মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home জীবনাচরণ অন্যান্য বিদেশে যাচ্ছেন, মনটা ভালো তো!

বিদেশে যাচ্ছেন, মনটা ভালো তো!

মাইগ্রেশন টু ক্যানাডা। ইমিগ্রেশন টু অস্ট্রেলিয়া। উচ্চশিক্ষার্থে আপনার সন্তানকে বিদেশে পড়াতে চান, আবার আপনার মেয়েকে প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে বিয়েও দিতে চান। মেয়ে বিদেশে স্থায়ী হবে, এ নিয়ে আবার টেনশনের শেষ নেই।

আমার এক পরিচিত পরিবার সিডনিতে সেটল হলো সম্প্রতি। সেজন্য চেষ্টা তদবির করেছে ৫/৬ বছর ধরে। এখানেও তারা সুপ্রতিষ্ঠিতই ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় সে প্রতিষ্ঠা অর্জন রীতিমতো অসম্ভব। প্রবাসে সেই অন্যরকম কর্মমুখর জীবনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে কিনা, তা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না।

বিদেশমুখী মাইগ্রেশন তো আছেই।এছাড়াও শ্রমজীবী মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সবই উন্নতর নিরাপদ জীবনের আশায়, কাজ যাই হোক, অধিক অর্থলাভের আশায়। তাদের মানসিক চাপ দুঃখকষ্ট নিয়ে আমরা কখনও কাউকে কোনো কথা বলতে শুনি না। তাই বলে তাদের এ ধরনের কোনো সমস্যা হয় না, এটা ভাবারও কোনো কারণ নাই।

একই বিষয় ঘটে যখন একটি মানুষ নিজ দেশে গ্রাম থেকে শহরে আসে। নদীতে ভেঙে নিয়ে গেছে জমি, রিক্ত নিঃস্ব হয়ে শহরে এসে ঠাঁই। এ যেন নিজ দেশেই শরণার্থীর জীবন!

সরকারি চাকরি করলে মোটামুটি সারা দেশ ঘোরা হয়ে যায়। শহরে হোস্টেলে-মেসে থেকে পড়াশোনা করা ছেলে-মেয়েরাও নতুন অপরিচিত পরিবেশে জীবন শুরু করে। তফাৎ এই, যখন তখন আসা যাওয়া যায়। কম খরচে ফোনে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলা যায়। গ্রামের পরিচিত দুই একজনের সঙ্গে দেখাও হয়ে যায়। নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে তেমন একটা বেগ পেতে হয় না।

রিকশাচালক মুটে-মজুর এমনকি ভিক্ষুক এরাও সিজনাল মাইগ্রেশনে অভ্যস্ত। ঈদ-পার্বন, রোজার সময় তাদের আয় বেশ জমজমাট।অনেকে আবার নিজ এলাকায় কাজ না থাকলেও শহরে আসে। মাস কয়েক থেকে আবার ফিরে যাওয়া।

আর যারা বিদেশ বিভুঁইয়ে যান, টিকে যেতে পারলে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু টিকতে না পারলে যত সমস্যা। তা শুধু নিজের জন্যই নয় পরিবারের তথা দেশেরও তখন লোকসান।

একজন ২৬-২৭ বছরের যুবক, বাবা-মা ধার দেনা জমি বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠালেন সংসারের দুর্দশা ঘোচানোর জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে ছেলে সেই শ্রমসাধ্য জীবনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারছিল না। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে দেশে হাজির। এখানে ছেলেটি কিছু করতে পারছিল না। বেকার, কোনো আয় রোজগার নেই। নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করল সে। ঘুম নাই, খাওয়া নাই। সারাদিন একা একা থাকে। এক পর্যায়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করল।

এক নবদম্পতি। স্বামীর সাথে গিয়ে উঠল লন্ডনে। প্রথমে শেয়ারিং বাসায় পরে নিজেদের ছোট বাসায়। প্রতিবেশীদের আচরণে তার মনে হলো মেয়েটি যেন শ্বশুড়বাড়িতে এসে পড়েছে। সবার বাক্যবাণে অতিষ্ঠ। মেয়েটির কাজকর্ম, চেহারা, পোশাক-আশাক নিয়ে কমেন্ট করতে সবাই যেন মুখিয়ে থাকে। টিটকিরি চলতে থাকে। ওদের আচরণে মনে হলো এতোদিনের বিনে পয়সার ব্যাচেলর কামলা ‘ছোট ভাই’কে বউটি ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। যখন তখন তাকে ডাকা যাবে না, বাইরে নিয়ে বের হওয়া যাবে না। আড্ডার সঙ্গীর অভাব পড়েছে।

মেয়েটি বেশ কম বয়সী। সারাদিন একা থাকে।অচেনা পথঘাট।দুজনের সংসারে ঘরকন্যার কাজ শেষে সারাদিন বাসায় বসে থাকা খুবই বিরক্তিকর। ওর স্বামী ওকে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিল। ক্রমেই মেয়েটির মধ্যে একা একা হাসা ,কথা বলা, কানে গায়েবী কথা শোনা নির্ঘুম রাত কাটানোর সমস্যাগুলো দেখা দিল। আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিল। শপিংমলের সহকর্মীরা ওর মধ্যে এই অসংগত আচরণ দেখতে পায় আর ওর স্বামীকে জানায়।

একজন শিক্ষার্থী বাইরে গেছে পড়াশোনা করতে। রেজাল্ট ভালো। মাদকের ছোবল ওকে ছাড়ে নি। পড়ার চাপ আর কিছু ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে সে এই বেপরোয়া সার্কেলের খপ্পড়ে পড়েছে। শেষে বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডারের রোগী হয়ে দেশে ফিরেছে।

এসব দৃষ্টান্ত অনেক পাচ্ছি। তার মানে সমস্যাগুলো বেশ হচ্ছে। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো এ সমস্যাগুলোকে আমরা ভালো করে আমলে নিচ্ছি না। দেশেও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে থেকে এ ধরনের সমস্যাগ্রস্তরা মারাত্মক অবহেলার শিকার হন। বিদেশে অবহেলাটা আরও বেশি। যারা শ্রম দিতে বিদেশ যান, আত্মীয় পরিজন নেই, তারা দীর্ঘদিন ধরে অন্যদের হাসিঠাট্টার শিকার হন।কী চিকিৎসা নিতে হবে, কার কাছে যেতে হবে, তার সুপরামর্শও মেলে না।

যে যায় শুধু তারই যে সমস্যা হয় তা নয়। যে যায় সে তার দেশে রেখে যাওয়া স্ত্রীকে নিয়ে যেমন সন্দেহ কাতরতায় ভুগতে পারেন, তেমনি দেশে যিনি থাকেন তিনিও ভোগেন। দেশে বউ রেখে আরেকটা বিয়ে করার নজির তো সব সমাজেই কমবেশি আছে। তাদের সন্তানেরাও বাবাকে মিস করে।

এই যেমন এ মাসের শুরুতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি ছেলে এলো পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে। হাঁটতে পারছিল না। কারণ কি? দেখা গেল প্রবাসী বাবার তিন মাস দেশে থাকার পর চলে যাওয়াটা ও মেনে নিতে পারে নি।

কেন এমন হয়?

যাদের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে তারা দেশে থাকতেই একটু একাকীত্বে ভোগেন। এ কারণেই দেশের বাইরে যাওয়ার আগ্রহটা তাদের বেশি দেখা যায়।

মাইগ্রেশনের প্রস্তুতি চলাকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিভিন্ন অর্থনৈতিক, মানসিক ও সামাজিক চাপের মধ্য দিয়ে যান। দালালের চক্র, পাসপোর্ট করা, ভিসা আদৌ হবে কিনা, ওখানে গিয়ে কাজের সংস্থান মনের মতো হবে কিনা এসব দোলাচল চলতে থাকে। মেডিকেল সার্টিফিকেটের রিপোর্ট সঠিক হবে তো? এভাবে চলতে থাকে ধৈর্য্য ধরার পরীক্ষা । যখন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়, তখন তাদের কাউকে কাউকে বিভিন্ন উদ্বেগজনিত রোগে ভুগতে দেখা যায়।

দেশের বাইরে যাওয়ার পর ভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর ব্যপারটা বড় হয়ে দাঁড়ায়। হীনমন্যতায় ভোগা, চাওয়া-পাওয়ার বিস্তর ফারাক, সামাজিক সাপোর্টের অভাব সবই মানসিক স্বাস্থ্যের বৈকল্যের জন্য যথেষ্ট। নতুন ভাইরাল রোগ পরবর্তী জেনারেশনের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসা নিয়ে জটিলতা

এবার দেশে পাওয়া প্রবাসী রোগীদের দেখার অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কথা বলি। বিদেশে হেলথ রেকর্ড ফাইল সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের সবারই কমবেশি ধারণা আছে। ওদের চিকিৎসা সেবা নিয়ে আমাদের গর্বের সীমা নেই। আমরা কেন ঐরকম পারি না বা করি না এসব ভেবে অনেকের কষ্টের সীমা নেই। কিন্তু ঐ রেকর্ডে যদি কখনও মানসিক রোগের রোগী হিসেবে নাম এন্ট্রি হয় তবে পরবর্তীতে তাদের কর্মক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া ভাষাগত সমস্যার জন্য মানসিক কষ্টগুলো নির্ণয় ও তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা হয় না। পারতপক্ষে প্রবাসীরা সাইকিয়াট্রিস্ট-এর কাছেও যায় না।

করণীয়

এসব সমস্যাকে আমরা মাইগ্রেশন সাইকোসিস / ডিপ্রেশন/ স্ট্রেস রিলেটেড ডিসঅর্ডার বলে থাকি। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসা যত দ্রুত সম্ভব করা উচিত। তা দেশে হোক বা বিদেশে। রেমিটেন্সের জন্য আজ আমাদের অর্থনীতি সাফল্যের মুখ দেখছে। আর এই সাফল্য যাদের হাত ধরে এসেছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য খেয়াল রাখা সবারই দায়িত্ব। এটা যেমন সংশ্লিষ্ট পরিবারের দায়িত্ব, তেমনি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। আরেকটি কথা, কারও সন্তান হয়তো মাদকাসক্ত কিংবা প্রেমে পড়েছে এমন কারও যাকে পরিবারের পছন্দ নয়, এক্ষেত্রে সন্তানকে বিদেশ পাঠান অনেকে। এমনও দৃষ্টান্ত আছে সন্তান আচার আচরণে সামাজিক ও স্বাভাবিক নয়। পিতামাতার পয়সা আছে। পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেশের বাইরে। এক্ষেত্রে আমার কিছু পরামর্শ আছে। মাদকাসক্ত সন্তান বিদেশ গেলেই মাদকমুক্ত হবে এমন কোনো পরিবেশ বলতে সেখানে কিছু নাও থাকতে পারে। সেসব রোগীদের ক্ষেত্রে দেখেছি সমস্যা গুরুতর পর্যায়ে নিয়ে সন্তান দেশে ফেরত এসেছে। দেশের সমস্যা দেশেই সমাধান করা উচিত।

সন্তান কিংবা আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখলে তার সুচিকিৎসার ব্যাপারে যত্নশীল হোন।আর দশটা রোগের মতো মানসিক সমস্যার গোড়াতে প্রকটভাবে তা পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে না। অনেকে জেনেও লুকিয়ে রাখেন।এক্ষেত্রে নানারকম অবহেলা আছে। শরীরে গুরুতর প্রভাব ফেলে সেসব রোগ শনাক্তে ও চিকিৎসায় পরিবার সদস্যরা যেভাবে উদযোগী হয় মনোরোগের ক্ষেত্রে সেটা হয় না। এই অবস্থায় বিদেশ বিভূইয়ে গেলে ভয়াবহ সমস্যাদির শিকার হয় সংশ্লিষ্ট মানুষটি।

মাইগ্রেশন থাকবেই। মানুষ কাজের জন্য, শিক্ষার জন্য, অধিক আয়ের জন্য উন্নত জীবন ও সুযোগ সুবিধার জন্য এক দেশে থেকে অন্য দেশে যাবে। বর্তমান বিশ্বে যেমন চলছে, আগামী পৃথিবীতে এই মাইগ্রেশন, চলাচল বাড়বেই। কিন্তু রোগের মাইগ্রেশন কল্যাণকর নয়। কল্যাণকর নয় রোগীর মাইগ্রেশন। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দরকার রোগী ও রোগের সুচিকিৎসা।

ডা.  সুলতানা আলগিন
মানসিক রোগ ও সাইকোথেরাপি বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

তরুণদের মাদকাসক্তির পেছনেও রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব: গবেষণা

ভালো দিকের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন খারাপ প্রভাবও  উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন গবেষণায়। তবে এবার একটি গবেষণা বলছে তরুণদের মাদকাসক্তির পেছনেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের...

সেক্স্যুয়াল মিথ ও যৌন স্বাস্থ্য

ভীমরতি শব্দের আভিধানিক অর্থ ভীষনরাত্রি । ‘ভীম’ মানে ভীষন আর ‘রতি’ মানে রাত্রি। ভারতীয় পুরাণ মতে বয়স সাতাত্তর হলে সাত মাসের সপ্তম রাত্রির নাম...

করোনা’কে অগ্রাহ্য বা অতি আতঙ্কে বিষণ্ণতা- উভয়ই ক্ষতিকর

অতি মাত্রার আতঙ্ক অনেক সময় মানুষকে বিবেক শূন্য করে দিতে পারে। তখন অনেকে আতঙ্ককে অগ্রাহ্য করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, আবার...

মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক রোগের চিকিৎসা

সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিপাদ্যে এবছর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়েছে। প্রতিপাদ্যে সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বলা হয়েছে; মানসিক রোগের কথা বলা...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন