মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home জীবনাচরণ মন ও ক্রীড়া যে পাগলামী ভালো লাগে: ক্রিকেট

যে পাগলামী ভালো লাগে: ক্রিকেট

২০০৭ ক্রিকেটে বিশ্বকাপের আগে আমি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাথে কাজ করেছি। আমার পদের নাম ছিল, ‘মেন্টাল স্কিল কনসালট্যান্ট অফ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রিকেট টিম’। ক্রিকেটীয় মানসিক দিকগুলো দেখার দায়িত্ব আমার ছিল। কি করেছি, কতটুকু করেছি, কেন করেছি, কীভাবে করেছি, কতটুকু করতে পারি নাই বা কেন পারি নাই সেসব নিয়ে এ লেখা নয়। বরং সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আজকের লেখা।

কাজ করতে গিয়ে স্বভাবতই দলের ভেতর-বাইরের অনেক কিছুই খুব কাছে থেকেই দেখেছি। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দলগত সম্পর্ক, দলের ভেতরের খুনশুটি, দুষ্টুমি, মজা, আড্ডাসহ অনেক কিছু। খেলোয়াড়দের ভেতর একজন অন্যজনের বিষয়ে ধারণা, টিমওয়ার্কের ক্ষেত্রে কার কী অবস্থান, পেশাদারিত্ব, মাঠের ভেতর-মাঠের বাইরের যোগাযোগ (কমিউনিকেশন)। কে কাকে কত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারে। কোথায় কার ওপর কে কীভাবে নির্ভর করতে পারে। অন্যভাবে বলা যায়, কোথায় কার ওপর কে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন অনেক কিছুই দেখার সুযোগ হয়েছে। অনেক দিন এক সাথে থেকে এবং পরস্পরের সাথে এমন বোঝাপড়া করেই একটা দল গড়ে উঠে।

bangladesh_cricket_18.03.2015

হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বে সেবারের দলটিও বিশ্বকাপে ভালো করেছিল। সে সময়ের অনেকের বিষয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলার সুযোগ থাকলেও সব কথা বলছিনা, বলার প্রয়োজনও নেই।

মিডিয়ার কল্যাণে একথা প্রায় সবারই জানা যে, মাশরাফিকে সবাই দলের ভেতর ‘পাগলা বলে ডাকতো। কেন বা কী কারণে এই ডাক শুরু হয়েছিল তা আমার জানা নেই। তবে, মাশরাফির ভেতর সত্যিই এক ধরনের পাগলামী সবার মতো আমিও দেখতে পেতাম। এই যে গত খেলায় ইংলেন্ডের সাথে জিতার পর, হঠাৎ করেই উপুড় হয়ে মাঠে শুয়ে পড়লো। সেটাকে পাগলামী না বলে, কী বলা যাবে! আর সেই পাগলামীতেই পেয়ে বসলো পুরো দলকে। একে একে প্রায় সবাই এসেই তার ওপর শুয়ে পড়লো। এমন পাগলামী, কার খারাপ লাগবে? কার খারাপ লাগার কথা? মাশরাফির ওপর চড়ে পুরোদলটাই যেন এক বিন্দুতে চলে আসলো।

প্রসঙ্গক্রমে একটা ঘটনা বলে নেই, (দিন তারিখ মনে নেই) ভারতের বিরুদ্ধে কোনো এক ম্যাচে মাশরাফি গালিতে ফিল্ডিং করছিল। হঠাৎ বুকের ওপরে চলে আসা একটা ক্যাচ, লাফিয়ে উঠে ধরতে হলো। এবং সফলভাবে সেটা ধরেও ফেললো। কমেন্ট্রিতে থাকা রবি শাস্ত্রি বলেই ফেললো, বাংলাদেশ আজ দারুণভাবে খেলায় ফিরে এসেছে ‘বিকজ অব দিস ম্যান, মাশরাফি (এর আগের খেলাটি মাশরাফি খেলেনি)। ফিল্ডিং এর টেকনিক আমি বুঝিনা, তবে আমি এটা বলতে পারি এভাবে বুকের ওপর নিয়ে বলটি না ধরলে বলের স্পিডের কারণে ক্যাচটি ধরা যেতোনা। আবার এটাও সত্যি, এটা অত্যন্ত বিপদজনক একটি ক্যাচ ছিলো। এটাতো পাগলামীই।

আমি ব্যক্তি মাশরাফির কথা বলছিনা। আমি একজন ক্রিকেটার মাশরাফির কথা বলছি। একজন পাগলা ক্রিকেটার- বাংলাদেশ দলের বর্তমান (ওয়ানডে) অধিনায়ক মাশরাফির কথা বলছি। পাগল না হলে, এতোবার দুই পায়ে-দুই হাঁটুতে অপারেশনের পরও কেউ এই খেলাটা খেলে? অনেক ভালো ভালো ক্রিকেটার আরো অনেক কম ইনজুরির পরও খেলা ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন, এমন ইতিহাস বহু আছে। খেলাটা নিয়ে মাশরাফির জেদ, এগ্রেশন, একাগ্রতা, ভালোবাসা সত্যিই পাগালামীর পর্যায়েই ফেলা যায়। মাঝে মাঝে ছোট খাটো এমন সব কাজ করে ফেলে যেসব আর দশজন হয়তো সহজে ভাবতোইনা। ইংল্যান্ডের সাথে জেতার পর সবাই যখন মাঠে মাশরাফির ওপর শুয়ে জয়ের উষ্ণতা অনুভব করছিল, মাশরাফি তখনো বসে নেই। এতোগুলো মানুষের চাপের নিচে শুয়ে থেকে মাশরাফি ভাবতে শুরু করে আরেকটা পাগলামীর। একটু পরই আমরা তা দেখতে পেলাম। পুরো বিশ্ব দেখতে পেলো। সারা পৃথিবীর দেশ প্রেমিকরা দেখতে পেলো। মাশরাফি মাথায় বাংলাদেশের পতাকা জড়িয়ে সাক্ষাৎকার দিতে হাজির। এমন পাগলামী কার না ভালো লাগবে?

পাগল, মাশরাফির পাগলামীই যেন আজ ছড়িয়ে পড়েছে, সারা বাংলায়। সারা পৃথিবীর বাংলাদেশিদের মনে। উত্তেজনাপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনালের আগে ভারত থেকে একটা বিজ্ঞাপণ বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে, বাংলাদেশকে অপমান করা হয়েছে। আর তাতেই পাগল সমর্থক, দেশপ্রেমীরা তেতে উঠেছে, জবাব দিয়েছে ৩০টিরও অধিক ভিডিও বানিয়ে। এটাকে পাগলামী না বলে কি বলা যায়! আর এমন পাগলামী কার না ভালো লাগে?

কাল সকালে খেলা মেলবোর্নে মুখোমুখি বাংলাদেশ-ভারত, ২০১৫’র বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। সেই খেলার জন্য সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশের মানুষ পাগল হয়ে আছে। সেই খেলাতে জয়ের জন্য। জিতে যদি যাই, পাগলামী কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আগামীকালই দেখা যাবে। শুনেছি, আমাদের বন্ধুরা আজ রাতে সিডনি থেকে ৫০ সিটের দুটি বাস ভাড়া করেছে মেলবোর্নের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। নিশ্চয়ই এমন করে যাদের দ্বারা যাওয়া সম্ভব সবাই মাঠে যাবে, সম্ভব না হলে ঘরে বসে বা একসাথে কোথাও বসে খেলা দেখবে। আমরা দেশে বসে অপেক্ষায় থাকবো। অপেক্ষায় থাকবো খেলা শেষের পাগলামীতে যোগ দেবার জন্য।

খেলাতে শেষ পর্যন্ত হারবে বা জিতবে, বলা কঠিন। মাঠে আমাদের পাগলা টাইগাররা তাদের যোগ্যতার সবচেয়ে সঠিক, সুন্দর, সামর্থের সর্বোচ্চটা প্রয়োগ করবে সেটাই আশা করি।
গোটা জাতি আরেকটা পাগলামীর অপেক্ষায়, রাত কাটাবো।

ডাঃ সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব
 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

আশাবাদী মনোভাব দীর্ঘায়ু প্রদান করে

আশাবাদী মনোভাব মানুষকে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগায়। অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও মনের জোর বজায় রাখে। বিপদে ধৈর্য প্রদান করে। সম্প্রতি গবেষকগণ এই দাবি করেছেন যে একজন আশাবাদী...

কারো সাথে ঠিকমতো কথা বলতে পারি না

সমস্যা: আমার বয়স ২৭ বছর। আমি ফ্রিল্যান্সিং কাজের সাথে যুক্ত আছি। আমি খুবই কনজারভেটিভ ফ্যামিলিতে বড় হয়েছি। বর্তমানে আমার কিছু সমস্যা হচ্ছে। কারো সাথে...

করোনা মহামারি ও নয়া স্বাভাবিকতা নিয়ে মনের খবর অক্টোবর সংখ্যা প্রকাশিত

দেশের অন্যতম বহুল পঠিত মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন মনের খবর এর অক্টোবর সংখ্যা। অন্যান্য সংখ্যার মত এবারের সংখ্যাটিও একটি বিশেষ বিষয়ের উপর প্রাধান্য...

ধর্ম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র

অনেকেই মনে করেন ধর্মীয় বিধি বিধান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মাঝে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং বিশেষ করে যারা ধর্মীয় জীবন যাপন করেন তারা উন্নত...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন