মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home মায়ের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ যখন হিংস্রতায়

মায়ের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ যখন হিংস্রতায়

পৃথিবীর সবচাইতে দামি ভালোবাসার নাম মায়ের প্রতি ভালোবাসা- যার সাথে কোন কিছুরই তুলনা হয় না। মানুষ জন্মগত কারণেই মা’কে অচ্ছেদ্য ভাবে ভালোবাসে।

হয়তো পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষই বলবে সবচাইতে বেশি ভালোবাসি মা’কে অথবা সন্তানকে। ব্যতিক্রমও আছে, এবং থাকতেই পারে। তবে আজকে জানার বিষয় মায়ের প্রতি ভালোবাসার রূঢ় বা হিংস্র দিক, যা আমাদের আশেপাশে অহরহ আমরা দেখতে পাই কিন্তু বুঝতে পারি না কি করবো?

একটু খোলাসা করে এই ভালোবাসার রূপটি বর্ণনা করা যাক-
ধরুন মা-ছেলে একসাথে আছে; ছেলে সর্বদা মা’র সাথে রূঢ় ভাষায় কথা বলছে, রাগারাগি করছে, চিৎকার চেঁচামেচি করছে, সব বিষয়ে মাকেই দোষারূপ করছে এবং মায়েরই সাহায্য চাইছে এবং নিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুখে বাজে ভাষার ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। আবার এই ছেলেই মা যখন বাসার বাইরে যায়, তখন সে মোটেই ভালো অনুভব করে না, মা অসুস্থ হলে অশান্ত হয়ে যায়, অস্থির হয়ে যায়, নিরবে হয়তো চোখের পানিও ফেলে।

কিছুদিনের জন্য মা কোথাও গিয়ে থাকলে বারবার মা’কে ফোন দেয় এটা বলার জন্য যে- ‘মা তুমি কবে আসবে?’ নিজে কোথাও গেলে মা’র সাথের বিচ্ছিন্নতার কষ্ট পেতে থাকে, ছটফট করতে থাকে মায়ের মুখটা একবার দেখার জন্য, মায়ের গায়ের গন্ধ পাওয়ার জন্য, মায়ের শাড়ির স্পর্শ পাওয়ার জন্য।

এই সম্পর্কে মায়ের রূপটিও হয় অদ্ভুত। সর্বংসহার মতো ছেলের সমস্ত অত্যাচার সহ্য করতে থাকেন, ছেলের সমস্ত চাহিদার প্রতি অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেন, ঠিক একই রকম অনুভব করে বিচ্ছিন্নতায়, যেমনটি ছেলে অনুভব করে। আবার দেখা যায় কখনও কখনও ছেলের অত্যাচারে সে নিজেও ক্ষেপে উঠে বকাঝকা শুরু করেন। যখন মা বকাঝকা শুরু করেন তখন আবার ছেলে চুপ হয়ে যায়। কি আশ্চর্য এক রসায়ন!

সাধারণত অত্যন্ত আদরের ছেলে অথবা একমাত্র ছেলের ক্ষেত্রে এই দৃশ্যটি বেশি প্রযোজ্য। এই সন্তানদের কাছে মা হচ্ছে সবচাইতে ভালোলাগার আধার, আবার সবচাইতে বেশি রাগ, বিরক্তি ও দুঃখেরও আধার। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বলা যায়, ছেলেটির চরম মাত্রায় প্রত্যাশা কাজ করে মায়ের কাছে। অর্থাৎ পৃথিবীর সমস্ত সমস্যা মা সমাধান করবে, মা নিজের থেকেই সবকিছু বুঝে নিবে এবং কিছু বলতে হবে না। মা তার মুখ দেখে পড়ে নিবে তার ছেলে কেমন অনুভব করছে, কি বলতে চাইছে, কি করতে চাইছে ইত্যাদি। আবার সবচাইতে বেশি আদর অনুভব করে তার এই ‘মা’ নামক খেলার পুতুলটির প্রতি। মায়ের প্রতি ভালোবাসার এ এক অদ্ভুত রসায়ন।

এই সম্পর্কের দু’জনের মধ্যে একটি অদ্ভুত রকম বাঁধন রয়েছে যা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক নয়। যেমন- ছেলেটি প্রাপ্ত বয়ষ্ক অবস্থাতে এ ধরনের আচরণ করলে তাকে বলা যায় যে, সে মোটেই মানসিক ভাবে প্রাপ্ত বয়ষ্ক হয়নি। অর্থাৎ সে মানসিক দিক থেকে অপরিপক্ক। তার আচরণের ধরণ বলে দিচ্ছে, সে যথেষ্ট পরিমাণ হিংস্র আচরণে অভ্যস্ত হয়েছে যা কিনা তার মায়ের নিরব অনুমোদনে বৃদ্ধি পেয়েছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের যোগাযোগ পদ্ধতিকে বলা হয় প্যাসিভ এগ্রেসিভ কমিউনিকেশন ওয়ে (passive aggressive communication way)।

মা ছোটবেলা থেকেই এই সন্তানটিকে সঠিক উপায়ে যোগাযোগ শেখাতে অথবা পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলা যায়। এর কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মায়ের ছেলের প্রতি প্রচন্ড মনের দূর্বলতা এবং সীমাহীন ভালোবাসাকেই দায়ী করা যায়। তবে এ ধরনের সম্পর্ক যত বড় হতে থাকবে অর্থাৎ ছেলের বয়স বাড়তে থাকবে তার এই হিংস্র ভালোবাসার পরিমাণও বাড়তে থাকবে, যার ফলাফল হয় খুবই নেতিবাচক।

মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বলে যে বিষয়টি প্রচলিত তা এই ছেলের ভেতরে খুঁজেই পাওয়া যায় না। মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং মায়ের প্রতি দায়িত্বের অবহেলাও অহরহ ঘটে থাকে। ছেলের এই রূঢ়তা মায়ের প্রতি ভালোবাসাকে কখনও সামনে আসতে দেয় না। এই ভালোবাসায় না আছে নমনীয়তা, না আছে সৌন্ধর্য্য, না আছে সহমর্মিতা। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্যি এরা দুজন দুজনকে ভীষণ ভাবে অনুভব করে এবং বাইরের মানুষের পক্ষে এর অর্থ বোঝা সম্ভব নয়।

অনেক ধরনের ভালোবাসার রূপ আছে, যাদের মধ্যে পসেসিভ লাভ (possessive love) বলে একটি ধরণ বিদ্যমান। ‘পসেসিভ লাভ’-এ ‘অধিকার বোধ’ বিষয়টি মুখ্য থাকে। শ্রদ্ধা বা সম্মানবোধ, পারষ্পরিক অনুভূতির প্রতি সচেতনতা- এই বিষয়গুলো পসেসিভ লাভ-এ থাকে না। বলা যায়, এই ছেলের হিংস্র ভালোবাসাটি অনেকটা এই ধরনের ভালোবাসায় পড়ে। আর মায়ের প্রতি ভালোবাসার কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলা যায়, পৃথিবীতে একমাত্র মায়ের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা তা শর্তহীন বা আনকন্ডিশন্যাল।

অর্থাৎ কোন চাওয়া-পাওয়ার প্রশ্নের অতীত এই ভালোবাসা। কোনো কারণ বা যুক্তি ছাড়াই এই ভালোবাসা, কোনো সীমারেখা ছাড়াই এই ভালোবাসা, চরম ধৈর্য্য, ত্যাগ, কষ্ট ও পরিশ্রমের বিনিময়ে মা তার সন্তানকে আগলে রাখেন, বড় করে তোলেন শুধুমাত্র এই ভালোবাসার কারণে। তাই সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসায় কোনো ভুল বা দোষ থাকতে পারে না।

তবে সন্তানের আচরণ ছোট বেলা থেকেই সঠিক পথে পরিচালনা করা তার জন্য একটি বিশাল দায়িত্ব, যদি সে তার ভালোবাসার ছায়ায় এই দায়িত্বটি অবহেলা করেন অথবা বুঝতে না পারেন, তবে এটি হবে মায়ের জন্য বিশাল ভুল।

সময় থাকতেই অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই সন্তানের আচরণ তৈরী করা, আদব-কায়দা, রীতিনীতি, বিবেক বোধ, শ্রদ্ধা সম্মান করা, সহানুভূতিশীল হওয়া, সহমর্মী হওয়া- এ বিষয়গুলোর বীজ বপন করতে হবে। নতুবা সন্তান বড় হয়ে গেলে আর শেখানোর সুযোগ থাকবে না। ভুল শিক্ষা কেবল ভুল ফলাফলই আনতে পারে। আচরণের সৌন্ধর্য্য সবাই বাইরে থেকে দেখতে পায়, আবার আচরণের কদর্যের কারণেই সবার অপছন্দ ও ঘৃণার কারণ হয়।

আপনার সন্তানের সুন্দর আচরণ, মা হিসেবে আপনার জন্যই সবচাইতে বেশি আনন্দ ও সুনাম বয়ে আনবে। আর এই সুন্দর আচরণগুলো যদি মায়ের প্রতি হয় তবে ভেবে দেখুন তো নিজেকে কতখানি সফল মা হিসেবে দেখতে পাবেন?

ভালোবাসা একটি পরিপূর্ণ ইতিবাচক বিষয়। তার মাঝে হিংস্রতা আসতে পারে না। যদি এসে থাকে তবে এই ভালোবাসাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।

মানিসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ পেতে দেখুন: মনের খবর ব্লগ
করোনায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক টেলিসেবা পেতে দেখুন: সার্বক্ষণিক যোগাযোগ
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
করোনায় সচেতনতা বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও বার্তা দেখুন: সুস্থ থাকন সর্তক থাকুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

ধর্ম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র

অনেকেই মনে করেন ধর্মীয় বিধি বিধান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মাঝে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং বিশেষ করে যারা ধর্মীয় জীবন যাপন করেন তারা উন্নত...

আমাকে তোমার মনের কথা বলতে পারো

পরিস্থিতি বুঝে সঠিক কাজটি করা এবং যথাযথ কথা বলা একজন ভাল বন্ধু বা সঙ্গীর লক্ষণ। কাছের মানুষের বিপদে আমরা কোনভাবেই স্থির থাকতে পারিনা। একজন সহানুভূতিশীল...

হাইপোগোনাডিজম: পুরুষের ক্লান্তি-অবসন্নতা-বিষণ্ণতার কারণ

আপনি কি ক্লান্ত? অবসন্ন? বিষণ্ন? যৌন জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন? এর মূলে থাকতে পারে রক্তে টেসটোসটেরন হরমোনের স্বল্পমাত্রা বা হাইপোগোনাডিজম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,...

উদ্বেগ কিংবা আতঙ্কে হৃদস্পন্দন কমাতে সহায়ক পরামর্শ

মানসিক চাপ, অস্বস্তিতে কমবেশি সবাই ভোগেন। তবে তা অসুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছালে প্রভাবিত হয় দৈনন্দিন জীবন। প্রচণ্ড ভয়, দুশ্চিন্তা থেকে শুরু করে বুক দপদপানি, হৃদস্পন্দনের গতি...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন