্থাটাও তখন ছিলো সেরকম। নোংরা বদ্ধ ঘর, খাওয়ার ঠিক নেই, কাপড়-চোপড়ের ঠিক নেই, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একজন মানুসকে লোহার শিকলে বেধে বন্দী করে রাখা। শারীরিক আঘাত, মাঝে মাঝে পানিতে চুবানো, চেয়ারে বসে ঘোরানোর নাম ছিলো চিকিৎসা।

১৭৪৪ সালের প্রায় ৬০ বছর পর ১৮০৮ সালে পাশ হলো কাউন্টি এসাইলাম অ্যাক্ট, এর আরো ৩৭ বছর পর ১৮৪৫ সালে হলো “লুনাটিকস অ্যাক্ট”। এই ১০০ বছরে মানসিক রোগীরা আইনের বর্ণনায় ভবঘুরে থেকে পরিবর্তিত হয়ে নতুন নামকরণ হলো “লুনাটিক বা উন্মাদ”। এই সময়ে নামে সামান্য কিছু পরিবর্তন এলেও চিকিৎসায় যেমন কোন উল্লেখযোগ্য আবিস্কার হয়নি, পরিবেশেরও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি ।

এখানে একটা বড় ধরনের পরিবর্তনে এলো ১৮৯২-৯৩ সালে। ফ্রান্সের প্যারিসে, ফিলিপ পিনেল এবং ইংল্যান্ডের উইলিয়াম টুক রোগীদের লোহার শিকল থেকে মুক্তি দিয়ে, নিয়ে এলেন দিনের আলোয়। চিকিৎসা আরও মানবিক করার জন্য হাসাতালের নিয়ম-কানুনেও অনেক পরিবর্তন আনলেন।

মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় এরপর আরেকটি বড় পরিবর্তন এলো ১৯৩০ সালের, “মানসিক চিকিৎসা আইন” এর হাত ধরে। উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ছিলো লুনাসি আইন ১৮৯০ এ আরোপিত রোগীদের ছুটির উপর অনেকগুলি বিধিনিষেধ বাতিল করা এবং “লুনাটিকস অ্যাসাইলাম” বা ‘‘পাগলা গারদ” শব্দটিকে “মানসিক হাসপাতাল” এবং স্বেচ্ছায় ভর্তি হওয়া রোগীদের ‘উন্মাদ’ বা “লুনাটিক” এর পরিবর্তে ‘মানসিক রোগী” হিসেবে বর্ননা দেয়া। মূলত এ আইনে সর্বপ্রথম “মানসিক” শব্দটি যুক্ত হয় যা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে আজ এসে পৌছেছে, “মানসিক স্বাস্থ্য” হিসেবে।

১৯৩০ সালেরও প্রায় ২০ বছর পর ১৯৫২ সালে মানব জাতির প্রথম অ্যান্টি-সাইকোটিক ঔষধ ক্লোরপ্রোমাজিন আবিস্কার সাইকোসিস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নাটকীয় ফলাফল দেখালে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা পরিবেশের আরেকটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের শূভ সূচনা ঘটে। রোগীদের বছরের পর বছর হাসপাতালে আটকে না রেখে এক বছরের কম সময় রেখে কিভাবে তাদের পুনরায় সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভূক্ত করা যায় সে নিয়ে শুরু হয় নানা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-উদ্যোগ।

এরপরে সবথেকে বড় পরিবর্তন আসে অ্যামেরিকায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সে সময়কার প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ১৯৬৩ সালে, “কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র” আইন করে প্রতিস্ঠা করেন, “কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র (সিএমএইচসি)”। এর মাধ্যমে রোগীদের হাসপাতালে বন্দী না রেখে তাদের নিজ নিজ সমাজে, গ্রামে-শহরে ফিরে যেতে উৎসাহ দেয়া হয়। যদিও হঠাৎ করে বড়-সড় পরিবর্তন করে ফেলায় শুরুর দিকে অনেক ঝামেলাও দেখা দিতে শুরু করে। অ্যামেরিকার এসব ভূল থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্রিটেন এমন কমিউনিটি ক্লিনিকের সাথে জুড়ে দেয় “কেস ম্যানেজারের” ধারনা এবং প্রয়োগ।

১৯৬৩ সালের কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র আন্দোলনের পর আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসে ইতালী, ১৯৭৮ সালে। ফ্রেঞ্চো ব্যাসালিয়া নামের একজন ইতালীয় সাইকিয়াট্রিষ্ট এবং তার সাংসদ স্ত্রীর উদ্যোগে সেখানে পাশ হয় “ল, ১৮০”। এ আইনে মানসিক রোগীদের একটি ওয়ার্ডে ১৫ জনের বেশী ভর্তি রাখা যাবেনা, পুরুষ-মহিলার আলাদা ওয়ার্ড রাখতে হবে ইত্যাদি প্রথম বলা হয়।

ইংল্যান্ডে-ফ্রান্সে এতসব কিছু পরিবর্তন এলেও ১৯১২ সালের, “দ্যা লুনাসি অ্যাক্ট” এর আগে আমাদের এই উপ-মহাদেশে মানসিক রোগ নিয়ে আলাদা কোনো আইনই ছিলোনা। সেই ১৯১২ সালের দীর্ঘ ১০০ বছরেরও বেশী সময় পর অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে এই আইন রহিত হয়ে ২০১৮ সালে হলো “মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮”। যাই হোক, ১৯১২ সালের “দ্যা লুনাসি অ্যাক্ট” পাশের প্রায় ৬ বছর পরে ব্রিটিশরা ১৯১৮ সালের ১৭ মে ভারতের ঝাড়খন্ডের রাঁচিতে ২১১ একর জায়গা জুড়ে “রাঁচি ইউরোপীয় লুনাটিক অ্যাসাইলাম” প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত এই হাসপাতালটিতে কেবলমাত্র ইউরোপীয় রোগীদের ভর্তি করা হতো। কর্নেল বার্কলে-হিল এর বর্ননা অনুযায়ী, “রাঁচি ইউরোপীয় মানসিক হাসপাতাল ভারতের একমাত্র মানসিক হাসপাতাল যা কেবলমাত্র ইউরোপীয় বা আমেরিকান ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট। এশিয়া বা আফ্রিকার স্থানীয় নাগরিকরা এখানে ভর্তির যোগ্য নয়। ইউরোপীয় শব্দটিতে মিশ্র-রক্তের ব্যক্তিরা পড়ে, এবং প্রাক্তনদের মধ্যে বেশিরভাগ রোগী এর অন্তর্ভুক্ত যেমন, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বা অ্যাংলো-আফ্রিকান (বার্কলে-হিল ও, ১৯২৪)।” যদিও বিভিন্ন নথিতে দেখা যায় আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে ১৯৪২ সালের দিকে চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো। হয়তো ২য় বিশ্বযুদ্ধ, অ-ইউরোপীয় কাউকে চিকিৎসা দেয়া যাবেনা, এমন নিয়ম কিছুটা শিথিল করে দিয়েছিলো।

বাংলাদেশের প্রথম মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে পাবনায়। তৎকালীন পাবনা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হোসেন গাংগুলী, শহরের শীতলাই জমিদারবাড়িতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯৫৯ সালে জেলা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে হিমাইতপুরে ১১২.২৫ একরের একটি চত্বরে হাসপাতালটি স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৩ সালের পর কমিউনিটি হাসপাতাল আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালটির কাঠামো তার আগের ঘরানার। শহর থেকে দুরে, বিচ্ছিন্ন, শুধুমাত্র মানসিক রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতাল, যেখানে এক জন মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় মেডিসিন, সার্জারী এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সেবাগুলো অনুপস্থিত।

১৯৫৭ সালের পর আধুনিক ধ্যান-ধারনার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে, ঢাকার শ্যামলীতে, যা অব্যাহতভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় অবদান রেখে চলেছে। যদিও এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, আই.পি.জি.এম.আর (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) এ মনোরোগবিদ্যা বিভাগ খোলা হয়, যা এখনও অব্যাহত ভাবে চিকিৎসা, গবেষণা ও উচ্চ শিক্ষায় অবদান রেখে চলেছে।

সময়ের সাথে সাথে দেশে দেশে মানসিক রোগ নিয়ে আইন এ যেমন পরিবর্তন এসেছে তেমনি এগিয়েছে মন ও মস্তিস্ক নিয়ে গবেষণা। এখন আর মানসিক রোগের জন্য শহরের বাইরে নিরিবিলি, বিচ্ছিন্ন হাসপাতাল তৈরী করা হয়না। বরং একটি সাধারণ হাসপাতালে “মনোরোগবিদ্যা” বিভাগ অন্তর্ভুক্ত রেখে চিকিৎসা দেয়াটাই এখনকার নিয়ম। এতে করে সাধারন মানুষের মাঝেও মানসিক অসুখ যে অন্যান্য রোগের মতো আরেকটি রোগ সে বিষয়ে সচেতনতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে, হাসপাতালের জনবল, যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত হয়।

রোগীদের বছরের পর বছর শেকল বেধে বন্দী রাখা এখন ইতিহাস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ভাষায় এখন, “মানসিক স্বাস্থ্য ছাড়া কোন স্বাস্থ্য নয়”।

সূত্র: লেখাটি মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।

করোনায় স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here