মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home জীবনাচরণ অন্যান্য জীবাণুতত্ত্ব: অদ্ভুত মানসিক রোগ চিকিৎসা

জীবাণুতত্ত্ব: অদ্ভুত মানসিক রোগ চিকিৎসা

আচ্ছা কল্পনা করুন তো আপনি একটি হাসপাতালের ওয়ার্ডে প্রবেশ করেছেন আর সব রোগী আপনাকে দেখে হাসতে শুরু করেছে। আপনি অবাক হলেন। ভাবলেন- কী ব্যাপার, সবাই হাসছে কেন? আপনি একটু এগিয়ে গিয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করলেন এবং অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন আসলে কেউই হাসছে না। মূলত কারোরই দাঁত নেই, তাই এমন দেখাচ্ছে।
শুনতে কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে, তাই না? অথচ এই অদ্ভুত ব্যাপারটিই ঘটেছে নিউজার্সি স্টেট লুনাটিক হসপিটালে গত শতকের প্রথম ভাগে। ডা. হেনরি কটন (১৮৭৬-১৯৩৩) আসলে এই ঘটনার কারিগর। তিনি ছিলেন আমেরিকার একজন প্রভাবশালী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং নিউজার্সির ট্রেন্টন স্টেট লুনাটিক অ্যাসাইলামের পরিচালক। প্রখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট এমিল ক্র্যাপেলিন, ড. আলঝেইমার, ড. এডলফ মায়ারের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অল্প দিনেই বেশ খ্যাতি লাভ করেন তিনি। প্রবর্তন করেন মনোরোগ বিদ্যার কার্যকারণ সম্পর্কে নতুন এক তত্ত্বের। সেটি হলো ‘জীবাণুতত্ত্ব’।
তিনি বলতে থাকেন জীবাণুর দলই বিভিন্ন মানসিক রোগের কারণ। পাঠক চিন্তা করুন তখনো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়নি। সুতরাং কীভাবে জীবাণু দূর করা যায়? তবে খুঁজে বের করা হোক জীবানুর আস্তানা এবং সরিয়ে ফেলা হোক শরীর থেকে। প্রথমে আঘাত পড়ল দাঁতের ওপর, মনে করা হলো দাঁতই আসলে জীবাণুর সবচেয়ে বড় আধার। অতএব, ফেলে দাও দাঁত। একটি, দুটি করে আস্তে আস্তে সব দাঁত। আর তাতেই সেই অদ্ভুত হাস্য মুখাবয়ব। শুধু দাঁতের ওপর দিয়ে গেলে কথা হতো। দেখা গেল সব দাঁত ফেলে দেয়ার পরও কারো কারো সমস্যা থেকে যেত। সুতরাং খোঁজো জীবাণুর নতুন উৎস এবং ফেলে দাও। যেমন- টনসিল, পিত্তথলি, শুক্রাশয়, ডিম্বাশয়, প্লীহা এমনকি পাকস্থলী, বৃহদন্ত্র আর কত?
জোরপূর্বক রোগীদের অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে বলপ্রয়োগ করে অপারেশন করা হতো। যেহেতু তখনো অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না, তাই অপারেশন পরবর্তী জটিলতা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। এমনকি অনেকে মৃত্যুবরণও করত। তব মহাসমারোহে চলতে লাগল এই চিকিৎসা। কারণ এর মাধ্যমে অনেক মানসিক উপসর্গের আপাত উপশম লক্ষ্য করা গেল। গোটা আমেরিকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন ডা. কটন। বিভিন্ন মার্কিন স্টেটে এমনকি ইউরোপে ও বিভিন্ন সভা-সেমিনারেও তাঁর ডাক পড়তে লাগল এই চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করার জন্য।
তখন পরিসংখ্যানের আধুনিক উপস্থাপনা শুরু হয়নি। এর ফলে ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতিতে অনেক ফুলিয়ে-ফাপিয়ে বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করতেন তিনি। তিনি দাবি করেন তার চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগ নিরাময়ের হার ৮৫%, যা ছিল প্রকৃত অর্থেই অতিরঞ্জন। শুরুতে এড়িয়ে গেলেও এক সময় তিনি স্বীকার করেন, এই পদ্ধতিতে মৃত্যুর হার ৩০% পর্যন্ত হতে পারে। প্রকৃত অর্থে যা ছিল ৪৫%। সত্যি গা শিউরে ওঠার মতো ব্যাপার। বিপরীত স্রোতও ধীরে ধীরে বইতে শুরু করল। বিরুদ্ধ জনমতও শক্তিশালী হতে লাগল। এই ধন্বন্তরী চিকিৎসা সম্পর্কে চিকিৎসকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল। ফলে জোরালো হতে লাগল তদন্তের দাবি। হলোও তদন্ত। কিন্তু তা পরোপুরি আলোর মুখ দেখল না।
এরই মাঝে ১৯৩০ সালে অবসরে গেলেন ডা. কটন এবং ১৯৩৩ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন।
আসলে ওপরের ঘটনাটি ও সেই অসহায় সময়ের এক চুম্বক অংশ, যখন হন্যে হয়ে সবাই খুঁজেছে মানসিক রোগের কারণ ও কার্যকরী চিকিৎসা। যদিও তা অ্যান্টিসাইকিয়াট্রির আন্দোলনে রসদ জুগিয়েছে, তবু এ পথ ধরেই গুটিগুটি পায়ে আজকের অবস্থানে এসেছে সাইকিয়াট্রি।
লেখক: ডা. তৈয়বুর রহমান রয়েল
রেসিডেন্ট, এমডি (সাইকিয়াট্রি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল
বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

আমার স্বপ্নদোষ অনেক কম হয়

সমস্যা: আমার বয়স ১৮ বছর। আমি কখনো হস্তমৈথুন করিনি।আমার বন্ধুদের কাছে শুনেছি যে ওরা প্রায় সবাই এটা করে। আমিও চেষ্টা করেছি।কিন্তু সুবিধা করতে পারিনি।...

মাদকাসক্তি প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা

মাদকাসক্তি একটি রোগ। আরো স্পষ্ট করে বললে মাদকাসক্তি একটি মানসিক রোগ বা মস্তিষ্কের রোগ। মাদক সেবন করলে কি ছুসংখ্যক লোক মাদকাসক্ত হয় (আনু. ১০%)।...

বিষণ্ণতা বলতে আপনি যা ভাবছেন সেটা কি আদৌ সঠিক?

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিষণ্ণতা বিষয়ে সার্বজনীন যে ধারণা প্রচলিত আছে সেটি সঠিক নয়। বিষণ্ণতা শুধু মন খারাপ বা অসুখী জীবনযাপন নয়; বরং আরও বিষদ কিছু। বিশেষজ্ঞদের...

মন খারাপ হলে কি করবেন?

সব পরিস্থিতি আপনার অনুকূলে থাকবে এমনটা আশা করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু এমন মন খারাপ করা প্রতিকূল পরিবেশে, যখন আপনার আবেগ আপনার নিয়ন্ত্রণের...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন