কোভিড ১৯ প্রেক্ষিতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত জরুরি: রোকসানা আক্তার

0
749
কোভিড ১৯ প্রেক্ষিতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত জরুরি: রোকসানা আক্তার
কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বিরাট পরিবর্তন এসেছে আমাদের জীবনযাত্রায়। পরিবর্তন এসেছে আমাদের দৈনন্দিন রুটিনে। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে কেমন কাটছে সাধারন মানুষের জীবনযাপন, কি ভাবছেন তারা; এসব জানার নিয়মিত চেষ্টা করছে মনের খবর। তারই ধারাবাহিকতায় মনের খবর এর সাথে কথা বলেছেন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রোকসানা আক্তার-

কোভিড-১৯ বর্তমানে আপনার জীবনে কি কি পরিবর্তন এনেছে?
রোকসানা আক্তার: কোভিড -১৯ বিশ্বব্যাপী মহামারীর কারণে প্রতিদিনের রুটিনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় প্রথম দিকে মনে হতো কোনো কাজই নেই। নানা চিন্তায় রাতে ঘুম আসতো না। বিদ্যালয়ে ক্লাস না হওয়ায় সিলেবাস শেষ করা নিয়েও চিন্তা ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনলাইন ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয় এবং সেই চিন্তারও অবসান ঘটেছে। এই মহামারীর সময়ে স্বজন হারিয়ে খুবই অস্থির একটা সময় পার করে এসেছি যা থেকে এখনও আমি বের হতে পারছি না।

এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে কোন ধরণের অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন?
রোকসানা আক্তার: ঘুম নিয়ে অনেক সমস্যা হয়েছে। কিন্তু সেটা এখন ঠিক হয়েছে। এই সময়ে বাবা মারা যাওয়ার কারণে আমি খুবই অসুস্থ হয়ে যাই। এখন মোটামুটি ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। অনলাইন ক্লাস আমাদের শিক্ষকদের জন্য নতুন একটা বিষয়। প্রথম দিকে জড়তা থাকলেও এখন অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

আপনার চোখে আপনার পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনে কি কি পরিবর্তন এসছে?
রোকসানা আক্তার: আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে এবছর এসএসসি পাস করেছে। পড়ালেখা না থাকায় ল্যাপটপে ও টিভি দেখেই সময় কাটিয়েছে। তবে এতে ওর অনেক নতুন কাজ শেখা হয়েছে। ছোট ছেলে জেলা ক্রিকেট টিমের অনূর্ধ্ব ১৪ দলে আছে। নিয়মিত মাঠে খেলতে যেত। কিন্তু করোনা কালে ঘরে রেখেছি। মাঠের খেলা বন্ধ থাকায় ঘরেই বসে মোবাইলে গেইম খেলে বা টিভি দেখে। সন্ধ্যার পর পড়ে। মোবাইলে গেইম খেলতে আমি কমই দেই। আমার হাসব্যান্ড শুরু থেকেই পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করতেন। রাতের বেশি সময় নামাজ পড়ে কাটাতেন। আস্তে আস্তে এই উদ্বিগ্নতা প্রকাশ কমছে।

সামাজিক কি কি পরিবর্তন দেখছেন?
রোকসানা আক্তার: সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে সবার প্রথমে বলবো আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানের আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন একেবারেই নেই। যা আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। এখন বিয়ে হয় খুবই সাদামাটা। অন্যান্য কিছু ব্যক্তিগত ও সামাজিক আয়োজনের প্রচুর অপচয় বন্ধ হয়েছে। সরকারি চাকুরীজীবি ও ব্যক্তিগত জীবনে সম্পদশালী ছাড়া বাকী অনেক পেশার আমার দেখা মানুষেরা খুব একটা ভালো নেই। চাকরী চলে গেছে। আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন অনেকে। শহরে থাকার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় গ্রামে চলে যেতে হয়েছে। যারা টিউশনি করে চলেন,তাদের অবস্থা খুবই নাজেহাল। মোট কথা আর্থিক স্বচ্ছলতা দিন দিন আগের চেয়ে কমছে। করোনার শুরু থেকেই অতি সচেতনতার কারণে অনেক বাসাবাড়িতে কাজের মানুষকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না । কাজ হারিয়ে এসব মানুষের অনেকেই শুরু থেকেই অসহায় হয়ে পড়েছেন।

এর ভবিষ্যত প্রভাব কি হতে পারে বলে মনে করেন?
রোকসানা আক্তার: এই মহামারীতে মানুষের মনের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরী হয়েছে তার প্রভাব খুব ভালো হওয়ার কথা না। অনেকের নানান শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর্থিক সংকটে পড়া মানুষজন নিজের অবস্থায় ফিরে যেতে যত বেশি সময় লাগবে, এই সংকট থেকে বের হতে ঠিক তত সময়ই লাগবে। যারা করোনা কালে স্বজন হারিয়েছেন তাদের অনেকেরই সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে গেল এক ধরনের মানসিক কষ্ট।

ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের এইসব পরিবর্তনের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব কি বলে মনে করেন?
রোকসানা আক্তার: ব্যক্তিগত পরিবর্তন একেক মানুষের একেকরকম প্রভাব পড়তে পারে। একজন পূর্ণবয়স্ক সুস্থ মানুষ খুব সহজেই নিজেকে আগের জায়গায় নিতে পারবেন বলে আমি মনে করি। শিশু, কিশোরদের পরিবর্তনের প্রভাব নির্ভর করে তার পারিবারিক পরিবেশের উপর। পরিবার সচেতন থাকলে খুব নেতিবাচক প্রভাবে তাদেরকে পড়তে হবে না বলে আমার বিশ্বাস। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কারণ খুব ব্যস্ত থাকা মানুষজন পরিবারের সবার সাথে সময় কাটাতে পেরেছেন। বিশেষ কোনো কারণ ও ক্ষেত্র ছাড়া পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্কে উন্নতি ঘটেছে এবং তা আরও সুদৃঢ় হবে – আমি মনে করছি। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বিয়েতে। আমার মনে হয় এটা অনেকেই ধরে রাখতে চাইবেন যা সবার জন্যই কল্যাণকর। নেতিবাচক প্রভাব হলো দারিদ্র্যতা বাড়বে। এতে চুরি, ডাকাতি বাড়তে পারে।

কোভিড ১৯ প্রেক্ষিতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কি মনে হয়েছে আপনার?
রোকসানা আক্তার: আমি আগেই বলেছি স্বজন হারিয়ে অনেক মানুষের সারাজীবনের সঙ্গী হয়েছে মানসিক কষ্ট। আমার পরিচিত এক পরিবারের কথা বলি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে এক বাবা হারানো সন্তান লাশ গোসল করানো সহ কবরে নেওয়ার কোনো মানুষ পায়নি। স্বেচ্ছাসেবকদের খবর দিয়ে সব সম্পন্ন করতে হয়েছে। ঐ সন্তান মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েছে। হয়তো সারাজীবন এই কষ্ট তাকে তাড়া করবে। এরকম মানুষের সংখ্যা কম না বর্তমানে। এছাড়া চাকুরী হারানো, ব্যবসা হারানোসহ অসহায় অবস্থায় পড়া মানুষদের স্হায়ী মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই আমি মনে করি কোভিড ১৯ প্রেক্ষিতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত জরুরি।

করোনায় স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here