মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home লাল মিয়া টি স্টল

লাল মিয়া টি স্টল

এক.
লাল মিয়াকে যখন নিয়ে আসেন তখন তার হাত পা শিকল দিয়ে বাঁধা, বড় বড় দুটো তালা। এতো বড় তালা খুব কম যায়। ঘোরতর মানসিক রোগীদের যাদের আমরা সাধারণত লে-ম্যান দের ভাষায় ‘পাগল’ বলি, তাদের যে শিকল দিয়ে বাঁধা হয় সেটা থাকে খুব শক্ত কিন্তু তালা গুলো থাকে ছোট। লাল মিয়ার ঘাড় মুড়িয়ে হাত ও পায়ে বাঁধা শিকল ও তালা দুটো’ই যথেষ্ট বড়। সব আত্মীয় স্বজন চার পাশ ঘিরে আছেন তার, পাছে ভায়োলেন্ট হয়ে, কাউকে আঘাত করে বসে। একবার পালাতে চেয়েছিলো, বহু পথ পাকড়ে যেয়ে ধরেছেন। বললাম, এতো শিকল কেনো? স্যার বলবেন না আর, হাত ফসকালে ‘ফের সতেরো বছর’। ‘ফের সতেরো বছর, বুঝলাম না তো’ মা বললেন, “বাবা, এ আমার কলিজার টুকরা। আজ থেকে বছর সতেরো আগে একদিন হঠাৎ তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখলাম। কিছু বুঝার আগেই নিরুদ্দেশ হয়। নাই নাই নাই। কোথাও নাই। হাসপাতাল, মর্গ, পুলিশ, সাংবাদিক কিছুই বাকি রাখিনি তখন। কিন্তু পাইনি। এতোটা বছর সে নিরুদ্দেশ। কাঁদতে কাঁদতে চোখ অন্ধ। প্রতিবার নামাজ পড়ে আল্লাহ কে বলতাম, হে রাব্বুল আলামীন, আমার কলিজার টুকরা কে বাঁচিয়ে রাখো, যত কষ্ট দেবার সব আমাকেই দাও..” গত পরশু বাড়ির পাশে এক অপরিচিত কে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন বাড়ির লোক। ময়লা কাপড়, উষ্কখুষ্ক চুল, আর অগোছালো দাঁড়ি গোফ। বয়স আনুমানিক চল্লিশ পয়তাল্লিশের কোঠায়। ছোট ছোট বাচ্চারা তাকে নিয়ে শুরু করেছে রং তামাশা। এটা সেটা ছুড়ছিলো তার উপর। কিন্তু লোকটা বাড়ির আশ পাশ ছাড় ছিলোনা। বাড়ির দিকে বার বার উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। সম্ভবত কাউকে খুঁজছে। কিছু যুবকের সন্দেহ হলে তারা তাকে আটক করেন। জিগ্যাসাবাদে আবোলতাবোল বললে সন্দেহ হয় তাদের, এ কি ‘ছেলে-ধরা’ নাকি? ‘হাউকাউ’ শুনে বাড়ির অন্দরমহলের সবাই আসলেন ছেলেধরা দেখতে। অপরিচিত আগন্তুক শুনে লাঠি ভর দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসেন বাড়ির মুরব্বি বৃদ্ধা। তিনি প্রায়ই অপরিচিত কেউ আসছে শুনলে তাকে দেখতে যান। বৃদ্ধা কে দেখে কথিত ‘ছেলেধরা’ খ্যাত ‘মানসিক বিকার’ গ্রস্থ লোকটি স্থীর হয়ে তাকিয়ে থাকে বৃদ্ধার দিকে। চোখাচোখি হয় দুজনে। বৃদ্ধা কাছে এসে কাঁপাকাঁপা হাতে লোকটির মুখ, ঠোঁট, কপাল, দু’হাতে দিয়ে স্পর্শ করে ক্রমশ হাতড়াতে থাকেন। ক্ষানিক বাদেই, ‘আমার লালাইরে….” বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যান। ‘পাগলটি’ তখন দে দৌড়ে। কিন্তু পারে না, সবাই ধরে বেঁধে ফেলে। এ যেনো বাংলা ছবির শেষ দৃশ্যের মিলনের মতো পলকেই সব কিছু ঘটে গেলো। দীর্ঘ সতেরো বছর পুর্বে হারিয়ে যাওয়া তাদের কলিজের ধন ‘লাল মিয়াকে’ উদ্ধারের কাহিনী এভাবে বলে যাচ্ছিলো তার আপন ছোট ভাই, ধলাই মিয়া। অথচ সেই তাকে চোর বলে মারতে উদ্যত হয়েছিলো।
দুই.
সেলুনে নিয়ে লাল মিয়ার চুল দাড়ি গোফ সুন্দর করে সেইভ করানো হয়। গোসল দিয়ে জামা কাপড় পড়ানো। সাদা ধবধবে সাদা পোশাক। এবার একে একে চাচা ফুফু সবাই চিনলেন সবাই চিনলেন, সেই বছর সতেরো আগে কোন এক শিতের সকালে বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়া তাদের আদরের লাল মিয়াকে। তারপর গলা ধরে হাউমাউ করে কান্না। কিন্তু লাল মিয়া নির্বিকার। সে কিছুই বুঝেনা এসব। কেবল কাইকুই করছে সুযোগে শিকল ভেংগে পালাবার। লাল মিয়ার যে মানসিক অবস্থা এখন সে মোটেই ঔষধ খাবেনা। তাই তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করে সর্ট কোর্স ইঞ্জেকিটেবল এন্টিসাইকোটিক আর সেডেটিভ এর উপর তিনদিন রেখে অবজারভেশনে রাখলাম। সপ্তাহ পর থেকে লাল মিয়া একটু একটু করে ঔষধ খেলো গেলো। তবে সে কেবল মা’র হাতেই ঔষধ গুলো খায়। আর কেউ না। ধীরে ধীরে তার ব্রেইন কাজ করা শুরু করলো। তার ইনসাইট আসতে থাকে। ব্রেইনের ডোপামিন ব্যালেন্স হয়। এক সময় সে জিগ্যেস করলো, ‘মা বাজান কই?’। মা তাকে কেঁদে কেঁদে জবাব দেন, “বাজান রে তোর চিন্তায় চিন্তায় তোর বাবা আমাদের চেড়ে চলে গেছেন …”। লালুর চোখের কোনে অশ্রু জমে। বিগত ১৭ বছর লাল মিয়া কোথায় ছিলো, কার সাথে ছিলো, কি করতো, এসব ধীরে ধীরে বলতে পারলো। সে নাকি প্রায় সময় রাস্তাঘাট, কবরে, মাজারে, শ্মশানে ইষ্টিশনে, বা বিভিন্ন গাঁজা সেবনের আড্ডায় পড়ে থাকতো। পাগল বলে মাঝেমধ্যে কেউ কেউ খাবার দিতো, টাকা দিতো। আবার কেউ কেউ কখনো তাড়াতো। সে বললো, মায়ের কথা মনে হলে সে নাকি মাঝেমধ্যে গ্রামে আসতো মা’কে দেখতে। এক পলক দেখে আবার চলে যেতো। তাকে কেউই চিনতো না। ছন্নছাড়া পাগল ভাবতো। তার কথার সত্যতা মিললো তাদের গ্রামের এক চা দোকানীর কথায়। সে বললো, একে আমি কালেভদ্রে ঘুরঘুর করতে দেখতাম, আবার কোথায় হারিয়ে যেতো। চুল দাড়ি গোফে সারা ঢেকে থাকতো। চেনা দায়।
তিন.
প্রায় মাস তিনেকের চিকিৎসায় লাল মিয়া পুরো সুস্থ হয়ে গেলো। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগী শতকরা ২৫ ভাগের বেলায় এমন হয়। ঠিকমতো ঔষধ আর আদর যত্নে পুরো ভালো হয়ে যায় রোগী। তবে সিগারেট গাজা মাদক কু সংগ থেকে আলাদা রাখতে হয়। কারন সিজোফ্রেনিয়া রোগীরা সহজেই এসবে জড়িয়ে যায়। একদিন ফলোআপে লাল মিয়ার মা’এসে বললেন, “বাবা রোজ নামাজ পড়ে আপনার জন্যে দোয়া করি। আপনার জন্যে আমার কলিজার টুকরা লালু আমারে চিৎকার কইরা ‘মা’ কইয়া ডাকে। আমার প্রান জুড়ায় যায় সেই ডাক শুনে। বাজান এই ডাক শুনার জন্যে সতেরো বছর থাইকা আমার কইলজা আকুপাকু করতেছিলো, আল্লায় আপনার ভালো করুক বাজান”। আমি হেসে জিগ্যেস করলাম, “আচ্ছা ছেলেকে চিনলেন কিভাবে এতো বছর পর, লম্বা চুল, দাড়ি, গোঁফে নাকি তাকে কেউ চিনতনা ” তিনি বললেন, ‘বাজান, এরে আমি পেটে ধরছি…? আমার আদরে বড় পোলা। বড় আদরের। রক্ত রক্তরে চিনতে ভুল করেনা। রক্ত তার রক্তের ঘ্রান পায়…। আমার ক্যান জানি মনে হইতো, আমার লালু মরে নাই। তাই আল্লাহর কাছে কানতাম, প্রতিদিন কানতাম। ওরে যেদিন চোর বলে ধরে সবাই মারতে যায়, আমার কইলজা তখন কেমন জানি হঠাৎ মোচড় দিয়া উঠে…” চার. সিজোফ্রেনিয়া রোগীকে ভালো রাখতে হলে তাদের ধীরে ধীরে ছোট খাটো কাজ দিতে হয়। তাতে রিলাপ্স রেইট কম থাকে। তাই বলেছিলাম লাল মিয়াকে ঔষধের পাশাপাশি বাড়ির সামনে একটি টি স্টল বা পাঁচ মিশালী সদাই পাতির টং ঘর করে দিতে। চা বিস্কিট পান সুপারি এসবের। লাল মিয়া এখন সুস্থ, পুরোটাই সুস্থ। তার দোকান খুব ভালো চলছে। ‘লাল মিয়া টি স্টল’। এবারের ঈদে নাকি মায়ের জন্যে একটা শাড়িও কিনেছে। লাল মিয়ার জন্যে পাত্রী ও দেখা হচ্ছে। ভাবছি একদিন চা খেতে যাবো লাল মিয়া’র টি স্টলে।

ডা. সাঈদ এনাম
সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি বিভাগ, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ। মেম্বার, রয়েল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্ট ইংল্যান্ড । মেম্বার, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

মানসিক চাপ: এড়াবেন কীভাবে

জীবনে চাপ থাকবেই। কাজের চাপ, সময়ের চাপ, দেনার চাপ। আছে ব্যর্থতার যন্ত্রণা। হারানোর কষ্ট। এগুলো মানসিক চাপের কারণ হয়ে ওঠে। এই চাপ এড়াবেন কীভাবে?...

করোনা মহামারীর এই দুঃসময়ে আধ্যাত্মিকতা আনতে পারে মানসিক শান্তি

করোনা নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। তাছাড়া ঘরে থেকে থেকেও আমরা হাপিয়ে উঠেছি।  এ অবস্থায় শরীর ও মন ভাল রাখতে পারে আধ্যাত্মিক কাজকর্ম এবং...

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রভাব ফেলছে মানসিক স্বাস্থ্যে

সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের সাড়ে ১৩ কোটি মানুষ জীবনযাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬০...

নিদ্রা অনিদ্রা কিংবা অতিনিদ্রা কী করবেন

ঘটনা ১ ২০ বছরের লিজা, একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। পরীক্ষার জন্য রাত জেগে পড়ালেখা করতে হয়েছিল এক মাস। পরীক্ষা শেষ হয়েছে, কিন্তু তারপর আগের...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন