মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home সামাজিক দূরত্ব এবং সম্পর্কের বোঝাপড়া

সামাজিক দূরত্ব এবং সম্পর্কের বোঝাপড়া

মহামারীতে সামাজিক দূরত্বের সাথেসাথে দূরত্ব বেড়েছে সম্পর্কগুলোর। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়াতে বন্ধু/বান্ধবীর সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই মুঠো ফোনটাই। আটকে পরেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে যার বাড়িতে এমনকি দেশের বাইরেও। দূরত্বের কারণে ভেঙে যাচ্ছে বন্ধুত্ব, প্রেমের বন্ধন, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিশ্বাস।

একটা সময় যোগাযোগ হত হাতে লেখা চিঠিতে। তারের টেলিফোনকে ছাড়িয়ে দেশে হাতে হাতে মোবাইল ফোন চলে এসেছে তাও প্রায় ২ দশক ধরে। পুরো পৃথিবীটাই যেন এখন হাতে থাকা স্মার্টফোনের ভিতর। আর তাই মনটাও যেন উড়ে বেড়ায় চেনা অচেনা রঙিন অলি গলিতে। সাময়িক ভাল থাকার জন্য কী হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবোধ? কমজোর হয়ে যাচ্ছে সম্পর্কের ভীত? শান্তি খুঁজতে গিয়ে নিজেরাই তলিয়ে যাচ্ছি নাতো দুর্গন্ধময় আবর্জনায়?

প্রিয় কারও থেকে দূরে থাকা সত্যিই কঠিন। এটি সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে ব্যক্তিকে আতঙ্কিত করে। যদি উভয়ই একে অপরকে সত্যিকার অর্থে ভালবাসি, একে অপরের যত্ন নেই তবে অবশ্যই আমরা দূরত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার এবং এটি কার্যকর করার উপায় খুঁজে বের করব।

দূরত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাধারণ দিকগুলো:

১। দৃষ্টির বাইরে-মনের বাইরে
সাধারণত দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে, দূরত্বের সাথে নিরাপত্তাহীনতা বোধ প্রতিদিন দুজনেরই সমস্যা তৈরি করে। কথায় আছে “চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল”। একে অপরের সাথে কথা বলার জন্য প্রতিদিন একটি ছোট অংশ বরাদ্দ করতে পারলে ভাল হয়। নিরাপত্তাহীনতা থেকে একটু পরপর নক দিয়ে বিরক্ত না করে একটা রুটিন করা যায়। তবে যে সম্পর্ক ৩ থেকে ৬ মাস দেখা না হওয়ার কারনে ভেঙে যেতে পারে তার গভীরতা আসলেই কতটুকু ছিল আরেকবার ভাবি।

২। একে অপরের উপর বিশ্বাস
এটি উপলব্ধি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে দূরত্বের সম্পর্ক বিশ্বাসের উপর বেঁচে থাকে। যদি একে অপরের থেকে দূরত্ব কয়েক মাইল হয় তবে একে অপরের জীবনে আমাদের ভূমিকা সম্পর্কে খুব স্পষ্ট বোঝাপড়া থাকতে হবে। আমি খুব দূরে থাকায় আমার গোয়েন্দাদের মতো আচরণ করা উচিত নয়। দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থার অভাব অন্যতম প্রধান সমস্যা যা বন্ধু/বান্ধবী বা দম্পতিদের শারীরিক দূরত্বের চেয়ে মানসিকভাবে বেশি ক্ষতি সাধন করে।

৩। যোগাযোগ
যোগাযোগের অভাব সম্পর্কের অন্যতম সাধারণ সমস্যা। পুরো বিশ্ব যেখানে দূরত্ব মেনে জীবন যাপন করছে সেখানে এই সমস্যাটি একান্ত ব্যক্তিগত ভাবে না দেখে সমাধানের পথ হিসেবে সৃষ্টিশীল কিছু করা যেতে পারে। দুজন একে অপরের সাথে কতটা ভাল যোগাযোগ করি তার উপর ভিত্তি করেই একটি ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠে। এমন একজন আছেন যে ভয়েস শোনার জন্য, একটু দেখার অপেক্ষা করছে হোক নয়া সেটা ভিডিও কলে। দিন শেষে একে অপরের সাথে মৃদু সুরে কথা বললে সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যেতে সাহায্য করবে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এতটাই নিরাপদ বোধ হবে যে ঘুম আরও আনন্দময় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। এক সাথে স্ক্রিন শেয়ার করে পছন্দের নাটক, সিনেমা দেখা যেতে পারে।

৪। প্রশংসা হতে পারে একটি সুপার-টনিক
প্রতিটি মানুষের অনুভূতিগুলোর একটি প্রধান সংবেদনশীল চাহিদা হল তা ছোট বা বড় নির্বিশেষে তাদের সমস্ত কাজের জন্য প্রশংসা চায়। জীবনের চাহিদা মেটাতে যখন আমি আমার বন্ধু/বান্ধবী/স্বামী/ স্ত্রী থেকে দূরে থাকি, তখন একে অপরের প্রতিটি কাজকে প্রশংসা করতে পারি। তিরস্কার না করে, ভুল গুলোকে ইতিবাচক ভাবে ধরিয়ে দিতে পারি।

৫। সততার সাথে সম্পর্ক
আমরা যখন শারীরিকভাবে একে অপরের থেকে দূরে থাকি, তখন তৈরি হওয়া মানসিক অশান্তি সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততা নিয়ে সন্দেহ করতে পারে। আমার মন যখনই এই “অবিশ্বাস” মোডে প্রবেশ করবে তখনই এটিকে অবিলম্বে বন্ধ করতে চেষ্টা করতে হবে। এ সময়টায় একদম নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে কিন্তু একটি সম্পর্কে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার পরও ২য়, ৩য় সম্পর্ক গড়ে তোলা কি আদৌ ন্যায় সংগত! সম্পর্ককে শ্রদ্ধা করা, সৎ থাকা, মানুষটার প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র দূরত্বের জন্য সম্পর্ক ভেঙে দিতে চাইলে বোঝাপড়ার মাধ্যমে শেষ করে এবং শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। এই স্ক্রিনশটের যুগে নিজেদের মধ্যে যা হয় তা ৩য় বাক্তিকে মেসেজ আকারে না দেয়াই ভাল। সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও বাক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করুন।

৬। অনুভূতি প্রকাশ
দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্ক ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি প্রধান কারণ হল অনুভূতি একেবারে প্রকাশ না করা। দূরত্বে বসবাসকারী দম্পতিরা যখন প্রকাশ করেন না যে তারা একে অপরকে মিস করছেন, তখন তারা সম্পর্কের তাল হারিয়ে ফেলেন। যখন আমি আমার সঙ্গীকে বলব যে আমি তাকে ভীষণভাবে মিস করেছি সে অনুভব করে যে আমার ভালবাসা এখনও একইরকম আছে। আমরা যদি অনুভূতি প্রকাশ্যে জানাতে চেষ্টা করি এবং অপর পক্ষ কেও জানাতে দেই যে একে অপরের সাথে যে ছোট ছোট খুনছুটি, দীর্ঘ হাঁটাচলা, কথা বলা মিস করেছি। চ্যাটিং-এর চেয়ে কথা বলে যে কোন সমস্যা সমাধান দ্রুত সমাধান হয়। আবেগের প্রকাশ শুধু লিখে সঠিক ভাবে নাও প্রকাশ হতে পারে। এতে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে।

৭। উপহার
দূরে থেকেও উপহার পাঠিয়ে অবাক করে দিয়ে ভালবাসা প্রকাশ করা যায়। একটি সুন্দর গ্রিটিং কার্ডে প্রলিপ্ত শব্দগুলির চেয়ে এই পৃথিবীতে আর কী মূল্যবান হতে পারে? দেয়া যেতে পারে অনলাইন শপের মাধ্যমে উপহার। পাঠাতে পারেন নিজের ১ মিনিটের ভিডিও ক্লিপে গান, কবিতা কিম্বা শুভেচ্ছা বানী।

৮। প্রতিক্রিয়া
মনে রাখতে হবে যে আমরা উভয়ই শারীরিকভাবে বেশ দূরে। আমি যে পরিস্থিতিতে রয়েছি অন্যপ্রান্তে সবকিছু আলাদা হওয়াই স্বাভাবিক। সম্পর্ক বিশৃঙ্খলাবদ্ধ না হতে পরিস্থিতিটি বুঝে সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানান।

৯। উদ্বেগ কখনই প্রতিষেধক নয়
সঙ্গী থেকে দূরে থাকা এমনিতেই মানসিক সমস্যাগুলোর দিকে পরিচালিত করে এবং তা হতাশায় পরিণত হতে পারে। বাড়তে পারে একাকীত্ববোধ, বিষণ্ণতা। এটি সম্পর্কটিকে আরও আবেগীয়ভাবে ভেঙে আরও খারাপ করে দিতে পারে। এছাড়াও, মনে রাখবেন যে কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলির জন্য উদ্বেগ কখনই প্রতিষেধক নয়। আমার নিজেরও ভুল হতে পারে। ভেবে দেখুন নিজেকে শুধরে নেবার সুযোগ রয়েছে এখনও। কিছুই ভাল লাগছেনা, অস্থির লাগছে এসব না ভেবে অতিতের আনন্দের স্মৃতি মনে করুন বারবার।

১০। ধৈর্য্য ধরা
অধৈর্য হওয়া কেবল একটি দূরত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়, সাধারণ জীবনেও খুব খারাপ সমস্যা। জীবনের চাহিদা মেটাতে একে অপরের থেকে দূরে বসবাসরত বন্ধু/বান্ধবী/দম্পতিরা যখন মেসেজ, ইমেইল বা ফোন কলগুলির তৎক্ষণাৎ উত্তর না পান তখন আরও অধৈর্য হয়ে যান। অন্য পক্ষ থেকে কোনও তথ্য না পাওয়ার ব্যর্থতা বাক্তিকে হতাশ করে দেয়। একটি জটিল ধাঁধা তৈরি করার পরিবর্তে অল্প কিছুটা ধৈর্য অদৃশ্য বন্ধনগুলি ধরে রাখবে। মতের অমিল হয়েছে বলে কুইক সল্যুশন হিসেবে বিচ্ছেদকে বেঁছে না নিয়ে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে ডীপ ব্রেথিং অনুশীলন করতে পারি।

আপনি এই লেখাটি ধৈর্য সহকারে পড়েছেন কারণ আপনি সত্যিই আপনার সম্পর্কটিকে এগিয়ে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। আপনার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই ধৈর্য বজায় রাখুন।

সামাজিক দূরত্ব ভেঙে দেখা করলে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ব্যক্তি ও পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন সেই সাথে সারাক্ষণ করোনায় ইনফেক্টেড হবার ভয়। এ সময় সম্পর্ক না ভেঙে বরং আপনজনের পাশে থাকি, পাশে রাখি। আমরা যদি সমস্যা নিয়েই পড়ে থাকি তবে এর মধ্যে যে সমাধান রয়েছে তা আমরা দেখতে ব্যর্থ হই। একে অপরের প্রতি দৃঢ়-বোঝাপড়া থাকলে জীবন অনেক বেশি উন্নত হতে পারে। যদি আপনার ভালবাসা এবং বন্ধুত্ব সত্য হয়, দূরত্ব কেনো, কিছুই আপনাকে আলাদা করতে পারবে না।

করোনায় স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

ফারজানা ফাতেমা (রুমী)
Psychologist, Bangladesh Early Adversity Neuro imaging Study, icddr, b. Mental Health First Aider, Psycho-Social counselor. BSC & MS in Psychology, University of Dhaka; Masters in Public Health, State university of Bangladesh.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

কোভিড ১৯ প্রেক্ষিতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত জরুরি: রোকসানা আক্তার

কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বিরাট পরিবর্তন এসেছে আমাদের জীবনযাত্রায়। পরিবর্তন এসেছে আমাদের দৈনন্দিন রুটিনে। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে কেমন কাটছে সাধারন মানুষের জীবনযাপন, কি...

শাস্তি নিশ্চিত হলেই কি ধর্ষণ কমে যাবে: অনলাইন জরিপ

ধর্ষণ সহ নারী নির্যাতনের ঘটনা যেন প্রতিনিয়ন বেড়েই চলেছে আমাদের দেশে। কোনোভাবেই যেন তা রোধ করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি জন দাবীর মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ...

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা। সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে বিভিন্ন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এই স্টিগমার পরিমান ৩৮-৯৮% পর্যন্ত দেখা গেছে। ২০১৯...

ইম্পোস্টার সিনড্রোম: নিজেকে অযোগ্য মনে করার রোগ

ইম্পোস্টার সিনড্রোম হলো এমন এক ধরণের মানসিক অবস্থা যে একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা বা অর্জনকে সন্দেহের চোখে দেখে ও নিজেকে অযোগ্য মনে করে। মনে...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন