মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home জীবনাচরণ মন প্রতিদিন মানুষের মনের অনুভূতি প্রকাশের প্রচলিত কিছু ধারণা

মানুষের মনের অনুভূতি প্রকাশের প্রচলিত কিছু ধারণা

অনেকেই ভাবেন মনের ভাব বিনিময় করে সম্পর্কে বিদ্যমান সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু এই কাজটি কিভাবে করবেন সেটি নিয়ে সন্দিহান থাকেন। যারা ঠিক এমন দোটানায় পড়েছেন, নিচের লেখাগুলো তাদের জন্য। আশা করছি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

প্রচলিত কথা (১): মনের কিছু বিশেষ অনুভূতির প্রকাশ অন্যান্য ভাব প্রকাশ থেকে আলাদা:

অনেক মনস্তত্ত্ববিদের মতে অনুভূতি এবং আবেগ দুটো ভিন্ন বিষয়। বাস্তব জীবনে আমরা দুটোকে এক করে ফেলি। অনেকের মতে অনুভূতি হল ব্যাখ্যাহীন চেতনা। যেমন, বিভিন্ন সুখ-দুঃখের অনুভূতি। আবার, ক্রোধ, কৃতজ্ঞতা এসব অনুভূতির নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে,তাই এগুলো আবেগ। অনুভূতি প্রকাশ করা বলতে তাই আমরা বিশেষ মানসিক অবস্থার ব্যাখ্যা করাকে বুঝি,যা বেশ অস্পষ্ট।

প্রচলিত কথা (২): ব্যক্তিগত অনুভূতি একান্তই ব্যক্তিগত, সেটি প্রকাশে কাউকে দোষারোপ করা যায়না :

ধরুন,কেউ বলল, সে অসন্তুষ্ট, নিরুৎসাহিত, মন:ক্ষুণ্ণ, হতাশ ইত্যাদি। তাহলে তার এই অভিব্যক্তির  মাঝে লুকিয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিযোগ। আমরা ভাবি অনুভূতি প্রকাশে নিরপেক্ষ হলে সেটি কাউকেই আঘাত করবেনা। অবচেতনভাবেই অন্যদের মাঝে চেতনার জন্ম দেবে। কিন্তু এর দ্বারা কেউ যদি আক্রান্ত অনুভব করে, তবে সেটি হবে নিজের জন্য, এবং অন্যদের জন্যও, হুমকি স্বরূপ।

প্রচলিত কথা (৩): নিজের উদ্দেশ্য প্রকাশ করাই অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ হওয়া উচিত:

অনেকেই ভাবেন অনুভূতি প্রকাশ হওয়া উচিত উদ্দেশ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ। এতে কেউ কষ্ট পেলে ব্যাখ্যার মাঝে অনুশোচনা প্রকাশ করলে সব কিছু সঠিকতর হবে। যা অনেক ক্ষেত্রেই ঠিক নয়।

প্রচলিত কথা (৪): আপনিই আপনার অনুভূতির নিয়ন্ত্রক:

সবাই ভাবে সে ই তার মনের ভাব প্রকাশের সফল নিয়ন্ত্রক। সে যেভাবে ভাবছে,চাইছে,ঠিক সেভাবেই হয়তো সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তা নয় যা আপনি ভাবছেন। হয়তো আপনি কোন ব্যাপারে কষ্ট পেয়েছেন। এই কষ্টের বহিঃপ্রকাশ করলেন রাগের মাধ্যমে। আবার, যারা আপনার কথা শুনছেন, তারা ভাবছেন যে তারাই আপনার ভাবনা নিয়ন্ত্রণ  করছে।তারা ঠিক যেভাবে  নেবে, বিষয়গুলো ঠিক তেমনই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোনটাই সঠিক নয়।

প্রচলিত কথা (৫): অযৌক্তিক কিছু ভাবা যাবেনা :

আপনার ভাবনার যৌক্তিকতা নির্ধারণ করতে গেলে আপনার অনুভূতি সংজ্ঞা হারাবে। যখন আপনি ভাল,মন্দ বিচার করে কোনকিছু ভাবতে যাবেন, তখন স্বাভাবিক ভাবেই যেটা ভাবছেন, সেটি হয়ত প্রকাশ করতে পারবেননা।

প্রচলিত কথা (৬): একই সময়ে দুটো বিপরীত ভাবনা ধারণ করা অসম্ভব :

অনেকেই ভাবেন “শুধুমাত্র” শব্দটি অন্যান্য সকল সম্ভাব্যতাকে অকার্যকর করে দেয়। কিন্তু বাস্তবে একজন মানুষ একই সময়ে পরস্পর বিরোধী চিন্তাভাবনা ধারণ করতে পারে। মানুষ অধিকাংশ সময়েই তাদের চিন্তাভাবনার ব্যাপারে অনেক বেশি জটিল।

প্রচলিত কথা (৭): অনুভূতি প্রকাশ ই সফল যোগাযোগ স্থাপনের অন্যতম উত্তম উপায়:

“আমি শুধুমাত্র আমার মতামত ই ব্যক্ত করছি”- এটা বলে অনেকেই স্থান,কাল,পাত্র বিবেচনা না করে নিজের চিন্তাভাবনা অকপটে ব্যক্ত করে ফেলে। কিন্তু সব সময় সব কিছু ব্যক্তিগত বলে চালিয়ে দেওয়া যায়না এবং  এটি উচিত ও নয়।

প্রচলিত কথা (৮):  মনের কথা সঙ্গীকে খুলে বললেই অংশীদারিত্বমুলক সম্পর্ক স্থাপিত হয়:

কি বলা উচিত এবং কি বলা উচিত নয়-এটি যে কোন সম্পর্কের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সঙ্গীর সাথে সব সময়ই সৎ থাকা উচিত। সব সময় সত্য কথা বলাই সম্পর্ককে আদর্শ সম্পর্কে রূপ দেয়। কিন্তু এর উল্টোটাও হতে পারে। একটি সত্যের দুষ্প্রভাব থেকে সম্পর্ককে বাঁচাতে কিছু সময়ে সত্য গোপন করার ও প্রয়োজন পড়ে।

প্রচলিত কথা (৯): নিজেদের মাঝে সব কিছু ভাগ করে নিলেও যদি কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া না যায়, তবে বিচ্ছেদই একমাত্র করনীয়:

সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে হলে নিজেদের মাঝে উত্তম বোঝাপড়া অত্যন্ত প্রয়োজন। অনেক মানুষই তাদের সঙ্গী নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তারা শুধু নিজেদের অসন্তোষের জায়গা গুলোই সর্বদা তুলে ধরেন। কিন্তু এটা মনে রাখা উচিত সব কিছু নিজের মত করে পাওয়া সম্ভব নয়। কিছু কিছু সময়ে পরিবর্তনকে স্বীকার করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে হয়।

প্রচলিত কথা (১০): শুধুমাত্র নিরপেক্ষ মত প্রকাশই সেটিকে অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে :

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা অনেটা উপস্থিত বক্তৃতা দেবার মত। এক্ষেত্রে অন্যদের কথা মাথায় রেখে কোন মতামত প্রকাশ করলে প্রকৃত সত্য কখনোই সামনে আসেনা।

প্রচলিত কথা (১১): অনুভূতি প্রকাশে যথেচ্ছা সময় নেওয়া বাঞ্ছনীয়:

আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের জন্য সব কিছু গুছিয়ে অনেক সময় নিয়ে বলার প্রবণতা অনেকের মাঝেই আছে। কিন্তু এতে অনুভূতিজাত অর্থের ব্যত্যয় ঘটে। নিজের অনুভূতি ধিরে ধিরে প্ররোচনায় রূপ নেয়। যা অন্যদের বিভ্রান্তিকর অবস্থায় ফেলে দেয়।

প্রচলিত কথা (১২): ব্যক্তিগত মত প্রকাশ সব মসময় অনাক্রমণাত্মক হওয়া উচিত :

আমরা যতইই কুশলী এবং প্রতিভাবান হই না কেন, অনুভূতি প্রকাশ করতে গেলে সবাই যে সেটি মেনে নেবে তা কিন্তু নয়। এজন্য আমরা অন্যের সমালোচনা তার অনুপস্থিতিতে করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কারো সামনে প্রত্যক্ষভাবে তার ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা আমাদের কাছে অসুরক্ষিত মনে হয়।

আত্মানুভূতির প্রকাশ,মত প্রকাশের মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং  উপযোগী। কিন্তু এটি যে সব সময়,সব কিছু প্রতিকার করতে পারবে তা কিন্তু নয়।

অনুবাদ করেছেন: প্রত্যাশা বিশ্বাস প্রজ্ঞা

সূত্র: https://www.psychologytoday.com/intl/blog/ambigamy/201907/sharing-your-feelings

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ পেতে দেখুন: মনের খবর ব্লগ
করোনায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক টেলিসেবা পেতে দেখুন: সার্বক্ষণিক যোগাযোগ
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
করোনায় সচেতনতা বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও বার্তা দেখুন: সুস্থ থাকুন সর্তক থাকুন

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

তরুণদের মাদকাসক্তির পেছনেও রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব: গবেষণা

ভালো দিকের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন খারাপ প্রভাবও  উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন গবেষণায়। তবে এবার একটি গবেষণা বলছে তরুণদের মাদকাসক্তির পেছনেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের...

সেক্স্যুয়াল মিথ ও যৌন স্বাস্থ্য

ভীমরতি শব্দের আভিধানিক অর্থ ভীষনরাত্রি । ‘ভীম’ মানে ভীষন আর ‘রতি’ মানে রাত্রি। ভারতীয় পুরাণ মতে বয়স সাতাত্তর হলে সাত মাসের সপ্তম রাত্রির নাম...

করোনা’কে অগ্রাহ্য বা অতি আতঙ্কে বিষণ্ণতা- উভয়ই ক্ষতিকর

অতি মাত্রার আতঙ্ক অনেক সময় মানুষকে বিবেক শূন্য করে দিতে পারে। তখন অনেকে আতঙ্ককে অগ্রাহ্য করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, আবার...

মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক রোগের চিকিৎসা

সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিপাদ্যে এবছর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়েছে। প্রতিপাদ্যে সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বলা হয়েছে; মানসিক রোগের কথা বলা...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন