মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home জীবনাচরণ কুসংস্কার যতসব কুসংস্কার!

যতসব কুসংস্কার!

যত্তসব কুসংস্কারে ভরা একটা দেশ! কমবয়সী রায়হান সাহেবের মন্তব্যে পত্রিকা থেকে সহকর্মীর দিকে চোখ তুলে তাকালেন আবিদ সাহেব। কলেজের কমনরুমে ক্লাসের বিরতিতে পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছিলেন তিনি।
– কী হয়েছে রায়হান? কোন দেশের কথা বলছ?
– আর কোন দেশ! আমার-আপনার দেশের কথাই বলছি।
– হা হা হা।
– হাসছেন কেন?
– এটা শুধু কি এই পোড়ার দেশের সমস্যা? এটা তো আন্তর্জাতিক সমস্যা।
– মানলাম। কিন্তু আমাদের মতো এমন উদ্ভট কুসংস্কার আর কোনো দেশে নেই।
– কুসংস্কার তো কিছটা উদ্ভটই হয়।
– আচ্ছা বলেন তো, আর কোন দেশে হাতের তালু চুলকালে টাকা আসবে এই কথা বিশ্বাস করে? টাকার টানাটানিতে দিন যায়, আর আমাকে বলে কিনা, রায়হান ভাই আপনাদেরই তো হাত চুলকাবে, টাকা তো আপনাদের পেছনে পেছনে ঘোরে। দোষ করেছিলাম, তাকে জিজ্ঞেস করেছি, কয়েকদিন ধরে বাম হাতের তালুটা চুলকাচ্ছে, ডাক্তার দেখাব কিনা।
– বুঝলাম তোমার রাগের কারণ। তবে এর চেয়েও উদ্ভট অনেক কুসংস্কার আছে বিভিন্ন দেশে। আর ভালো কথা, তোমার কথায় মনে পড়ল কালকেই একটা ওয়েবসাইটে দেখছিলাম আমেরিকার শীর্ষ তেরটা কুসংস্কার। তার মধ্যে তোমার এই হাত চুলকানো  ব্যাপারটাও আছে।
– কেমন?
– এই যে, বাম হাতের তালু চুলকালে টাকা আসে, আর ডান হাতের তালু চুলকালে টাকা খরচ হয়। ঠিক আমাদের দেশের মতো।
– তাই নাকি! আচ্ছা আর বাকিগুলো কী ছিল?
– সব তো আর এই মুহূর্তে মনে নেই। আর এটা তো একটা ওয়েবসাইটের লেখা, রিসার্চ পেপার না। তাই এগুলোকেই শীর্ষ তের বলাও কঠিন। তবে এগুলো যে আছে, তা বলা যায়।
– আহা বলেন না। সবকিছুতে কি অত বিজ্ঞান খোঁজা যায়!
– হাসালে রায়হান।
– কেন?
– সে পরে বলব। তুমি শুনতে চাইলে তাই ওখানের দুয়েকটা বলি, শোন। যেমন- কালো বিড়াল যদি তোমার সামনে রাস্তা পার হয়, তবে তা অশুভ। তারপর আছে, আয়না ভাঙা মানে সাত বছরের গাড্ডায় পড়লে, মানে দুর্ভাগ্য ডেকে আনলে। হ্যাপি বার্থডে বলার পর একনিঃশ্বাসে সব বাতি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে
ফেলে মনে মনে যদি একটা ইচ্ছার কথা আওড়ানো যায়, তবে তা সত্যি হয়। হাঁচি দেয়ার পর বলতে হবে, স্রষ্টা মঙ্গল করুন। তের সংখ্যাটা অশুভ।
– আরে আরে, এসব তো আমাদের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
– হ্যাঁ। সেজন্যই তো মনে আছে ভালো। তবে মেলে না এমনো আছে।
– যেমন?
– যেমন ঘরের ভেতর ছাতা খোলা মানে দর্ঘটনা ডেকে আনা, বিছানায় হ্যাট রাখা মানে কিছু একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, দেয়ালে রাখা মইয়ের নিচ দিয়ে
হেঁটে যাওয়া মানে খুব অশুভ, গাছের গায়ে দুইবার টোকা দিয়ে কিছু চাইলে তা পূরণ হয়।
– হুম। আসলেই উদ্ভট।
– কুসংস্কারগুলো উদ্ভট বর্তমানের বিবেচনায়। জানো তো, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন’।
– বুঝলাম না, কী কথার মধ্যে কী কথা বললেন। যোগসূত্রটা কী?
– কুসংস্কারগুলোকে যদি শুধু উদ্ভট বলে দরে সরিয়ে রাখ, তবে অনেক কিছু হারাবে। যদি এই ওয়েবসাইটটার মত তাদেরকে বিশ্লেষণ করে দেখ, সেগুলো নিয়ে ভাব, তবে দেখতে পাবে, প্রত্যেকটা পেছনেও কিছু পর্যবেক্ষণ আছে মানষের। কিন্তু ব্যাখ্যাটা ভুল দেয়া হয়েছে। এই ভুল ব্যাখ্যার পেছনে থাকে অজ্ঞানতা, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যসহ অনেক কিছু। এখান থেকেই পেতে পার, মানব সভ্যতার ইতিহাসেরও কিছু উপাদান। যেমন ধর, লবণ ছড়িয়ে পড়তে দেখা অশুভ। আবার, বাম কাঁধের কুসংস্কার। তার মধ্যে তোমার এই হাত চুলকানোরওপর দিয়ে পেছনে লবণ ছিটানো দুর্ভাগ্যকে দূর করার উপায়। এগুলো কুসংস্কার। কিন্তু কেন এলো এই কথাগুলো? ওরা ব্যাখ্যা দিয়েছে, এখনকার দিনে লবণ খুব সাধারণ জিনিস হলেও একসময় লবণ ছিল খুব দামি একটা ব্যাপার। তুমি তো জানো, ইংরেজি Salary শব্দটা এসেছে ল্যাটিন Sal মানে Salt থেকে। কারণ, তখন বেতন হিসেবে দেয়া হতো লবণ। সে যা- ই হোক, এমনই মূল্যবান ‘লবণ’ কেউ যাতে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে নষ্ট না করে, তাই চালু হলো লবণ ছড়িয়ে পড়া বা পড়তে দেখা অশুভ। আবার, ‘লাস্ট সাপার’-এ জুডাস লবণ ছড়িয়ে পড়তে দেখেছিল, যার পরেই তো ঘটে খ্রিস্টের ক্রুসবিদ্ধ হওয়া। তাই এটা অশুভ। আর বিশ্বাস করা হয়, কোনো একজনের শরীরে প্রবেশ করার আগে শয়তান বাম কাঁধে ভর করে। তাই বাম কাঁধের ওপর দিয়ে লবণ ছড়ে মারলে তার প্রতিকার হয়। বোঝো এবার, এক লবণ নিয়েই কত কাহিনী!
– এত কাহিনী জেনে আমার লাভ কী? নাকি এগুলো সত্য বলে মানতে হবে!
– না। মানতে হবে না, বিশ্লেষণ করতে হবে। কিছক্ষণ আগে কেন হাসলাম এখন বলি। হাসলাম কারণ তুমি বললে সবকিছুতে বিজ্ঞান খুঁজলে নাকি চলে না। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, কোনো কিছু সম্পর্কে যদি জানতে চাও, ভাবতে চাও, তবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই তা করতে হবে। নাহলে জন্ম নেবে ভুল সিদ্ধান্ত। সেটা যখন সমাজের মানুষ বিশ্বাস করবে অন্ধভাবে, তখন জন্মাবে আরেকটা কুসংস্কার। ফায়দা ওঠাবে সুবিধাবাদী মহল, আর জ্ঞানের বিকাশ হবে বাধাপ্রাপ্ত।
– জ্ঞানের মল্য আর কয়জনইবা বোঝে! কয়জনেরইবা কাজে লাগে?
– ‘অন্ধ হলেই কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ প্রেতচর্চার নামে কত সাধারণ মহিলাকে ডাইনী অপবাদে পুড়িয়ে মারা হলো, অনেক সময় স্রেফ বিধবা মহিলার সম্পত্তি
দখলের জন্য। আমাদের কথাই বলি। ওলাবিবির ওপর ভরসা করলে তুমি-আমি-এতগুলো মানষের সবাই বেঁচে
থাকতাম কি? জ্ঞান কি তাই শুধু পন্ডিতদের ? জ্ঞান সবার জন্যই প্রয়োজনীয়, সবাই জ্ঞানের উপকারভোগী।
– ঠিক বলেছেন স্যার। কিন্তু হায়! কবে যে একথা সবাই বুঝবে!
 

ডা. পঞ্চানন আচার্য্য
ডা. পঞ্চানন আচার্য্য। স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রাম। তবে, কলেজ শিক্ষক মায়ের চাকুরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে শৈশব। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবং উচ্চ-মাধ্যমিক চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। সিলেট এম. এ. জি. ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাসের পর সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। মেডিক্যালে পড়ার সময় থেকেই মনোরোগ নিয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ। তাই, ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্ধারিত সময়ের চাকুরি শেষে ভর্তি হন মনোরোগবিদ্যায় এম.ডি(রেসিডেন্সি) কোর্সে। বর্তমানে তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত শিক্ষকতার ধারা বজায় রেখে চিকিৎসক ও শিক্ষক হওয়াটাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বই, সঙ্গীত আর লেখালেখিতেই কাটে অবসর সময়ের বেশির ভাগ। স্বপ্ন দেখেন - মেধা ও মননশীলতার চর্চায় অগ্রগামী একটা বাংলাদেশের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

অবিবাহিতদের মানসিক স্বাস্থ্য বনাম বিবাহিতদের মানসিক স্বাস্থ্য

আমাদের সমাজে অবিবাহিত বা বৈবাহিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলা মানুষদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেকেই মনে করেন বৈবাহিক সম্পর্ক এড়িয়ে চললেই সবাইকে নিয়ে সুখী...

পরিবেশ দূষণ মনের ওপর যেসব প্রভাব ফেলে

আমাদের চারপাশের ভৌত অবস্থা, জলবায়ু, জৈবিক এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তির সামষ্টিক রূপটিই হচ্ছে পরিবেশ। কোন ব্যবস্থা বা জীবের অস্তিত্ব বা বিকাশের জন্য তার উপর...

বায়ু দূষণ করোনাভাইরাসে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ায়

বিশ্বে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে যত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন তার ১৫ শতাংশের পেছনে ভূমিকা রেখেছে লম্বা সময় বায়ু দূষণের প্রভাব, এমন দাবি করছেন গবেষকরা। বায়ু দূষণ...

বায়ুদূষণ শিশুদের সিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়

ভারী বায়ু দূষণের এলাকাগুলিতে বেড়ে ওঠা শিশুদের সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দূষিত বাতাসে থাকা পার্টিকুলেট পদার্থ কেবল শারীরিক অসুস্থতার...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন