মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা: ওজন বাড়ার ভয়

অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা: ওজন বাড়ার ভয়

এটি এক ধরণের ইটিং ডিস্‌অর্ডার বা ভোজন বিকার যার ফলে রোগীর বিকৃত দেহ, অস্বাভাবিক কম ওজন এবং ওজন বেড়ে যাওয়ার চরম আতঙ্ক লক্ষ করা যায়। অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হবার কারণেই সাধারণত এই সমস্যার উৎপত্তি হয়। তাঁরা মনে করেন যে ওজন কমিয়ে রোগা হতে পারলে তাঁদের জীবনে আনন্দের শেষ থাকবে না। সেইজন্য তাঁরা ভীষণ কম খাবার খান, কখন কখন একদমই না খেয়ে থাকেন এবং পরবর্তীকালে খাওয়াই বন্ধ করে দেন। এবং যখন খান তখন অত্যন্ত অপরাধবোধের সাথে অতি অল্প পরিমাণে খান। সময়ের সাথে সাথে এই নিয়ন্ত্রণ নেশার মত হয়ে দাঁড়ায়। বয়স ও উচ্চতার হিসেবে তাঁদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়েও কমে যায়। তাঁদের চেহারা ধীরে ভেঙ্গে যেতে থাকে কিন্তু তাঁরা মনে করেন যে এখন তাঁরা মোটাই আছেন।
অ্যানোরেক্সিয়া কোনও জীবনশৈলী না। নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগার দরুন তৈরি এক গুরুতর অসুখ। তবে সুচিকিৎসায় সুন্দর সাস্থ ফিরে পাওয়া সম্ভবপর।

অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার রোগীরা নিজেদের স্বভাব এবং চালচলন অন্যদের থেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। যদিও প্রচুর শারীরিক এবং আচরণগত পরিবর্তন তাঁরা লোকাতে পারেন না।

শারীরিক পরিবর্তন যেমনঃ

  • অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া এবং ভীষণ রোগা লাগা।
  • মাথা ঘোরা এবং অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা।
  • অকারণে শীত করা
  • চুল পড়ে যাওয়া, চামড়া শুকিয়ে যাওয়া।
  • অনিয়মিত ঋতুচক্র বা বন্ধ হয়ে যাওয়া।

আচরণগত পরিবর্তন যেমনঃ

  • ওজন এবং খাদ্যে ক্যালরি নিয়ে দুশ্চিন্তা, বারংবার আয়নায় নিজেকে দেখা ও ওজন মাপা।
  • খিদে নেই বা খেয়ে নিয়েছি বলে পরিবারের লোকজন ও বন্ধুবান্ধবের সাথে না খাওয়া।
  • খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
  • অতিরিক্ত ব্যায়াম এবং জোলাপ সেবন করে রোগা হবার চেষ্টা।
    এই রোগের সঠিক কারণ না জানা গেলেও নানান গবেষনায় দেখা গেছে যে মানসিক, জৈবিক ও পরিবেশগত কারণের সংমিশ্রণ এই রোগের জন্ম দেয়। ডিপ্রেশন ও অ্যাংজাইটির সাথে যুঝে উঠতে গিয়েও অনেকে এই পথে এগিয়ে যান। এমনকি ওসিডি থেকেও খাওয়া দাওয়া নিয়ে বাতিক দেখা দেয়।  কোনও কোনও ক্ষেত্রে নিখুঁত হবার চেষ্টা এবং অতিমাত্রে সংবেদনশীল মানসিকতার কারণেও এই রোগ হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় মস্তিষ্কে সেরোটিনিনের মাত্রার সাথে এর সম্পর্ক দেখা গেলেও জিনগত কোন কারণ এখনও খুঁজে না পাওয়া যায়নি।
    ছোট বাচ্চারা অনেক সময় ওজন নিয়ে খেপাবার কারণে বা বন্ধুদের পরামর্শে খাওয়া দাওয়া কমিয়ে দেয়। সিনেমা বা টিভিতে রোগা হওয়াকে যেভাবে সৌন্দর্য্যের মাপকাঠি দেখানো হয়, তাও এইরকম মানসিকতার জন্ম দিতে পারে।

    যেহেতু এই রোগের প্রভাব শরীর ও মন উভয়ের ওপরেই পড়ে তাই চিকিৎসা পদ্ধতিও নানান রকমের হয়। যদি অ্যানোরেক্সিয়ার রোগী চূড়ান্ত অপুষ্টিতে ভোগেন তবে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে যদি ওজন স্বাভাবিক থাকে তাহলে হাসপাতালে ভর্তি না হয়েও চিকিৎসা করানো যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারেঃ

    • প্রথমেই, খাবার না খাওয়ার জন্যে হওয়া গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা করা হয়।
    • তারপর তাঁদেরকে পুষ্টিকর উপাদান দেওয়া হয়ে যাতে তাঁরা শরীরের স্বাভাবিক ওজন ফিরে পেতে পারেন।
    • বাড়তি ওজনের ভয় কাটাতে কাউন্সেলিং।

    বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের একটি দল মিলে একসাথে এই চিকিৎসা গুলি চালান। ক্ষেত্রবিশেষে রোগীর পরিবারের লোকজনেরও সহায়তা লাগে।

    আপনার পরিচিত কারোর মধ্যে যদি অ্যানোরেক্সিয়ার উপসর্গ দেখতে পান তবে সবার আগে তাঁদের চিকিৎসা করাতে রাজি করান। যেহেতু তাঁরা নিজেদের সমস্যাটা মানতে চাইবেন না তাই আপনাকে খুব শান্ত হয়ে ধৈর্য্য সহকারে বোঝাতে হবে। জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না।  যদি আপনার পরিবারের কোন সদস্য অয়ানোরেক্সিয়াতে ভোগেন তবে বাকিরা যাতে স্বভাবিক খাওয়া দাওয়া চালিয়ে যায় সেদিকে লক্ষ রাখবেন। চিকিৎসা চলাকালীন সেটা উদাহরণ হিসেবে কাজে লাগে।

    অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার চিকিৎসা বহুদিন ধরে চলতে পারে, কাজেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া দাওয়া চালিয়ে যাওয়া খুবই গুরুত্বপুর্ন। নিজেকে পরিবার ও বন্ধুদের কাছে থেকে সরিয়ে নেবেন না; তাঁদের সঙ্গ আপনার মন ভাল রাখতে সাহায্য করবে। অসুখ সম্বন্ধে পড়াশুনা করলে আপনি বুঝবেন যে ওজন সংক্রান্ত এই অহেতুক ভয় একটা অসুখ মাত্র। অ্যানোরেক্সিয়া রোগীদের সংগঠনে যোগদান করুন। ঘন ঘন ওজন মাপবেন না। নিজের প্রিয়জনের কথায় বিশ্বাস রেখে চললে খুব শীগগিরই আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

    গবেষণায় দেখা গেছে যে পশ্চিমি সভ্যতায় খাদ্যাভ্যাস খুব খারাপ। যদিও অন্যান্য সভ্যতায় ও এটি দেখা যায়। ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে উপসর্গ গুলি একটু ভিন্ন ভাবে দেখতে পাওয়া যায়। রোগা হবার জন্যে নয়, অনেক সময় বিভিন্ন সামাজিক কারণে না খেয়ে থাকার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ আমাদের দেশে বাবা মার চাহিদা মেটাতে মেটাতে বা পড়াশুনার চাপে বাচ্চারা খাবার সময় পায় না। ধীরে ধীরে সেটাই অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। একেই এটিপিক্যাল অ্যানোরেক্সিয়া বলে।
    মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ পেতে দেখুন: মনের খবর ব্লগ
    করোনায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক টেলিসেবা পেতে দেখুন: সার্বক্ষণিক যোগাযোগ
    করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
    করোনায় সচেতনতা বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও বার্তা দেখুন: সুস্থ থাকুন সর্তক থাকুন


     

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

সামাজিক দূরত্বে মানসিক বিড়ম্বনা এবং করণীয়

কোভিড-১৯ মহামারীর এই দুঃসময়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে আমরা সবাই বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। আমরা যেন এটা ভুলেই গেছি যে, সামাজিক দূরত্ব...

কোভিড ১৯ প্রেক্ষিতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত জরুরি: রোকসানা আক্তার

কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বিরাট পরিবর্তন এসেছে আমাদের জীবনযাত্রায়। পরিবর্তন এসেছে আমাদের দৈনন্দিন রুটিনে। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে কেমন কাটছে সাধারন মানুষের জীবনযাপন, কি...

শাস্তি নিশ্চিত হলেই কি ধর্ষণ কমে যাবে: অনলাইন জরিপ

ধর্ষণ সহ নারী নির্যাতনের ঘটনা যেন প্রতিনিয়ন বেড়েই চলেছে আমাদের দেশে। কোনোভাবেই যেন তা রোধ করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি জন দাবীর মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ...

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা। সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে বিভিন্ন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এই স্টিগমার পরিমান ৩৮-৯৮% পর্যন্ত দেখা গেছে। ২০১৯...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন