মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home জীবনাচরণ অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কতোদূর?

কর্মক্ষেত্রে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কতোদূর?

যার থেকে নারীর মনের মধ্যে জন্ম নেয় গভীর হীনম্মন্যতাবোধ, হতাশা, আড়াল করার প্রবণতা, রাগ, ক্ষোভসহ নানা কিছু। নারীর এই মানসিক অবস্থা যে মানসিক অসুস্থতা তা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না বা বুঝতে চাইও না। ফলে মানসিক এই অবস্থা এক সময় নারীকে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত করে তোলে, যা নারীকে কখনো কখনো ঠেলে দেয় আত্মহত্যার পথে। কখনো বা তারা হত্যা করে বসে সন্তান, স্বজনকেও।
‘আমি আর পারছি না। অফিসে এসে পাহাড় সমান কাজ দেখলে মাথা ঘুরে যায়’ কিংবা ‘অফিসে এলে এখন আমার অসম্ভব মাথা ধরে, একেবারেই শান্তি পাই না।’- কর্মক্ষেত্রে এইধরনের আর্তনাদ প্রায়ই আমরা শুনি নারী ভুক্তভোগীর কণ্ঠে। কতোবার যে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি আমি নিজেও হয়েছি এবং হচ্ছি- তা হিসেব করে বলা কঠিন। গবেষণা বলছে, মায়েরা পুরুষদের তুলনায় মানসিক চাপে ভুগেন বেশি। কেননা, পরিবার ও পেশা এই দুইয়ের ভারই সামলে চলতে হয় তাকে, যা সব সময় সম্ভব হয় না। একটি প্রতিবেদনে দেখলাম- জার্মান শ্রমমন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সালের তুলনায় ২০১০ সালে দ্বিগুণ মেয়ে মানসিক চাপের কারণে কোনো পেশায় কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ছে।
জার্মানির মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ডিজিজ ম্যানেজমেন্ট’ বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, কর্মীদের মানসিক অসুস্থতার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বছরে ৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অপর একটি খবরে দেখা যায়, ৭০ এর দশকের তুলনায় চাকরিজীবীদের মধ্যে এখন মানসিক রোগের পরিমাণ ১০ গুণের মত বেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে দুই কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ১৮ শতাংশের বেশি বিষণ্নতায় আক্রান্ত যাদের অধিকাংশই আবার নারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অপর এক সমীক্ষা অনুযায়ী- ‘বিশ্বে ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে। যার প্রভাব পড়ছে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর। আর বাংলাদেশে ২০-২৯ বছর বয়সী নারী পোশাক শ্রমিকদের ওপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, তাদের ৪৩ ভাগ কর্মক্ষেত্রজনিত মানসিক চাপে ভুগছেন।’
আমাদের দেশের মতো বলতে গেলে সারা বিশ্বের কর্মক্ষেত্রেই রয়েছে পুরুষের আধিপত্য। গবেষণা বলছে, কর্মক্ষেত্রে নারীরা নানাভাবে যৌনবৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সহকর্মীর কোন কটূক্তি, যৌন আক্রমণ অথবা কর্মক্ষেত্রের পরিবেশই কখনো কখনো প্রতিকূল থাকে নারীর জন্য। এতে করে তার স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং কাজের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। অফিস ব্যবস্থাপকরা এসব বিষয় প্রায়ই অনুধাবন করে না বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষকদের মতে, কর্মক্ষেত্রে অবাধ যৌন হয়রানি, যৌনবৈষম্য এবং কর্মক্ষেত্রের অব্যবস্থাপনা নারীর অগ্রগতির পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। তাদেরকে লিঙ্গপরিচয় দিয়ে বিবেচনা করা ঠিক নয়। কর্মজীবী নারীদের উপর মোট ৮৮টি গবেষণা চালিয়ে কয়েকটি নেতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। এগুলো হলো- যৌনবৈষম্য এবং যৌনহয়রানি কর্মজীবী নারীর স্বাস্থ্য এবং কাজ দুটোর জন্যই ক্ষতিকর। এটি অতিরিক্ত কাজের চাপ সামলানোর মতো যন্ত্রণাদায়ক। এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্ভূত হলে কর্মক্ষেত্রে নারীরা সহকর্মীদের চেয়ে ব্যবস্থাপকদের উপর বেশি অসন্তুষ্ট হন। পুরুষশাসিত কর্মক্ষেত্রে এমন বৈষম্যের হার বেশি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। তারা মনে করেন, অফিস কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি- আমাদের সমাজে নারীরা শারীরিক অসুস্থতা, অপর্যাপ্ত ঘুম, সাংসারিক কাজ, যৌন নির্যাতন, ইভটিজিং, পারিবারিক নির্যাতনসহ নানা ধরনের মানসিক চাপে থাকেন। আবার মেনোপজ, গর্ভকালীন বিষণ্নতা, বয়ঃসন্ধিক্ষণসহ কিছু প্রাকৃতিক নিয়মের কারণেও নারীরা বিষণ্নতা, হতাশা, কাজে অনীহাসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগতে থাকেন। কিন্তু এসবকে অসুখ বলে গণ্য করার প্রবণতা এখনো তৈরি হয়নি আমাদের সমাজে।
উপরন্তু, আমাদের নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। যার থেকে নারীর মনের মধ্যে জন্ম নেয় গভীর হীনম্মন্যতাবোধ, হতাশা, আড়াল করার প্রবণতা, রাগ, ক্ষোভসহ নানা কিছু। নারীর এই মানসিক অবস্থা যে মানসিক অসুস্থতা তা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না বা বুঝতে চাইও না। ফলে মানসিক এই অবস্থা এক সময় নারীকে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত করে তোলে, যা নারীকে কখনো কখনো ঠেলে দেয় আত্মহত্যার পথে। কখনো বা তারা হত্যা করে বসে সন্তান, স্বজনকেও। কেউ আবার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। কেউ বা নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে।
এছাড়া এটা বলাই বাহুল্য যে, আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয় তুমি মেয়ে। এটা তোমার করা উচিত, ওটা করা উচিত নয়। এতে শৈশব থেকেই মেয়েশিশুরা মানসিক বিপর্যস্ততা নিয়ে বড় হতে থাকে। জীবনের প্রতিটি ধাপেই নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির ভাবা হয়। এতে চেতনে ও অবচেতনে নারীর ভেতর হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা নারীকে বিপথগামী করে তুলতে পারে। নারীর মানসিক সুস্থতার জন্য শৈশব থেকেই তাকে সুন্দর পরিবেশ দিতে হবে, এতে সে ছোটবেলা থেকেই মানসিকভাবে দৃঢ় হবে। নারীরা মন খুলে তার মানসিক অবস্থার বিষয়ে কথা বলতে পারে না। অথচ মন খুলে কথা বলতে পারলে আর কাউন্সেলিং নেওয়ার সুযোগ পেলে নারীদের অনেক মানসিক সমস্যাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। উন্নত বিশ্বেও প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী কেবল বিষণ্নতার কারণে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। বিষণ্নতার কারণে বছরে গড়ে ৩৬ কর্মদিবস নষ্ট হয়। কিন্তু বিষণ্নতায় আক্রান্ত ৫০ শতাংশ কর্মী চিকিৎসাসেবা নেন না। অনেক সময় মানসিক সমস্যার কথা মুখ ফুটে বললে চাকরি হারানোর ভয় থাকে।
প্রকৃতপক্ষে, আর্থ-সামাজিক নানা কারণে বিশ্বব্যাপী বিষণ্নতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা মানসিক স্বাস্থ্য অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের দেশে মানসিক রোগের কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পেশাগত ও সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একইসাথে কর্মদক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে, পরিণতিতে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। উপরন্তু, আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জনগণের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা না দিয়ে ঝাড়ফুঁক বা তাবিজ-কবজের আশ্রয় নেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও মানসিক রোগের প্রতিরোধে শরীরের মতো মনেরও যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রকে মানসিক স্বাস্থ্যবান্ধব করতে এবং নারীকর্মীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে চাকরিদাতা ও কর্মীদের সচেতন হতে হবে। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য যাতে না থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে।
যেসব নারীকর্মীর শিশুসন্তান রয়েছে, তাদের জন্য কর্মক্ষেত্রে ‘শিশু যত্ন কেন্দ্র’ থাকা উচিত। যে কারও সাফল্যকে উদযাপন করতে হবে, ব্যর্থতাকে বারবার তুলে ধরা যাবে না, ব্যঙ্গবিদ্রূপ করা চলবে না। কারও মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা আচরণজনিত সমস্যা দেখা দিলে সেটি নিয়ে তার সঙ্গে আলাদা কথা বলতে হবে। মোদ্দাকথা, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে স্বাস্থ্যসম্মত ও কর্মবান্ধব পরিবেশ, প্রয়োজনীয় ছুটি ও বিনোদনের সুযোগ, ধারাবাহিক ঝুঁঁকিপূর্ণ ও চাপযুক্ত কাজ পরিহারসহ সুষম খাদ্য গ্রহণ জরুরি। কিন্তু এর জন্য আমরা প্রস্তুত কি? কুসংস্কার দূর করে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের বিশেষ করে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই তো নেওয়া উচিত। কিন্তু, রাষ্ট্র এক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে কতোটুকু?
লেখকঃ অনামিকা চৌধুরী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

আশাবাদী মনোভাব দীর্ঘায়ু প্রদান করে

আশাবাদী মনোভাব মানুষকে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগায়। অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও মনের জোর বজায় রাখে। বিপদে ধৈর্য প্রদান করে। সম্প্রতি গবেষকগণ এই দাবি করেছেন যে একজন আশাবাদী...

কারো সাথে ঠিকমতো কথা বলতে পারি না

সমস্যা: আমার বয়স ২৭ বছর। আমি ফ্রিল্যান্সিং কাজের সাথে যুক্ত আছি। আমি খুবই কনজারভেটিভ ফ্যামিলিতে বড় হয়েছি। বর্তমানে আমার কিছু সমস্যা হচ্ছে। কারো সাথে...

করোনা মহামারি ও নয়া স্বাভাবিকতা নিয়ে মনের খবর অক্টোবর সংখ্যা প্রকাশিত

দেশের অন্যতম বহুল পঠিত মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন মনের খবর এর অক্টোবর সংখ্যা। অন্যান্য সংখ্যার মত এবারের সংখ্যাটিও একটি বিশেষ বিষয়ের উপর প্রাধান্য...

ধর্ম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র

অনেকেই মনে করেন ধর্মীয় বিধি বিধান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মাঝে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং বিশেষ করে যারা ধর্মীয় জীবন যাপন করেন তারা উন্নত...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন